ভারতের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক চিকিৎসা ভর্তি পরীক্ষা ঘিরে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ, পরীক্ষা বাতিল ও পুনরায় পরীক্ষার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকরাও বলছেন, দীর্ঘদিনের পড়াশোনা, বিপুল খরচ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার চাপ অনেক তরুণের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
চিকিৎসা শিক্ষায় ভর্তির স্বপ্ন নিয়ে লাখো শিক্ষার্থী যে পরীক্ষায় অংশ নেন, সেই পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দেশজুড়ে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন শিক্ষা ব্যবস্থার জবাবদিহি, সুযোগের বৈষম্য ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলেছে।
প্রশ্নফাঁসের পর নতুন করে পরীক্ষার চাপ
মে মাসে ভারতের জাতীয় চিকিৎসা ভর্তি পরীক্ষায় ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেন। পরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে এলে ফল প্রকাশ স্থগিত করা হয় এবং পরীক্ষার্থীদের আবার পরীক্ষায় বসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
যেসব শিক্ষার্থী মাসের পর মাস প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, তাদের অনেককেই আবার একই চাপের মধ্যে পড়তে হয়। পরীক্ষার ফল ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে।
সারাক্ষণ রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে এবং এ ঘটনায় চিকিৎসক ও শিক্ষকসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সানার মৃত্যুতে আরও গভীর ক্ষোভ
১৯ বছর বয়সী শেখ সানা পুনরায় পরীক্ষায় বসার চাপ সামলাতে পারেননি বলে তার পরিবার জানিয়েছে। পরীক্ষার এক দিন আগে তিনি নিজের জীবন শেষ করেন। পরিবারের সদস্যদের দাবি, পুনরায় পরীক্ষা দিতে হবে—এই ভয় ও মানসিক চাপ তাকে ভেঙে দিয়েছিল।
সানার বাবা শেখ জাফর হুসেইন বলেন, তার মেয়ের কাছে পুনরায় পরীক্ষার চিন্তাই অসহনীয় হয়ে উঠেছিল।
আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনাও একই পরীক্ষাকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার সঙ্গে তাদের পরিবার যুক্ত করেছে। তবে এসব মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে তদন্ত চলছে এবং সব ঘটনার কারণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
দিল্লিতে হাজারো শিক্ষার্থীর বিক্ষোভ
প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জবাবদিহি ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে রাজধানী দিল্লিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই আন্দোলনে হাজারো শিক্ষার্থী অংশ নেন।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, শুধু প্রশ্নফাঁসের তদন্ত করলেই হবে না, পুরো ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আন্দোলন ধীরে ধীরে শিক্ষাব্যবস্থার নানা দুর্বলতা ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের বৃহত্তর প্রকাশে পরিণত হয়েছে।
বিক্ষোভ দমাতে কোথাও কোথাও পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিরাও শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ
আন্দোলনের চাপের মধ্যেই ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগের আগে তিনি তরুণদের উদ্বেগ ও প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নফাঁসের ঘটনাকে গুরুতর ও বেদনাদায়ক হিসেবে উল্লেখ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দ্রুত বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিচারের কথাও বলা হয়েছে।
তবে শিক্ষার্থীদের বড় অংশের প্রশ্ন, শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে, নাকি পরীক্ষাব্যবস্থার ভেতরের দুর্বলতাগুলোও দূর করা হবে?
চিকিৎসা শিক্ষায় সুযোগ পাওয়া কঠিন
ভারতে চিকিৎসা পড়ার সুযোগ পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা শিক্ষায় ভর্তির সুযোগ পান।
ফলে একটি আসনের জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। অনেক পরিবার বছরের পর বছর সন্তানের পড়াশোনার পেছনে সঞ্চয় ব্যয় করে। কেউ কেউ ঋণ নিয়ে ব্যয়বহুল কোচিং, থাকা-খাওয়া ও শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করেন।

রাজস্থানের এক কৃষক পরিবারের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটেছে। ছেলেকে চিকিৎসক বানানোর স্বপ্নে পরিবারটি জমি বিক্রি করেছে এবং ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। পরীক্ষার ফল বাতিল হওয়ার পর ছেলেটি আত্মহত্যা করে বলে পরিবার জানিয়েছে।
পরিবারটির বক্তব্য, তারা আর্থিক ক্ষতিপূরণ নয়, ঘটনার জন্য দায়ীদের জবাবদিহি চায়।
তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন
ভারতের মোট জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। ফলে তরুণদের মধ্যে শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে তৈরি হওয়া হতাশা দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।
দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরও তরুণদের বেকারত্ব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। উচ্চশিক্ষায় সীমিত আসন, চাকরির প্রতিযোগিতা এবং বেসরকারি কোচিংয়ের বাড়তি খরচ অনেক পরিবারের ওপর চাপ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক আন্দোলন শুধু একটি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদ নয়। এর মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা, সুযোগ পাওয়ার সমতা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভও প্রকাশ পাচ্ছে।
আন্দোলনের পরিধি আরও বাড়ার আশঙ্কা
দিল্লির রাজপথে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে এখন মৃত শিক্ষার্থীদের ছবিও সামনে রাখা হচ্ছে। তাদের পরিবারগুলো দায় নির্ধারণ ও কার্যকর জবাবদিহির দাবি জানাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট মনে করে, একটি ভর্তি পরীক্ষার অনিয়ম যখন শিক্ষার্থীদের জীবন, পরিবারের সঞ্চয় এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নকে নাড়িয়ে দেয়, তখন বিষয়টি শুধু পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও তরুণ প্রজন্মের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















