ভারতের দিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ আন্দোলন শেষ হলেও আলোচনায় থেকে গেছে একদল তরুণ স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা। পরিচয় বা সংগঠনের আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের তোয়াক্কা না করে তারা আন্দোলনস্থলে এসে যে কাজ প্রয়োজন মনে করেছেন, সেটিই করেছেন।
ভোর থেকে রাত, চলেছে নিরলস দায়িত্ব
প্রতিদিন ভোর সাড়ে ৬টার আগেই এক তরুণ যন্তর মন্তরের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে যেতেন। রাজস্থান সরকারের কর্মী ৩০ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি ছুটি নিয়ে সহকর্মীদের না জানিয়েই দিল্লিতে এসেছিলেন। ২০২৩ সালের সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় নিজের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বিষয়টির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
রাত ১১টার দিকে নতুন স্বেচ্ছাসেবকেরা দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি গুরদুয়ারা বাংলা সাহিবে গিয়ে গোসল, কিছুক্ষণ বিশ্রাম ও মুঠোফোনে চার্জ দেওয়ার সুযোগ নিতেন। ভোর হওয়ার আগেই আবার ফিরে আসতেন আন্দোলনস্থলে।
সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেকে হাতে নীল রঙের রাবারের দস্তানা ও ময়লার ব্যাগ নিয়ে হাজির হতেন। আগের রাতের বৃষ্টিভেজা জায়গা থেকে প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট ও অন্যান্য আবর্জনা সরাতেন তারা। কেউ খাবারের কার্টন নামাতেন, কেউ চা ও নাশতা বিতরণ করতেন। কেউ আবার চিকিৎসা শিবির, মঞ্চের মাইক ও তারের ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত থাকতেন।

দায়িত্ব কেউ দেয়নি, তবু কাজ থামেনি
এই স্বেচ্ছাসেবকদের কাউকে কোনো তালিকায় নাম লিখতে হয়নি। ছিল না উপস্থিতির খাতা, নির্দিষ্ট তদারককারী কিংবা আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব বণ্টন। যে যার মতো প্রয়োজন বুঝে কাজ শুরু করেছেন।
কেউ প্রবেশপথ সামলেছেন, কেউ মঞ্চের সামনে মানুষের সারি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা মানুষদের হাতপাখা দিয়ে বাতাস করেছেন অনেকে। কোথাও পোস্টার তৈরির আয়োজন হয়েছে, সেটিও সামলেছেন স্বেচ্ছাসেবকেরাই।
দুপুরের দিকে আন্দোলনস্থলে আসতে থাকে মানুষের দেওয়া নানা ধরনের সামগ্রী। খাবারের পাশাপাশি টুথব্রাশ, টুথপেস্ট, চপ্পল, প্লাস্টিকের চাদর, বিছানার চাদর, প্রাথমিক চিকিৎসার সামগ্রী, ঝাড়ু, মেঝে মোছার সরঞ্জাম ও ব্যাটারিচালিত পাখাও পৌঁছায়।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতের লড়াই
১৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ কাইফ উত্তরপ্রদেশের মোরাদাবাদ থেকে দিল্লিতে এসেছিলেন। সেখানে থেকেই খাওয়া, ঘুম ও পড়াশোনার পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
খাবার বিতরণ থেকে শুরু করে পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা এবং ক্লান্ত আন্দোলনকারীদের বাতাস করার কাজও করেছেন কাইফ। তার লক্ষ্য ছিল, প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন নষ্ট না হয়।

সোনেপত থেকে ২৭ বছর বয়সী পেশাদার মুষ্টিযোদ্ধা যোগিন্দর শর্মাও প্রতিদিন ভোরের ট্রেনে দিল্লি আসতেন। দিনভর আন্দোলনস্থলে কাজ করে রাতের ট্রেনে আবার বাড়ি ফিরতেন। পায়ে অস্ত্রোপচারের পর বেশিক্ষণ দাঁড়াতে না পারলেও শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানাতে তিনি সেখানে যেতেন।
কানপুর থেকে আসা ২২ বছর বয়সী শিল্পী প্রবীণ সিংও প্রথমে স্বল্প সময় থাকার পরিকল্পনা করেছিলেন। পরে আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার পরিস্থিতি দেখে তিনি থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সরবরাহ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও আন্দোলনস্থলে পাওয়া মানুষের সহায়তায় দিন কাটিয়েছেন তিনি।
পরিচ্ছন্নতাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ
প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের খাবারের ব্যবস্থা হওয়ায় আন্দোলনস্থল পরিষ্কার রাখা স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। কলার খোসা, খাবারের পাত্র, মোড়কসহ বিভিন্ন আবর্জনা তারা এক জায়গায় জমা করতেন। পরে সীমিত সময়ের মধ্যে সেগুলো সরিয়ে নিতেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।
এক দিনেই প্রায় ১৫ টন আবর্জনা সরানোর ঘটনা পরিস্থিতির ব্যাপকতা বোঝায়। আন্দোলন শেষ হওয়ার পরও স্বেচ্ছাসেবকেরা রাস্তা থেকে প্লাস্টিকের বোতল, ব্যানারসহ পড়ে থাকা নানা জিনিস সরিয়ে জায়গা পরিষ্কার করেছেন।
উত্তেজনার সময় মানববন্ধন করে শান্তি ফেরানোর চেষ্টা
আন্দোলনস্থলে উত্তেজনা তৈরি হলে স্বেচ্ছাসেবকেরা শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘাতের পরিস্থিতিতে তারা মাইক হাতে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

কেউ পুলিশের গাড়ি বা ব্যারিকেডের ওপর উঠে সবাইকে শান্ত হওয়ার অনুরোধ করেছেন। রাস্তায় পড়ে থাকা পাথর সরিয়ে দিয়েছেন। পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মাঝখানে মানবশৃঙ্খল তৈরি করে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন।
এভাবে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে সংঘাত আরও বাড়তে না দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
পরিবারের কাছেও গোপন রেখেছিলেন অনেকে
আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক তরুণ-তরুণী পরিবারের আপত্তির আশঙ্কায় বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন। উত্তরাখণ্ডের ১৯ বছর বয়সী এক সাংবাদিকতা শিক্ষার্থী প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত আন্দোলনস্থলে মানুষের সেবা করতেন।
পরিবারকে তিনি বলেছিলেন, জাতীয় ক্যাডেট কোরের একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে যাচ্ছেন। আন্দোলনস্থলে তরুণীদের ওপর হামলার দৃশ্য দেখার পরই তিনি সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানান।
পরিবার যেন তার অবস্থান জানতে না পারে, সে জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের বাবা-মাকে সাময়িকভাবে আটকে রেখেছিলেন তিনি। থাকার জায়গার সংকটেও গুরদুয়ারা বাংলা সাহিব তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয় হয়ে উঠেছিল।

আন্দোলন শেষ, কিন্তু দায়িত্ব শেষ হয়নি
শনিবার রাতে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শেষ করার ঘোষণা আসে। কিন্তু মঞ্চের কার্যক্রম থেমে গেলেও স্বেচ্ছাসেবকদের কাজ তখনও শেষ হয়নি।
তারা রাস্তা পরিষ্কার করেছেন, মানুষকে বের হওয়ার পথ দেখিয়েছেন, অস্থায়ী সহায়তা কেন্দ্র গুটিয়েছেন এবং রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল ও গুরদুয়ারার দিকে ফিরে যাওয়া মানুষদের নিরাপদে যেতে সহায়তা করেছেন।
রাত গভীর হলে ভিড় কমতে শুরু করে। তখন কেউ মেট্রোতে, কেউ রেলস্টেশনের পথে, আবার কেউ নিজের শহরে ফেরার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।
রাজস্থান সরকারের সেই কর্মীও এক সপ্তাহ পর বাড়ি ফিরেছেন। সোমবার কাজে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। আন্দোলনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি জানাজানি হলে চাকরি হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে তার। তবু তার বক্তব্যের সারকথা একটাই—কিছু কিছু বিষয় ব্যক্তিগত ভয় ও ঝুঁকির চেয়েও বড়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















