ভারতে প্রথমবারের মতো ডেঙ্গুর টিকা কিউডেঙ্গা অনুমোদন পাওয়ার পর এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি এই টিকা শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্কদের দেওয়ার অনুমোদন পেয়েছে। তবে আগে কখনো ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে টিকাটি বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহারের প্রয়োজন রয়েছে বলে উঠে এসেছে।
চার ধরনের ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে টিকা
ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি প্রধান ধরন হলো ডিইএনভি-১, ডিইএনভি-২, ডিইএনভি-৩ ও ডিইএনভি-৪। একটি ধরনে আক্রান্ত হওয়ার পর শরীরে তৈরি হওয়া প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্য ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে সবসময় সমান সুরক্ষা দেয় না।
এই কারণেই ডেঙ্গুর কার্যকর টিকার ক্ষেত্রে চার ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধেই সমানভাবে সুরক্ষা তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। একটি ধরন থেকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা না মিললে পরবর্তী সময়ে অন্য ধরনের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
আগে ডেঙ্গু না হওয়া শিশুদের নিয়ে উদ্বেগ

কিউডেঙ্গার তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষায় প্রায় ২০ হাজার সুস্থ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তাদের বয়স ছিল ৪ থেকে ১৬ বছর। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিশুদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশকে টিকা দেওয়া হয় এবং বাকিদের লবণাক্ত দ্রবণ দেওয়া হয়েছিল।
সামগ্রিক ফলাফলে দেখা যায়, টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে প্রতি হাজারে প্রায় পাঁচজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল। টিকা না নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ছিল প্রতি হাজারে প্রায় ২৪ জন। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে টিকাটির কার্যকারিতা প্রায় ৮০ শতাংশ।
তবে শুধু সামগ্রিক ফল দেখলেই পুরো চিত্র বোঝা যায় না। আগে ডেঙ্গু হয়েছিল কি না, সেই ভিত্তিতে ফলাফল আলাদা করে বিশ্লেষণ করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।
ডিইএনভি-৩ নিয়ে বিশেষ সতর্কতা
আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে ডিইএনভি-৩ ভাইরাসের সংক্রমণের হার টিকা নেওয়া দলের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেছে। পরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, এই শিশুদের টিকা না নেওয়া শিশুদের তুলনায় ডিইএনভি-৩ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি ছিল।
অন্যদিকে ডিইএনভি-১ ও ডিইএনভি-২-এর বিরুদ্ধে কিউডেঙ্গার কার্যকারিতা তুলনামূলকভাবে ভালো পাওয়া গেছে। কিন্তু ডিইএনভি-৪-এর ক্ষেত্রে পরীক্ষায় আক্রান্তের সংখ্যা খুবই কম ছিল, আর আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হওয়া শিশুদের মধ্যে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় এই ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকার কার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
শরীরে রোগ প্রতিরোধের ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অ্যান্টিবডি-নির্ভর সংক্রমণ বৃদ্ধি। কোনো ব্যক্তি প্রথমবার একটি ধরনের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে শরীরে সেই ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। পরে অন্য ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলে কিছু ক্ষেত্রে আগের অ্যান্টিবডি উল্টো সংক্রমণকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
কিউডেঙ্গা একটি জীবন্ত দুর্বলীকৃত ডেঙ্গু টিকা হওয়ায় আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হওয়া শিশুর শরীরে এটি প্রথম ডেঙ্গু সংক্রমণের মতো প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। এতে ডিইএনভি-১ ও ডিইএনভি-২-এর বিরুদ্ধে সুরক্ষা তৈরি হলেও ডিইএনভি-৩-এর ক্ষেত্রে একই মাত্রার সুরক্ষা না থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
ফলে ভবিষ্যতে ওই শিশু স্বাভাবিকভাবে ডিইএনভি-৩-এ আক্রান্ত হলে সেটিকে দ্বিতীয় ধরনের ডেঙ্গু সংক্রমণ হিসেবে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এখানেই সম্ভাব্য জটিলতার প্রশ্নটি সামনে আসে।
টিকা দেওয়ার আগে পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা
কিউডেঙ্গা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাই আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল কি না, তা শনাক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে টিকা দেওয়ার আগে পূর্বের ডেঙ্গু সংক্রমণের প্রমাণ খুঁজে দেখা নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
কিউডেঙ্গার সামগ্রিক কার্যকারিতা আশাব্যঞ্জক হলেও ডিইএনভি-৩-এর ক্ষেত্রে আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হওয়া শিশুদের নিয়ে যে নিরাপত্তা সংকেত পাওয়া গেছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। টিকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ পরীক্ষা ও সতর্কতা নিশ্চিত করা হলে সম্ভাব্য ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।
কিউডেঙ্গার ব্যবহার তাই শুধু টিকার কার্যকারিতা দিয়ে বিচার না করে এর নিরাপত্তা, শিশুর আগের ডেঙ্গু সংক্রমণের ইতিহাস এবং চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষার ভারসাম্য—সবকিছু বিবেচনায় রেখে করা প্রয়োজন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















