ওয়াশিংটনের নীতিতে অনিশ্চয়তা যত বাড়ছে, নয়াদিল্লির কৌশলগত হিসাবও তত জটিল হয়ে উঠছে। মার্কিন প্রশাসনের নীতিগত ওঠানামা, বাণিজ্যিক চাপ এবং আঞ্চলিক অগ্রাধিকার বদলের ফলে ভারতে এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কি পুনর্গঠন করা উচিত? কেউ কেউ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কৌশলগত অবস্থান ভারতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে অযথা সীমাবদ্ধ করেছে। তাই বেইজিংয়ের সঙ্গে দ্রুত অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করাই নাকি এখন বাস্তবসম্মত পথ।
এই যুক্তি আপাতদৃষ্টিতে আকর্ষণীয় হলেও এর ভেতরে রয়েছে একটি মৌলিক ভুল। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যে ঝুঁকিপূর্ণ, তা সত্য। কিন্তু সেই উপলব্ধি থেকে যদি চীনের প্রতি অযাচিত নমনীয়তা দেখানো হয়, তাহলে তা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করবে। দুটি ভুলের মধ্যে একটি বেছে নেওয়া কখনোই বিচক্ষণ পররাষ্ট্রনীতি হতে পারে না।
স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ এক বিষয় নয়
ভারতের একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে চীনা প্রযুক্তি, শিল্পযন্ত্র, সরবরাহব্যবস্থা এবং কাঁচামাল ছাড়া ভারতের প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা কঠিন। তাদের মতে, রাজনৈতিক বিরোধকে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর চাপিয়ে দেওয়ায় দেশ নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতাকে অনেকটাই উপেক্ষা করে। বৈশ্বিক বাণিজ্য এখন আর কেবল বাজারের হিসাব নয়; এটি ক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং ভূরাজনীতির অংশ। যে রাষ্ট্র সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে, সে প্রয়োজনে সেই ব্যবস্থাকেই রাজনৈতিক চাপের অস্ত্রে পরিণত করতে পারে। ফলে সস্তা আমদানির সুবিধা যদি ভবিষ্যতের কৌশলগত দুর্বলতার ভিত্তি তৈরি করে, তাহলে সেই সুবিধার মূল্য শেষ পর্যন্ত অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়।

অতীতের অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই
চীনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো সীমান্তে গত এক দশকের ধারাবাহিক উত্তেজনা। দেপসাং, চুমার, ডোকলাম এবং সর্বোপরি গালওয়ানের সংঘর্ষ—এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো একটি ধারাবাহিক কৌশলের অংশ, যার লক্ষ্য সীমান্তে ধীরে ধীরে বাস্তবতা বদলে দেওয়া।
এর পাশাপাশি অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে চীনের দাবি, বিভিন্ন স্থানের নতুন নামকরণ, জম্মু ও কাশ্মীর এবং অরুণাচলের বাসিন্দাদের জন্য পৃথক ভিসা নীতি—এসবই দেখায় যে সীমান্ত প্রশ্নকে বেইজিং কখনোই কেবল প্রশাসনিক বিরোধ হিসেবে দেখে না; বরং এটি বৃহত্তর রাজনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার।
অর্থনৈতিক সম্পর্কও বারবার রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ শিল্প উপকরণ, যন্ত্রাংশ কিংবা বিরল খনিজের সরবরাহ সীমিত করে চীন একাধিকবার তার প্রভাব দেখিয়েছে। ফলে যে দেশের শিল্পব্যবস্থা একটি মাত্র উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল, সংকটের সময় তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও সংকুচিত হয়ে যায়।
পারস্পরিক সদিচ্ছার ধারণা বাস্তবসম্মত নয়
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পক্ষে অন্যতম যুক্তি হলো—অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নত হলে রাজনৈতিক বিরোধও ধীরে ধীরে কমবে। কিন্তু এই অনুমানকে সমর্থন করার মতো বাস্তব উদাহরণ খুব কম।
বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল এশিয়ায় নিজের প্রভাব বিস্তার করা। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতকে সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে দেখার পরিবর্তে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতাই বেশি স্পষ্ট। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের বিভিন্ন উদ্যোগে বাধা, নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপে সদস্যপদ প্রশ্নে আপত্তি এবং পাকিস্তান-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে চীনের অবস্থান—সব মিলিয়ে এই বাস্তবতা বহুবার প্রকাশ পেয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সীমান্ত বিরোধ কিংবা কৌশলগত আচরণে কোনো মৌলিক পরিবর্তন ছাড়াই যদি ভারত বাজার আরও উন্মুক্ত করে, তবে তা কার্যত চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবকেই শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি আরও বাড়বে এবং ভবিষ্যতে সংকটের সময় ভারতের ওপর চাপ প্রয়োগের সুযোগও বৃদ্ধি পাবে।
কৌশলগত প্রভাব হারালে তা সহজে ফিরে আসে না
গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিল—চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করা, বিনিয়োগে কঠোরতা, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোয় সীমাবদ্ধতা—এসব কেবল আবেগপ্রসূত প্রতিক্রিয়া ছিল না। এগুলো ছিল ভবিষ্যৎ আলোচনায় ভারতের হাতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত উপায়।
অল্প কিছু অর্থনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে যদি এসব ব্যবস্থা দ্রুত তুলে নেওয়া হয়, তাহলে ভারত নিজের অন্যতম কার্যকর চাপের মাধ্যম স্বেচ্ছায় হারাবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতা হলো, যে সুবিধা একবার ছেড়ে দেওয়া হয়, তা পরবর্তীতে একই শক্তিতে পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন।
ভারতের সামনে প্রকৃত বিকল্প কী?
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অনিশ্চয়তা ভারতের জন্য অবশ্যই একটি সতর্কবার্তা। ওয়াশিংটন সর্বদা নিজের জাতীয় স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেবে—এটাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়ম। তাই কোনো একক শক্তির নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা যুক্তিযুক্ত নয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারতের সামনে একমাত্র বিকল্প চীনের সঙ্গে আপসহীন সমঝোতা। বরং এই দুই চরম অবস্থানের মাঝখানেই রয়েছে বাস্তবসম্মত পথ—যেখানে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রেখে বহুমুখী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা সম্ভব।
ভারতের উচিত ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া এবং গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করা, সরবরাহব্যবস্থার বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা এবং দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়ানো। এই প্রক্রিয়ায় স্বল্পমেয়াদে কিছু অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হলেও তা ভবিষ্যতের কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।
শেষ পর্যন্ত ভারতের সামনে মূল প্রশ্ন যুক্তরাষ্ট্র নাকি চীন—তা নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, দেশটি কি এমন সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারবে যাতে কোনো পরাশক্তির ওপর নির্ভর না করেও নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা যায়?
পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়া নয়; বরং এমন রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া, যে নিজের ভারসাম্য নিজেই ধরে রাখতে পারে। সেটিই হবে ভারতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সাফল্য।
শশী থারুর 



















