কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় চীন দ্রুতই শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। উন্নত প্রযুক্তির চিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধা থাকলেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এমন সব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল তৈরি করছে, যেগুলোর সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় মডেলের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে উন্মুক্ত মডেলের বিস্তারে। এসব মডেল অন্য প্রতিষ্ঠান বা দক্ষ ব্যবহারকারীরা নিজেদের কম্পিউটারে চালাতে পারছেন।
চীনের নতুন কৌশল
চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অগ্রযাত্রার পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। দেশটির প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং সম্প্রতি সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলনে উন্মুক্ততা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং উদ্ভাবনভিত্তিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন।
চীনের সামনে বড় বাধা ছিল উন্নত গ্রাফিক্স প্রসেসিং চিপের সীমিত প্রাপ্যতা। এসব চিপ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল প্রশিক্ষণ ও ব্যবহার—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। তবে চীন তুলনামূলক কম উন্নত চিপের বড় সরবরাহ এবং বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে সেই ঘাটতি অনেকটা সামাল দিয়েছে।
এর ফল হিসেবে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় আকারের মডেল তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে কিমি কে৩-এর মতো মডেল বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
উন্মুক্ত মডেলেই বড় সুবিধা

চীনের অগ্রগতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উন্মুক্ত উৎস ও উন্মুক্ত-ওজনের মডেল। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শীর্ষস্থানীয় মডেলের অভ্যন্তরীণ কাঠামো সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত নয়। বিপরীতে চীনের বেশ কিছু মডেল অন্য প্রতিষ্ঠান ও গবেষকেরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার, পরিবর্তন ও স্থানীয়ভাবে পরিচালনা করতে পারছেন।
আলিবাবার মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও তুলনামূলক হালকা মডেল তৈরি করেছে, যেগুলো নিজস্ব যন্ত্রে চালাতে আগ্রহী ব্যবহারকারীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। একই সঙ্গে টেনসেন্ট, বাইদু এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণায় উৎসাহিত করার ফলে চীনে একাধিক শক্তিশালী মডেল তৈরি হয়েছে।
এসব মডেল বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নকারী ও গবেষকের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। নির্দিষ্ট কাজের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী মডেল বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকায় উন্মুক্ত মডেলগুলোর ব্যবহারও বাড়ছে।
ডিপসিকের পর নতুন প্রতিযোগিতা
চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অগ্রযাত্রায় ডিপসিকের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রতিষ্ঠানটির মডেল উন্মুক্তভাবে ব্যবহারের সুযোগ থাকায় এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি-নির্ভর আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর এই সাফল্যকে শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অর্জন হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। গবেষণাগার, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, নতুন উদ্যোক্তা এবং সরকারি নীতির সমন্বয়ে একটি বিস্তৃত পরিবেশ গড়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে নেওয়া পরিকল্পনার ফল এখন ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মডেলের সঙ্গে পার্থক্য কোথায়
উন্মুক্ত মডেলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের অবকাঠামোয় চালাতে পারে। ফলে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা কমে এবং বিভিন্ন সেবাদাতার মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এতে ভবিষ্যতে খরচ নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারে আরও পূর্বানুমানযোগ্যতা আসতে পারে।
তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করে তাদের মডেলের ব্যবহারকে ভর্তুকি দিচ্ছে। ফলে উন্মুক্ত মডেলের খরচের সুবিধা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ভবিষ্যতে এই ভর্তুকি কমে গেলে উন্মুক্ত মডেলের প্রকৃত অর্থনৈতিক সুবিধা আরও পরিষ্কার হতে পারে।

সামনে রয়েছে বড় প্রশ্ন
উন্মুক্ত মডেল তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ সময় একই গতিতে এসব মডেল বিনামূল্যে বা উন্মুক্তভাবে সরবরাহ করবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ইতিমধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অবকাঠামোয় পরিচালিত বন্ধ মডেল তৈরির দিকেও এগোচ্ছে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থার সংকট। বিশেষ করে ভারতের মতো দেশে চীনা প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ রয়েছে। যদিও উন্মুক্ত মডেল স্থানীয় অবকাঠামোয় পরিচালনা করা সম্ভব হওয়ায় তথ্য বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে কিছু ব্যবহারকারীর উদ্বেগ কমতে পারে।
ভারতও নিজস্ব সক্ষমতা গড়তে চাইছে
চীনের দ্রুত অগ্রগতির পাশাপাশি ভারতও নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সক্ষমতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। দেশটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করছে এবং নিজস্ব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছে।
একই সময়ে উন্মুক্ত মডেল ব্যবহারে ভারত পুরোপুরি পিছিয়ে নেই। স্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় উন্মুক্ত মডেল ব্যবহারের সুযোগ থাকায় চীনের তৈরি প্রযুক্তিও ভবিষ্যতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে জায়গা করে নিতে পারে।
তবে চীনা প্রযুক্তির সঙ্গে ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি ভারতের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যতই বাড়ুক, আস্থা ও নিরাপত্তার প্রশ্নটি সহজে দূর হবে না।
এবার লক্ষ্য বাস্তব জগতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
চীনের পরিকল্পনার পরবর্তী বড় ধাপ শুধু কম্পিউটার বা ডিজিটাল জগতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নয়। প্রযুক্তিকে বাস্তব জগতের সঙ্গে যুক্ত করাই এখন তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
রোবট, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা এবং দৈনন্দিন জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর মধ্য দিয়ে এই প্রযুক্তিকে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে চীনের বর্তমান অগ্রগতি শুধু একটি প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও শিল্পব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
চিপের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে দ্রুত অগ্রগতি দেখাচ্ছে যে শুধু সবচেয়ে উন্নত যন্ত্রাংশের মালিক হওয়াই সাফল্যের একমাত্র পথ নয়। বড় বাজার, বিদ্যুৎ, গবেষণা, সরকারি পরিকল্পনা এবং উন্মুক্ত প্রযুক্তির সমন্বয়ও বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে।
চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অগ্রযাত্রা এখন তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বিষয় নয়। আগামী দিনের প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও শিল্পের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে—সেই বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গেও এটি জড়িয়ে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















