একটি রাষ্ট্রের করব্যবস্থার সফলতা কেবল কত রাজস্ব আদায় হলো, সেই পরিসংখ্যানে মাপা যায় না। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সেই রাজস্ব আসছে কার কাছ থেকে, আর কারা এখনও কার্যত করের আওতার বাইরে রয়ে গেছে। শ্রীলঙ্কার সর্বশেষ আয়কর-সংক্রান্ত তথ্য সেই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। কাগজে-কলমে রাজস্ব আদায় বেড়েছে, লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়েছে। কিন্তু গভীরে তাকালে দেখা যায়, করব্যবস্থার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অবলম্বন হয়ে উঠেছে বেতনভোগী মধ্যবিত্ত, আর কর প্রশাসনের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে বিশাল একটি কর্মজীবী জনগোষ্ঠী।
এই বাস্তবতা কেবল রাজস্ব সংগ্রহের নয়; এটি ন্যায্যতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সামাজিক আস্থার প্রশ্নও। যদি একই শ্রেণির মানুষকে বারবার করের প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হয়, অথচ যাদের কর দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে তাদের বড় অংশ কার্যকর নজরদারির বাইরে থাকে, তাহলে করব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষয় হতে বাধ্য।
মধ্যবিত্তের ওপর দ্রুত বাড়তে থাকা চাপ
বর্তমান কর কাঠামোয় ব্যক্তিগত করমুক্ত সীমা কিছুটা বাড়ানো হলেও মূল সমস্যার সমাধান হয়নি। কারণ আয়ের স্তর খুব দ্রুত উচ্চ করহারের মধ্যে প্রবেশ করছে। আজকের জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন খরচ, ঋণের কিস্তি এবং অন্যান্য আর্থিক দায় বিবেচনায় যে আয়কে স্বচ্ছল বলা যায়, সেটিকেও কার্যত সর্বোচ্চ করহারের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। অথচ বেতনভোগীরা তাদের কর্মসংক্রান্ত বাস্তব ব্যয়ের বিপরীতে প্রায় কোনো কর-ছাড়ই পান না। ফলে প্রকৃত আয়ের তুলনায় করের বোঝা আরও ভারী হয়ে ওঠে।
এখানে মূল সমস্যা করহার নয়, বরং করের স্তর নির্ধারণের পদ্ধতি। আয়ের সামান্য বৃদ্ধি একজন পেশাজীবীকে দ্রুত উচ্চ করের শ্রেণিতে ঠেলে দেয়। এতে মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়লেও, সেটি অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে না।
যেখানে ফাঁকি অসম্ভব, সেখানেই সবচেয়ে বেশি আদায়
শ্রীলঙ্কার কর প্রশাসনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো বেতনভোগীদের কর উৎসেই কেটে নেওয়া হয়। অর্থাৎ চাকরিজীবীর হাতে বেতন পৌঁছানোর আগেই কর কেটে রাখা হয়। এতে কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ কার্যত থাকে না।
অন্যদিকে স্বনিয়োজিত ব্যক্তি, ছোট ব্যবসায়ী কিংবা বেতনের বাইরে অন্য উৎস থেকে আয় করা মানুষের ক্ষেত্রে কর নির্ভর করে তাদের নিজস্ব ঘোষণার ওপর। সেখানেই দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। যাদের নিজেদের কর রিটার্ন জমা দেওয়ার কথা, তাদের বড় অংশ সময়মতো তা করেন না। ছোট ও মাঝারি করদাতাদের মধ্যে অনিয়মের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ফলে কর প্রশাসন সবচেয়ে সহজে যাদের কাছ থেকে আদায় করতে পারে, তাদের ওপরই নির্ভরতা ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে।
এটি একটি প্রশাসনিক বৈপরীত্য। আইন মানা নাগরিকদের কাছ থেকে কর সংগ্রহ সহজ বলে তাদের ওপর চাপ বাড়তে থাকে, কিন্তু যাদের ওপর নজরদারি কঠিন, তারা তুলনামূলকভাবে কম পর্যবেক্ষণের মুখে পড়েন।
করজালের বাইরে বিশাল কর্মসংস্থান
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশের মোট কর্মজীবী মানুষের বড় অংশই কার্যকর কর ব্যবস্থার আওতায় নেই। সরকারি তথ্য অনুযায়ী কর্মরত মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি হলেও, বেতনভিত্তিক কর ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত কর্মীর সংখ্যা তার তুলনায় অনেক কম। এর একটি অংশ অবশ্য স্বনিয়োজিত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই উৎসে কর কাটা সম্ভব নয়। কিন্তু উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানও কর প্রশাসনের নথিতে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
অর্থাৎ সমস্যা শুধু অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির নয়; আনুষ্ঠানিক খাতের মধ্যেও কর প্রশাসনের উপস্থিতি অসম্পূর্ণ। ফলে করের বোঝা বারবার একই শ্রেণির মানুষের ওপর গিয়ে পড়ছে।
অসাম্য শুধু আয়ে নয়, কর প্রদানের ক্ষেত্রেও
উপার্জনের পরিসংখ্যান দেখায়, উচ্চ আয়ের মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও তাদের আয়ের পরিমাণ অনেক বেশি। একই সঙ্গে সম্পদও সমাজের একটি ছোট অংশের হাতে কেন্দ্রীভূত। কিন্তু সেই সম্পদ ও উচ্চ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর আদায়ের ব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। অনেক উন্নত দেশে কর প্রশাসন উচ্চ আয় ও উচ্চ সম্পদের মানুষের ওপর বিশেষ নজরদারি বাড়িয়ে এই বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করেছে। শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও সেই ধরনের প্রশাসনিক সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
অন্যথায় করব্যবস্থা এমন এক অবস্থায় পৌঁছাবে, যেখানে কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ যাদের কম, তারাই সবচেয়ে বেশি মূল্য পরিশোধ করবে; আর জটিল আয় কাঠামোর সুবিধাভোগীরা তুলনামূলকভাবে কম নজরদারির মধ্যে থাকবে।
সমাধান করহার বাড়ানো নয়
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে সহজ পথ হতে পারে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর আরও কর আরোপ করা। কিন্তু সেটিই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান নয়। প্রথম কাজ হওয়া উচিত করজাল সম্প্রসারণ, যাতে নতুন করদাতারা ব্যবস্থার আওতায় আসেন। একই সঙ্গে আয়ভিত্তিক করের স্তরগুলো বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা দরকার। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে করমুক্ত সীমা ও কর কাঠামো সমন্বয় করাও জরুরি। সবচেয়ে বড় বিষয়, যাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেশি, তাদের কাছ থেকে ন্যায্য অংশের কর আদায় নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক কর-অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। রাজস্ব বাড়া অবশ্যই ইতিবাচক খবর। কিন্তু সেই রাজস্ব যদি প্রধানত একই শ্রেণির মানুষের কাছ থেকেই আসে, তবে সেটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই বা ন্যায্য করব্যবস্থার প্রমাণ নয়। একটি কার্যকর করনীতি কেবল রাজস্ব সংগ্রহে সফল হবে না; এটি নিশ্চিত করবে যে করের দায় সমাজে ন্যায্যভাবে বণ্টিত হয়েছে এবং প্রশাসনের সক্ষমতা এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যাতে আইনের প্রতি আনুগত্য দেখানো মানুষই বারবার সবচেয়ে বড় মূল্য না দেন। যতদিন সেই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন শ্রীলঙ্কার করব্যবস্থার সাফল্য আংশিকই থেকে যাবে।
রিফকা জিয়ার্দ 



















