রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় ইউরোপের সঙ্গে মিলে নতুন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে ইউক্রেন। ‘ফ্রেয়া’ নামের এই ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক নমুনা আগামী বছরের প্রথমার্ধের মধ্যেই প্রস্তুত করতে চায় কিয়েভ।
ইউক্রেনের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা পরিষদের উপসচিব দাভিদ আলোইয়ান জানিয়েছেন, প্রকল্পটির গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় নির্ধারণে গঠিত আন্তর্জাতিক পরিচালনা কমিটি শিগগিরই প্রথম বৈঠকে বসবে। দ্রুত কাজ এগিয়ে নিতে ইউক্রেন আগামী বছরের প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই এমন একটি প্রাথমিক নমুনা তৈরি করতে চায়, যা বাস্তবে এর কার্যকারিতা দেখাতে পারবে।
ইউক্রেনের বড় নির্ভরতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়
রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ইউক্রেন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশটির হাতে থাকা ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে রাশিয়ার দ্রুতগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নির্ভরযোগ্যভাবে ভূপাতিত করার সক্ষমতা মূলত এই ব্যবস্থারই রয়েছে।

তবে প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা, সীমিত মজুত এবং দীর্ঘ উৎপাদন সময় ইউক্রেনের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি মাসে কিয়েভ ও দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী ওদেসায় রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বেড়েছে। পর্যাপ্ত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের অভাবে ইউক্রেন অনেক হামলা ঠেকাতে পারেনি।
ইউরোপের প্রযুক্তি, ইউক্রেনের অস্ত্র
নতুন ফ্রেয়া প্রকল্পে ইউক্রেন নিজস্ব উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ও প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আশা করছেন, পরীক্ষার কাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে এক বছরের মধ্যেই ব্যবস্থাটি কার্যকর পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় অংশীদারদের কাছ থেকে আধুনিক রাডার, বিভিন্ন ধরনের শনাক্তকারী যন্ত্র এবং ক্ষেপণাস্ত্রের দিকনির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির সহায়তা পাওয়ার প্রত্যাশা করছে কিয়েভ।
এই উদ্যোগে ইউরোপের কয়েকটি বড় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে। ফ্রান্স ও ইতালির যৌথভাবে তৈরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নির্মাতা ইউরোসাম ছাড়াও ইতালির লিওনার্দো, ফ্রান্সের থ্যালেস এবং সুইডেনের সাব প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটির সঙ্গে রয়েছে।
ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফায়ার পয়েন্টকে প্রকল্পটির প্রধান শিল্প অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি জার্মান প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নির্মাতা হেনসোল্টের সঙ্গে রাডার সরবরাহের জন্য চুক্তিও করেছে।
কম খরচে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা
ফ্রেয়া প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো প্যাট্রিয়টের তুলনায় কম ব্যয়ে কার্যকর একটি ইউরোপীয় বিকল্প তৈরি করা। ইউরোপের অনেক দেশও বর্তমানে প্যাট্রিয়টের ওপর নির্ভরশীল।
ইউরোপে ব্যবহৃত অন্য কয়েকটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনো রাশিয়ার মতো শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর সক্ষমতা পুরোপুরি প্রমাণ করতে পারেনি। ফলে নতুন ব্যবস্থাটি ইউক্রেনের পাশাপাশি ইউরোপের অন্যান্য দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি এক ব্যবস্থায়
ফ্রেয়া ব্যবস্থাকে এমনভাবে তৈরি করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে বিভিন্ন দেশের তৈরি প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম একই কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করা যায়। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা এটিকে অনেকটা খেলনার খণ্ডাংশ জোড়া লাগানোর মতো নমনীয় ব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন।
অর্থাৎ কোনো দেশ চাইলে নিজস্ব রাডার ব্যবহার করতে পারবে, আবার অন্য দেশ নিজেদের তৈরি প্রযুক্তি যুক্ত করতে পারবে। এতে একটি নির্দিষ্ট নির্মাতার ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পটির অর্থায়ন নিশ্চিত করতে আলাদা তহবিল বা বিশেষ সংস্থা গঠনের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। ইউক্রেনের প্রত্যাশা, সরকারগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি যুক্ত থাকলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমবে এবং প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

ইউক্রেনের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
রাশিয়ার ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যে নিজস্ব ও ইউরোপীয় প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি ইউক্রেনের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিদেশি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমিত সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ফ্রেয়া নতুন দিগন্ত তৈরি করতে পারে।
আগামী বছরের প্রথমার্ধে পরীক্ষামূলক নমুনা তৈরি করা সম্ভব হলে পরবর্তী সময়ে এর সক্ষমতা যাচাই এবং ব্যাপক উৎপাদনের পথও খুলে যেতে পারে।
ইউক্রেনের নতুন ইউরোপীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ তাই শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা নয়; একই সঙ্গে ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সক্ষমতা শক্তিশালী করার বড় পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ইউক্রেনের নতুন ইউরোপীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফ্রেয়া ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে পরীক্ষামূলকভাবে প্রস্তুত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি ও অর্থায়নে ইউরোপের সহায়তা চায় কিয়েভ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















