ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে টানা প্রায় দুই সপ্তাহের ভয়াবহ হামলার পর পরিস্থিতিতে সাময়িক স্বস্তির আভাস দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র হামলা স্থগিত রাখলে ইরানও নিজেদের হামলা বন্ধ রাখবে বলে জানিয়েছে। তবে এই বিরতি স্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে তেহরানের মধ্যে এখনো গভীর সংশয় রয়েছে।
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালানো বন্ধ রাখলে ইরানও সামরিক অভিযান স্থগিত রাখবে। তাঁর ভাষায়, দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাতের বর্তমান অবস্থান এখনো ‘হামলার জবাবে হামলা’ নীতির ওপর নির্ভর করছে।
এর আগে টানা ১৩ রাত ইরানে বিমান হামলা চালানোর পর শুক্রবার রাতে যুক্তরাষ্ট্র অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করে। শনিবার ও রোববার নতুন করে কোনো মার্কিন হামলার খবর পাওয়া যায়নি। একই সময়ে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে এমন প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালানো থেকে বিরত রয়েছে।
কূটনীতির জন্য সময় দিতে হামলা স্থগিত
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কূটনৈতিক উদ্যোগকে আরও সময় দেওয়ার জন্য হামলায় বিরতি দেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই বিরতির মাধ্যমে আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে চাইছে ওয়াশিংটন।

তবে এই সিদ্ধান্তের পেছনে সামরিক বাস্তবতাও ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহের টানা হামলায় আগে থেকেই নির্ধারিত অনেক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে। ফলে নতুন করে বড় ধরনের অভিযান চালানোর সুযোগ সীমিত হয়ে আসছিল।
অস্ত্রের মজুত নিয়েও উদ্বেগ
মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভেতরে অস্ত্রের মজুত কমে আসা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের হামলা ঠেকাতে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবহৃত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের ওপর চাপ পড়েছে বলে জানা গেছে।
মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব মনে করছে, বড় ধরনের অভিযান আবার শুরু করলে সামরিক সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। তবে প্রয়োজন হলে অভিযান আবার শুরু করার পথ এখনো খোলা রয়েছে।
ইরানের মধ্যে বাড়ছে সন্দেহ
যুক্তরাষ্ট্রের হামলা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তকে খুব বেশি আশাবাদ নিয়ে দেখছে না ইরান। দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তেহরানে আশাবাদের চেয়ে সংশয়ই বেশি।
ইরানের দৃষ্টিতে এই বিরতি হয়তো কূটনৈতিক সমাধানের আন্তরিক উদ্যোগ নয়, বরং সাময়িক কৌশল হতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না তেহরান।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা
এই সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই সরু জলপথ দিয়ে চলাচল করে। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
গত দুই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পেছনে এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা ও ইরানের হুমকির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। পাল্টা জবাবে ইরান উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনাসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।

যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা
ইরানে সাধারণ মানুষের মধ্যেও যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সাময়িক বিরতির মধ্যেও অনেকেই মনে করছেন, যেকোনো সময় আবার হামলা শুরু হতে পারে।
দীর্ঘ সংঘাতের কারণে মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও ক্লান্তি তৈরি হয়েছে। একদিকে যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো স্পষ্ট নিশ্চয়তা নেই, অন্যদিকে বড় ধরনের নতুন হামলার আশঙ্কাও কাটেনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বর্তমান সাময়িক হামলা বন্ধের পরিস্থিতি কূটনৈতিক সমাধানের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করলেও দুই পক্ষের পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো বড় বাধা। ফলে এই বিরতি সত্যিকারের যুদ্ধবিরতিতে পরিণত হবে, নাকি নতুন করে সংঘাত শুরু হবে—সেদিকেই এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















