যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কৌশল দ্রুত বদলে নিচ্ছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলায় একই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের ভিন্ন গতি, উড্ডয়নপথ ও কৌশল ব্যবহার করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে দেশটি। এতে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
খাইবার শেকান এখন ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রভাণ্ডারে খাইবার শেকানকে তুলনামূলক কম খরচের, দ্রুত মোতায়েনযোগ্য ও নির্ভুল অস্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর পাল্লা প্রায় ১ হাজার ৪৫০ কিলোমিটার বা তারও বেশি। সাম্প্রতিক হামলায় এই ক্ষেপণাস্ত্রকে আরও জটিল কৌশলে ব্যবহার করছে ইরান।
যুদ্ধ নতুন করে শুরু হওয়ার পর ইরান মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে খাইবার শেকান ছুড়েছে। এসব হামলায় ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ, গতি ও উড্ডয়নের ধরনে পরিবর্তন আনা হচ্ছে, যাতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সহজে এগুলো শনাক্ত ও ধ্বংস করতে না পারে।
বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকালেও কিছু পৌঁছেছে লক্ষ্যে
যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীরা এখন পর্যন্ত অধিকাংশ খাইবার শেকান আকাশেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে নির্ধারিত এলাকায় পৌঁছেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাই ইরানের পরিবর্তনশীল যুদ্ধকৌশলের গুরুত্ব তুলে ধরছে।
ইরানের পুরোনো অনেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আগে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানি ভরার প্রয়োজন হতো। কিন্তু খাইবার শেকানের কিছু সংস্করণ আগে থেকেই জ্বালানিভর্তি ও প্রস্তুত অবস্থায় রাখা যায়। ফলে ট্রাক বা অন্য যানবাহনে দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়ে উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হয়।
এ ধরনের সক্ষমতা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোকে শত্রুপক্ষের বিমান হামলা থেকে আড়াল করার সুযোগও বাড়ায়।
লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে গতিপথ বদলের সক্ষমতা
খাইবার শেকানের কিছু সংস্করণে বিস্ফোরক বহনকারী সামনের অংশে ছোট একটি ইঞ্জিন থাকার কথা জানিয়েছেন সামরিক বিশ্লেষকরা। এর মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্রটি লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছানোর শেষ পর্যায়ে নিজের দিক কিছুটা পরিবর্তন করতে পারে।
প্রায় ঘণ্টায় ৯ হাজার ৬০০ কিলোমিটার গতিতে ছুটে চলা একটি ক্ষেপণাস্ত্র শেষ মুহূর্তে গতিপথ বদলাতে পারলে সেটিকে প্রতিহত করা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সাধারণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তর বা মহাকাশের কাছাকাছি উঠে পরে লক্ষ্যবস্তুর দিকে নেমে আসে। তবে সব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র একইভাবে গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে না। খাইবার শেকানের কিছু সংস্করণ তুলনামূলক বেশি গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
আকাশ প্রতিরক্ষার রাডারও ইরানের লক্ষ্য
ইরান শুধু ক্ষেপণাস্ত্র নয়, দ্রুতগতির আক্রমণকারী ড্রোনও একই সঙ্গে ব্যবহার করছে। একই এলাকার দিকে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র পাঠিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন সেনাদের আবাসিক এলাকাও হামলার লক্ষ্য হয়েছে। পাশাপাশি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ রাডার স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।
রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হলে আকাশ থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন শনাক্ত করার সক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফলে সামরিক ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন সেনাদের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাচ্ছে তেহরান
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি থেকে বোঝা যাচ্ছে, ইরান হামলার প্রতিটি ধাপ থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে পরবর্তী আক্রমণের কৌশল বদলানোর চেষ্টা করছে। কোন ধরনের গতিপথ বা কৌশল আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করতে তুলনামূলক বেশি কার্যকর, তা পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী হামলায় সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হচ্ছে।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা নয়, এগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটিও বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। ইরানের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট কর্মসূচির দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। যুদ্ধের মাঠে সেই সক্ষমতাকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ
ইরানের এই পরিবর্তিত কৌশল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষ করে একই সঙ্গে বিভিন্ন গতিপথে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করা হলে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, দুই পক্ষের প্রযুক্তি ও কৌশলগত অভিযোজন তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে সাম্প্রতিক পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কৌশল বদলে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















