ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এখনো আত্মবিশ্বাসী ভাষণ, যুদ্ধজয়ের প্রত্যয় এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর জবাব দেওয়ার হুমকি শোনা যাচ্ছে। দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ২১ জুলাই এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের পারমাণবিক ও কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালায়, তবে সেটিকে তারা পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের বিস্তার হিসেবে বিবেচনা করবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
কিন্তু সরকারি প্রচারণার এই দৃঢ় অবস্থানের বিপরীতে বাস্তবতা ভিন্ন। বিশেষ করে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে, যেখানে সাম্প্রতিক মার্কিন বিমান হামলার বেশিরভাগই পরিচালিত হয়েছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপের ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দারা শুধু বোমা হামলার আশঙ্কাই নয়, বহুদিন ধরে অবহেলিত অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে পড়ায় জীবনযাত্রার সংকটের কথাও তুলে ধরছেন।
প্যারিসভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বোর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষক মেহরান হাঘিরিয়ান বলেন, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে জর্ডান, কুয়েত, বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা হামলার খবর প্রচার করা হলেও দেশের ভেতরে যে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তা মূলত বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর পড়ছে।
তার ভাষায়, দক্ষিণাঞ্চলের শহরগুলোর মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে এবং বহু এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলে সংকট আরও গভীর
ইরানের দক্ষিণাঞ্চল দেশটির তেলসমৃদ্ধ দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে শুরু করে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগর ঘেঁষা বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত। এখানে রয়েছে বুশেহর, বন্দর আব্বাস ও পাকিস্তান সীমান্তের কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর চাবাহারের মতো শহর। একই সঙ্গে রয়েছে হরমুজ প্রণালির পাশে কেশম দ্বীপ, কিশ দ্বীপ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের দাবিকৃত কয়েকটি দ্বীপ।
এই অঞ্চলের জনসংখ্যা পারসিয়ানদের পাশাপাশি আরব, বেলুচ এবং আফ্রো-পারসিয়ান জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত। স্থানীয় অর্থনীতি মূলত বন্দরনির্ভর বাণিজ্য এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল।
বুশেহর ও বন্দর আব্বাসের কয়েকজন বাসিন্দা বিদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি। একটি হোটেলের কর্মচারী জানান, পর্যটক প্রায় নেই বললেই চলে। মানুষ একদিকে সরকারি নজরদারি, অন্যদিকে মার্কিন হামলার ভয়ে দিন কাটাচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও মানুষ প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেট্রোল পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র ২০ লিটার জ্বালানি সংগ্রহ করছে। দীর্ঘ সারি এখন শহরের স্বাভাবিক দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হামলার লক্ষ্য শুধু সামরিক নয়
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসের যুদ্ধের সময় সেতু, মহাসড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র, সামরিক রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও ব্যারাকে হামলা চালানো হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল স্পষ্টভাবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের দিকে কেন্দ্রীভূত। এজন্য দক্ষিণাঞ্চলে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
২৩ জুলাই আহভাজ, বন্দর আব্বাস এবং কেশম দ্বীপের উপকূলে নতুন হামলার খবর প্রকাশ করে ইরানের সংবাদমাধ্যম।
এর আগে দেশটির যোগাযোগমন্ত্রী জানান, মার্কিন হামলার কারণে দক্ষিণের কয়েকটি দ্বীপ মূল ভূখণ্ড থেকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
কেশম দ্বীপের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে, বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ঘটছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, এসব হামলায় বহু বেসামরিক নাগরিক নিহতও হয়েছেন।
ভেঙে পড়ছে অর্থনীতি ও যোগাযোগ
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চল তুলনামূলক দরিদ্র, জনবসতি কম এবং জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যময় হওয়ায় এই অঞ্চল দেশটির দুর্বলতার অন্যতম কেন্দ্র।
হাঘিরিয়ান বলেন, ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে পাল্টা হামলা চালালেও দক্ষিণাঞ্চলের সেতু, সড়ক ও পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র ধ্বংসের ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়।
দক্ষিণাঞ্চলের পরিবারগুলো প্রায়ই বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে থাকে। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে নিয়মিত দীর্ঘ পথ ভ্রমণ করতে হয়। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় তাদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
তার মতে, হরমুজের আশপাশে যেসব এলাকা বেশি আক্রান্ত হয়েছে, সেখানে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক রয়েছে—এমন আরব বংশোদ্ভূত ইরানিদের সংখ্যা বেশি।
ক্ষোভ থাকলেও নীরব মানুষ
হাঘিরিয়ান বলেন, জানুয়ারিতে সরকার যেভাবে বিক্ষোভ দমন করেছিল, তার পর থেকে স্থানীয় মানুষ নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করতেও ভয় পাচ্ছে।
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক অধ্যাপক নাহিদ সিয়ামদুস্ত বলেন, যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কথিত মার্কিন হামলায়। ওই হামলায় ১২০ জন শিক্ষার্থী এবং ৪৮ জন অভিভাবক ও শিক্ষক নিহত হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তার মতে, ৪০ দিনের যুদ্ধ হোক কিংবা বর্তমান হামলা—সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের সাধারণ মানুষ। যারা নিজেদের ছোট সন্তানদেরও হারিয়েছে।
হাঘিরিয়ান বলেন, ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই সংকটে ছিল, তবে গত এক বছরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ফলে মানুষের অসন্তোষও ক্রমাগত বাড়ছে।
সামরিক সাফল্যের আড়ালে নতুন ঝুঁকি
যুদ্ধবিরতির পর আবার সংঘাত শুরু হলেও ইরানের সামরিক সক্ষমতা অনেক বিশ্লেষককে বিস্মিত করেছে। দেশটি জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহৃত ঘাঁটিতে দূরপাল্লার নির্ভুল হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২১ জুলাই বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত একটি হোটেলেও ইরানের হামলার খবর প্রকাশিত হয়।
একই সঙ্গে দেশটির গোয়েন্দা সক্ষমতাও অক্ষুণ্ন রয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তবে জুলাইয়ের শুরুতে বাহরাইন ও কুয়েত গোপনে ইরানের অভ্যন্তরে হামলায় অংশ নিয়েছে বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা সংঘাতকে আরও জটিল করেছে।
দক্ষিণাঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা
বার্লিনভিত্তিক জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ইরান বিশেষজ্ঞ হামিদরেজা আজিজি বলেন, দক্ষিণ উপকূলে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ইরানের গোয়েন্দা, নজরদারি ও তথ্যসংগ্রহ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করছে এবং একই সঙ্গে সেন্টকম অঞ্চলে শক্তিশালী নৌ উপস্থিতি বজায় রেখেছে, তাতে দীর্ঘমেয়াদে ইরানের জন্য গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তার মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো যদি ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতায় এগিয়ে যায়, তাহলে দক্ষিণাঞ্চলে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
দ্রুত পুনর্গঠনের চেষ্টা
ইরানি কর্তৃপক্ষও দক্ষিণাঞ্চলের ঝুঁকি উপলব্ধি করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দক্ষিণের দিকে সাঁজোয়া যান বহনকারী সামরিক ট্রাকের বহর যেতে দেখা গেছে, যা সম্ভাব্য স্থল অভিযানের প্রস্তুতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সেতু, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো দ্রুত পুনর্নির্মাণের প্রচার চালাচ্ছে।
২০ জুলাই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি বলেন, বেসামরিক অবকাঠামো, হাসপাতাল, সেতু এবং মানুষের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য সেবার ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আজ আমরা শুধু স্লোগানে নয়, বিশ্বাস থেকে ইরানের দক্ষিণের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। কারণ ইরানের দক্ষিণই ইরান।
বোরজু দারাগাহি 



















