নয়াদিল্লি— ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান শনিবার পদত্যাগ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে দেশের তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে। মাত্র কয়েক মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মিম ও ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা হিসেবে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন জাতীয় পর্যায়ের গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর আন্দোলনের নেতারা ঘোষণা দেন, সরকার তাদের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি মেনে নেওয়ায় আপাতত আন্দোলন স্থগিত করা হবে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে চলতি বছরের বিতর্কিত মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান।
শনিবার এক্স (সাবেক টুইটার)-এ দেওয়া এক পোস্টে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ লিখেছে, “আজ জয় হয়েছে শিক্ষার্থীদের।”
ভর্তি পরীক্ষা কেলেঙ্কারি থেকে আন্দোলনের সূচনা
চলতি বছরের স্নাতক পর্যায়ের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা জালিয়াতি ও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। এই ঘটনার পর থেকেই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। রাজধানী নয়াদিল্লিতে হাজারো শিক্ষার্থী ও তরুণ রাস্তায় নেমে এলে তা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ মূলত একটি ব্যঙ্গাত্মক ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে জন্ম নেওয়া যুব আন্দোলন। মে মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক শীর্ষ বিচারপতি বেকার তরুণদের ‘ককরোচ’ ও ‘পরজীবী’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। একই সময়ে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার কেলেঙ্কারিও প্রকাশ্যে আসে। এই দুটি ঘটনাই আন্দোলনের জন্ম দেয়।
সোনম ওয়াংচুকের অনশন আন্দোলনে গতি আনে
লাদাখের পরিবেশবাদী ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। ৫৯ বছর বয়সী ওয়াংচুক আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থন বাড়াতে টানা ২৬ দিন অনশন করেন।
সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পর শুক্রবার তিনি অনশন ভাঙেন। হাসপাতালের শয্যা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজয়সূচক ভঙ্গিতে নিজের একটি ছবি প্রকাশ করে তিনি লেখেন,
“ককরোচ জনতা পার্টি, দেশের জেন-জেড প্রজন্ম এবং ভয়কে জয় করে দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে উঠে আসা সব নাগরিককে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ।”
এরপর তিনি আরও লেখেন, “এবার জবাবদিহিতা থেকে সংস্কারের পথে।”
শিক্ষা ও পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রস্তাব
আন্দোলনের এক প্রতিনিধি জানিয়েছেন, তারা শিক্ষা ও পরীক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কারের জন্য সরকারের কাছে বিস্তারিত প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। এক মাস পর উভয় পক্ষ আবার বৈঠকে বসবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এছাড়া সরকার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশি ব্যবস্থা না নেওয়ারও আশ্বাস দিয়েছে বলে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ জানিয়েছে।
এ বিষয়ে ভারতের পুলিশ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

পুলিশের অভিযানে আরও বিস্তৃত হয় আন্দোলন
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাজধানী দিল্লিতে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি দিয়েই আন্দোলনের শুরু হয়েছিল। অনশন চলাকালে ওয়াংচুক মঞ্চেই অবস্থান করছিলেন। পরে সংসদ ভবনের উদ্দেশে পদযাত্রার আগেই পুলিশ তাকে জোর করে একটি সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়।
এই ঘটনার পর হাজার হাজার তরুণ ক্ষুব্ধ হয়ে সংসদের দিকে মিছিল শুরু করেন। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়। এতে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী আহত হন। পুলিশ সদস্যদেরও অনেকে আহত হয়েছেন।
পুলিশের কঠোর অবস্থানের প্রতিবাদে এরপর প্রতিদিনই হাজার হাজার মানুষ আন্দোলনে যোগ দিতে শুরু করেন।
শিক্ষামন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
শনিবার দেওয়া এক বার্তায় ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত।
তিনি বলেন, “এটি আমার ব্যক্তিগত সম্মানের প্রশ্ন নয়। ভারতের যুবশক্তিই এই দেশের প্রকৃত শক্তি।”
মোদি সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক সংকেত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
ভারতে প্রতি বছর লাখো শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও সরকারি চাকরির সুযোগ পাওয়ার আশায় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেয়। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণদের কাছে এসব পরীক্ষা সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির প্রধান পথ। এই শ্রেণিই মোদির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাংক।
নয়াদিল্লিভিত্তিক নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান পলিসি মঙ্কস-এর অংশীদার ভাস্কর পান্ত বলেন, এটি আর কেবল একটি ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক নয়।
তার ভাষায়, “মানুষের বিশ্বাস ভেঙে যাচ্ছে যে কঠোর পরিশ্রম করে এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতার মাধ্যমে জীবনে উন্নতি করা সম্ভব।”
সামনে উত্তর প্রদেশ নির্বাচন
ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে আগামী বছরের শুরুতে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নির্বাচন তিন বছর পরের জাতীয় নির্বাচনের আগে জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হবে।
সে কারণে ‘ককরোচ’ আন্দোলনের এই সাফল্য শুধু একটি মন্ত্রীর পদত্যাগেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভারতের তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক প্রভাব এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে বাড়তে থাকা অসন্তোষেরও স্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রিপতি লাহিড়ি ও কৃষ্ণ পোখারেল 



















