ভারতের সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী আন্দোলনকে কেবল একটি পরীক্ষা-সংক্রান্ত সংকট বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে আরও গভীর এক প্রশ্ন—রাষ্ট্র কি এখনো তরুণদের সেই প্রতিশ্রুতি দিতে সক্ষম, যেখানে শিক্ষা হবে সামাজিক অগ্রগতি, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পথ? আর এই প্রশ্নটি সবচেয়ে জোরালোভাবে তুলেছেন তরুণীরা।
দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে শিক্ষা ছিল জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়। কঠোর পরিশ্রম, মেধা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্য—এই সমীকরণই ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা বলে শেখানো হয়েছে একটি পুরো প্রজন্মকে। কিন্তু বাস্তবতা এখন সেই বিশ্বাসকে ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি আজ আর কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেয় না। অন্যদিকে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোও প্রশ্নফাঁস, অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ফলে বছরের পর বছর ধরে প্রস্তুতি নেওয়া লাখো শিক্ষার্থীর সামনে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তার এক নির্মম বাস্তবতা। যারা সৎভাবে লড়াই করছে, তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এমন একটি ব্যবস্থার ওপর, যার প্রতি আস্থা দিন দিন ক্ষয় হচ্ছে।
এই সংকটের সবচেয়ে নির্মম দিক হলো এর মানবিক মূল্য। একটি পরীক্ষা বাতিল হওয়া মানে কেবল আরেকটি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা নয়; এর অর্থ বহু পরিবারের আর্থিক চাপ, মানসিক অবসাদ, আত্মবিশ্বাসের ভাঙন এবং অনেক ক্ষেত্রে জীবন সম্পর্কে আশাহীন হয়ে পড়া। যেসব তরুণ-তরুণী নিজেদের সবকিছু উজাড় করে একটি সুযোগের জন্য অপেক্ষা করে, তাদের কাছে এমন ব্যর্থতা শুধু প্রশাসনিক ত্রুটি নয়—এটি ব্যক্তিগত বিপর্যয়।
এই বাস্তবতাই ব্যাখ্যা করে কেন দিল্লির যন্তর মন্তরের আন্দোলনে এত বিপুলসংখ্যক তরুণীকে দেখা গেছে। তারা কেবল পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার বিরোধিতা করতে আসেননি; তারা এমন একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, যা তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
নারীদের জন্য এই সংকটের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ উচ্চশিক্ষা তাদের কাছে শুধু একটি পেশাগত যোগ্যতা নয়, বরং আত্মনির্ভরতার দরজা। বহু পরিবারের তরুণীরা পড়াশোনার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পায়, বাড়ির বাইরে থাকার অভিজ্ঞতা অর্জন করে, নতুন সম্পর্ক ও নতুন চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হয়। একজন চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা গবেষক হওয়ার স্বপ্ন তাই তাদের কাছে কেবল একটি পেশা নয়; এটি স্বাধীনতার আরেক নাম।
কিন্তু যখন পরীক্ষা বারবার বাতিল হয়, নিয়োগ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয় বা শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট হয়, তখন এই স্বাধীনতার জানালাটিও সংকুচিত হতে থাকে। পরিবারগুলো অনেক সময় মেয়েদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ দিলেও পরে বিয়ে এবং “স্থায়ী হওয়ার” সামাজিক চাপ দ্রুত বেড়ে যায়। ফলে একটি ব্যর্থ শিক্ষা ব্যবস্থা নারীদের জন্য দ্বিগুণ বৈষম্য সৃষ্টি করে।
এই কারণেই আন্দোলনের প্রথম সারিতে নারীদের উপস্থিতি কাকতালীয় নয়। ভারতীয় গণআন্দোলনের ইতিহাসে এই দৃশ্য নতুনও নয়। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে চিপকো আন্দোলন, নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন, শাহিনবাগ কিংবা মণিপুরের নাগরিক প্রতিবাদ—প্রতিবারই নারীরা কেবল অংশগ্রহণকারী হিসেবে নয়, আন্দোলনের নৈতিক শক্তি হিসেবে সামনে এসেছেন।

সাম্প্রতিক আন্দোলনও সেই ধারাবাহিকতারই নতুন অধ্যায়। তরুণ নারী শিক্ষার্থীরা অনশন করেছেন, সংগঠন পরিচালনা করেছেন, চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন, খাবার বিতরণ করেছেন এবং আন্দোলনের প্রতিটি স্তরে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী নারী প্রমাণ করেছেন যে কোনো গণআন্দোলন কেবল মঞ্চের বক্তৃতায় নয়, অদৃশ্য শ্রমের ওপরও দাঁড়িয়ে থাকে।
রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াও পরিচিত এক চিত্র তুলে ধরেছে। প্রথমে কঠোর পুলিশি ব্যবস্থা, লাঠিচার্জ ও দমন; পরে আন্দোলনের ব্যাপকতা উপলব্ধি করে সরকারের নীতিগত ছাড়। ভারতের ইতিহাসে এই ধারা একাধিকবার দেখা গেছে। ২০১২ সালের দিল্লির গণধর্ষণ-পরবর্তী বিক্ষোভেও প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল বলপ্রয়োগ, পরে সরকারকে আইন পরিবর্তন এবং স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের পথে যেতে হয়েছিল।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিবাদকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ নাগরিকরা যখন বিশ্বাস হারায় যে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে, তখন রাস্তাই হয়ে ওঠে তাদের শেষ আশ্রয়।
এই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর প্রজন্মগত চরিত্র। আজকের তরুণীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দক্ষ, সংগঠিত হতে সক্ষম এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। তারা কেবল নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলছে না; তারা শিক্ষা, গণতন্ত্র এবং জবাবদিহিতার সম্পর্কও সামনে আনছে।
সরকার শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কয়েকটি দাবি মেনে নিয়েছে এবং শিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগও ঘটেছে। এটি নিঃসন্দেহে আন্দোলনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য। কিন্তু প্রকৃত পরীক্ষা এখন শুরু। নেতৃত্ব পরিবর্তন কোনো শিক্ষা ব্যবস্থাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুশাসিত করে না। প্রশ্নফাঁস রোধ, পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, নিয়োগে জবাবদিহিতা এবং তরুণদের আস্থা পুনর্গঠন—এসব ক্ষেত্রেই এখন বাস্তব সংস্কার প্রয়োজন।
যন্তর মন্তরের আন্দোলন শেষ হয়েছে, উৎসবও হয়েছে। কিন্তু এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার সম্ভবত অন্য কোথাও। নতুন প্রজন্মের নারীরা আবারও দেখিয়ে দিয়েছেন যে যখন শিক্ষা, স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন একসঙ্গে হুমকির মুখে পড়ে, তখন প্রতিবাদের সামনের সারিতে দাঁড়াতে তারা দ্বিধা করেন না। কারণ তারা জানেন, একটি ভেঙে পড়া শিক্ষাব্যবস্থা কেবল পরীক্ষায় ব্যর্থ করে না—এটি একটি সমাজের স্বাধীনতা, সমতা এবং গণতান্ত্রিক সম্ভাবনাকেও দুর্বল করে দেয়।
নমিতা ভান্ডারে 



















