কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজগতে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে। কিন্তু বিতর্কের মূল প্রশ্নটি প্রযুক্তি নয়। আসল প্রশ্ন হলো, এমন একটি মানসিকতা কীভাবে তৈরি হলো যেখানে প্রতারণা আর নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয় না; বরং অনেকের কাছে তা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কৌশল। আজকের উচ্চশিক্ষার বড় সংকট সম্ভবত এটাই—সততার সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে, আর সাফল্যই হয়ে উঠছে একমাত্র নৈতিক মানদণ্ড।
সম্প্রতি সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি সরকারি গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত জরিপ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে অনুমান করা হয়েছে, প্রায় ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে পরীক্ষা বা একাডেমিক কাজে প্রতারণা করেছে। যারা প্রতিদিন এআই ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে এই হার বেড়ে ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। সংখ্যাটি যতটা উদ্বেগজনক, তার চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হলো এর সামাজিক অর্থ। এটি বিচ্ছিন্ন কিছু শিক্ষার্থীর আচরণ নয়; বরং পরিবর্তিত এক একাডেমিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত।
এর একটি আলোচিত উদাহরণ এসেছে ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। দীর্ঘ তিন দশক ধরে অর্থনীতি পড়ানো অধ্যাপক রবার্তো সেরানো শিক্ষার্থীদের ঘরে বসে মধ্যবর্তী পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেন। প্রশ্নপত্র কঠিন করা হয়েছিল, সময়ও ছিল সীমাহীন। তবু পরীক্ষার গড় নম্বর, যা সাধারণত ৬৫ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে থাকত, হঠাৎ বেড়ে দাঁড়ায় ৯৬ শতাংশে। অস্বাভাবিক এই ফলাফল দেখে তিনি চূড়ান্ত পরীক্ষা শ্রেণিকক্ষে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপরই একদল শিক্ষার্থী কোর্স ছেড়ে দেয়, আরও কয়েকজন পরীক্ষায়ই অংশ নেয়নি। যারা পরীক্ষা দিয়েছিল, তাদের গড় নম্বর নেমে আসে ৪৮.৬ শতাংশে।
পরবর্তীতে একই শিক্ষার্থীদের দুটি পরীক্ষার ফল তুলনা করলে আরও বিস্ময়কর চিত্র সামনে আসে। যারা অনলাইনে প্রায় নিখুঁত নম্বর পেয়েছিল, তাদের কেউ কেউ শ্রেণিকক্ষের পরীক্ষায় শূন্যও পেয়েছে। আবার হাতে গোনা কয়েকজনের ফল দুই পরীক্ষাতেই প্রায় একই ছিল। অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু ব্যক্তিগত সততার নয়; বরং প্রযুক্তিনির্ভর শর্টকাট কতটা বিস্তৃত হয়েছে, সেটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তবে এটিকে কেবল এআইয়ের সমস্যা বললে বিষয়টি ছোট করে দেখা হবে। কারণ প্রযুক্তি কেবল একটি মাধ্যম। এর পেছনে রয়েছে এমন এক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, যেখানে লক্ষ্য অর্জনই সবকিছু, আর সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ কতটা নৈতিক, তা ক্রমশ গুরুত্ব হারাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলছেন। ইউনিভার্সিটি অব লুইসভিলের সহযোগী অধ্যাপক অ্যামি ক্লুকির মতে, তাঁর একটি অনলাইন কোর্সে অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী এআই-নির্ভর নকল করেছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক শিক্ষার্থী এটিকে অস্বাভাবিক কিছু মনে করে না। তাদের যুক্তি, “সবাই তো করছে।”
মিডলবেরি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আমান্ডা গ্রেগও একই প্রবণতার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ, বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতারণার বিরুদ্ধে সামাজিক নিন্দা বা সহপাঠীদের চাপ প্রায় অনুপস্থিত। অথচ কয়েক দশক আগেও নকল ধরা পড়লে তা শুধু শাস্তির বিষয় ছিল না; সামাজিকভাবেও তা লজ্জাজনক বলে বিবেচিত হতো। এখন সেই মানসিক বাধা অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে।
এই পরিবর্তনকে বোঝার জন্য শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রের দিকে তাকালে চলবে না। উচ্চশিক্ষার বৃহত্তর পরিবেশেও একই প্রবণতা দৃশ্যমান। মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, আকর্ষণীয় চাকরি, সামাজিক পরিচিতি কিংবা প্রতিষ্ঠিত নেটওয়ার্ক—এসব অর্জনই যেন সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড। ফলাফলই যখন সবকিছু নির্ধারণ করে, তখন সেই ফল অর্জনের পদ্ধতি নিয়ে আপস করাও অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি উদাহরণ এ বাস্তবতাকে ভিন্ন দিক থেকে তুলে ধরে। সেখানে প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিভিন্ন ধরনের বিশেষ সুবিধা পায়—যেমন পরীক্ষায় অতিরিক্ত সময়, অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে ছাড় বা আবাসন বাছাইয়ে অগ্রাধিকার। স্ট্যানফোর্ডের শিক্ষার্থী এলসা জনসন লিখেছেন, তাঁর সহপাঠীদের মধ্যে এ ধরনের সুবিধা পাওয়ার উপায় নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা হয়। অনেকের ধারণা, যদি কেউ এসব সুবিধা না নেয়, তবে সে যথেষ্ট চেষ্টা করেনি।
এখানেও মূল সমস্যা বিশেষ প্রয়োজনসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য বৈধ সহায়তা নয়। বরং উদ্বেগের বিষয় হলো, যখন প্রকৃত প্রয়োজনের বাইরে এসব সুবিধা পাওয়াকে প্রতিযোগিতামূলক কৌশল হিসেবে দেখা শুরু হয়, তখন ন্যায্যতার ধারণাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দ্য আটলান্টিকের তথ্য অনুযায়ী, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলেতেও গত এক দশকের মধ্যে বিশেষ সুবিধা পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই বৃদ্ধির পেছনে নানা বৈধ কারণ থাকতে পারে। কিন্তু যদি এর একটি অংশও অযৌক্তিক দাবি বা দুর্বল যাচাইয়ের ফল হয়, তবে সেটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন তৈরি করে।
উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল দক্ষ কর্মী তৈরি করা নয়; বরং এমন নাগরিক গড়ে তোলা, যাদের বিচারবোধ, সততা এবং দায়িত্ববোধ সমাজকে শক্তিশালী করবে। যদি শিক্ষাজীবনের শুরুতেই বার্তা যায় যে সফল হওয়াই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ, আর নিয়ম ভেঙে হলেও সেই সাফল্য অর্জন করা গ্রহণযোগ্য, তাহলে তার প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে কর্মক্ষেত্র, রাষ্ট্র এবং জনজীবনেও পড়বে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতের শিক্ষা ও কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে। তাই এআইকে নিষিদ্ধ করাই সমাধান নয়। বরং জরুরি হলো এমন একটি একাডেমিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে প্রযুক্তি শেখার সহায়ক হবে, প্রতারণার অস্ত্র নয়। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এমন পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে, যেখানে সততা কেবল নিয়ম মানার বিষয় নয়, বরং ব্যক্তিগত মর্যাদা ও সামাজিক বিশ্বাসের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।
কারণ কোনো শিক্ষা ব্যবস্থা তখনই সংকটে পড়ে, যখন মানুষ প্রতারণা করে—এমন নয়; প্রকৃত সংকট শুরু হয় তখন, যখন প্রতারণাকেই সাফল্যের বৈধ পথ হিসেবে দেখা শুরু হয়।
নাটালি স্যান্ডোভাল 



















