যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দুই মাস পরও সুদের হার, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করছেন না। বরং গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্নগুলো নিয়ে একের পর এক বিশেষজ্ঞ টাস্কফোর্স গঠন করে সিদ্ধান্তের বিষয়টি তাদের পর্যালোচনার ওপর ছেড়ে দিচ্ছেন তিনি।
আগামী মঙ্গলবার থেকে শুরু হতে যাওয়া ফেডের বৈঠককে ঘিরে তাই অনিশ্চয়তা বাড়ছে। চলতি বছরে প্রথমবারের মতো সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।
সুদের হার নিয়ে ওয়ার্শের নীরবতা
ওয়ার্শের দায়িত্ব নেওয়ার পর ফেডের যোগাযোগের ধরনেও বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। আগের চেয়ারম্যানদের মতো তিনি বৈঠকের আগে সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দিতে চাইছেন না।
তার যুক্তি, আগাম সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলে নীতিনির্ধারকেরা নিজেদের আগের ধারণার সঙ্গে মিল থাকা তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন এবং বিপরীত তথ্য উপেক্ষা করার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই প্রতিটি বৈঠককে তিনি এমন একটি আলোচনার ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে চান, যেখানে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মতবিনিময়ের সুযোগ থাকবে।
কংগ্রেসে সাম্প্রতিক সাক্ষ্য দেওয়ার সময়ও ওয়ার্শ বলেছেন, ফেড সঠিক নীতি গ্রহণ করতে পারলে গত পাঁচ বছরের মূল্যস্ফীতির চাপ অতীত হয়ে যাবে। তবে সেই লক্ষ্যে সুদের হার বা অন্যান্য নীতিগত পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো অবস্থান জানাননি।
মূল্যস্ফীতি এখনও লক্ষ্যের ওপরে
যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ, যা ফেডের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যের চেয়ে অনেক বেশি। এ অবস্থায় সুদের হার বাড়ানোর প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
অন্যদিকে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে সুদের হার কমানোর জন্য চাপ দিয়ে আসছেন। ফলে ফেড যদি এবার সুদের হার বাড়ায়, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে।
ওয়ার্শের নীরবতা অবশ্য রাজনৈতিক দিক থেকে ফেডের জন্য কিছুটা সুবিধাজনকও হতে পারে। কারণ চেয়ারম্যান যত কম নিজের অবস্থান প্রকাশ করবেন, তাকে রাজনৈতিক চাপের লক্ষ্যবস্তু বানানো তত কঠিন হতে পারে।
দুই দশকের স্বচ্ছতার ধারায় পরিবর্তন
ফেড গত দুই দশকে ধীরে ধীরে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং অর্থনৈতিক মূল্যায়ন নিয়ে বেশি কথা বলার সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল। বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে চেয়ারম্যান সাধারণত অর্থনীতির অবস্থা, মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হার নিয়ে নীতিনির্ধারকদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতেন।
ওয়ার্শ সেই ধারায় পরিবর্তন আনছেন। প্রতিটি বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলন করবেন কি না, সেটিও এখনো নিশ্চিত করেননি। এ বিষয়টিও একটি বিশেষজ্ঞ টাস্কফোর্স পর্যালোচনা করছে।
মূল্যস্ফীতি পরিমাপের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অবস্থান দেখা গেছে। এর আগে কোন সূচককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত সে বিষয়ে ওয়ার্শের কিছু বক্তব্য থাকলেও পরে তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট সূচককে তিনি সমর্থন করেননি। বরং বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনার জন্য বিশেষজ্ঞদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
নীরবতা কি বাজারে ঝুঁকি বাড়াবে
ফেড চেয়ারম্যানের কম কথা বলার নীতিতে এখন পর্যন্ত বড় কোনো সংকট তৈরি হয়নি। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে গেলে এই কৌশল কতটা কার্যকর থাকবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
হঠাৎ মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে, বেকারত্ব দ্রুত বাড়লে কিংবা আর্থিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলে বিনিয়োগকারীরা ফেডের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে চেয়ারম্যানের কাছ থেকে স্পষ্ট সংকেত চাইবেন। তখন শুধু বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনার কথা বললে বাজারের উদ্বেগ কমানো কঠিন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেড কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলে সেই সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করা জরুরি। কারণ ব্যাখ্যা না থাকলে বিনিয়োগকারীরা নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্তের অর্থ খুঁজে নিতে পারেন। এতে বাজারে অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সামনে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। ফলে ফেডের সামনে আপাতত সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সুযোগ রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সংঘাত বাড়ায় তেলের দাম কিছুটা বেড়েছে, যা ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে আগামী বৈঠকে ওয়ার্শের নেতৃত্বাধীন ফেড কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই এখন নজর অর্থনীতিবিদ ও বিনিয়োগকারীদের। সুদের হার বাড়ানো হলে তার কারণ কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয় এবং চেয়ারম্যান কতটা স্পষ্ট অবস্থান নেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ওয়ার্শের বর্তমান কৌশল হয়তো শান্ত সময়ে কার্যকর থাকতে পারে। কিন্তু অর্থনীতিতে বড় কোনো ধাক্কা এলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বকে শেষ পর্যন্ত নীরবতার বদলে স্পষ্ট বার্তা দিতেই হতে পারে।
ফেড চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শের নীরবতা এখন তাই শুধু যোগাযোগের কৌশল নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
নতুন ফেডপ্রধানের নীরবতায় সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে; আগামী বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই নজর বিশ্ববাজারের।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















