ওয়াশিংটন ডিসির রেস্তোরাঁপাড়ায় একসময় বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিচে খাবার খাওয়ার ব্যবস্থা। করোনাকালের সংকটে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে চালু হওয়া এসব অস্থায়ী খাবারের স্থান এখন নতুন নিয়ম, বাড়তি খরচ ও জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়ার কারণে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
মাউন্ট প্লেজ্যান্ট এলাকার ফিলিপিনো রেস্তোরাঁ পার্পল প্যাচের রাস্তার পাশের খাবারের স্থানটি বন্ধ করার আগে ১২ জুলাই আয়োজন করা হয় বিদায় অনুষ্ঠান। সেখানে প্রায় ৯০ জন মানুষ অংশ নেন। অনেকের কাছে জায়গাটি শুধু খাবার খাওয়ার স্থান ছিল না, বরং জন্মদিন, বাগদান, বিয়েসহ নানা স্মরণীয় মুহূর্তের অংশ ছিল।
একসময় ছিল ১০টি, এখন মাত্র একটি
মাউন্ট প্লেজ্যান্ট স্ট্রিটের একটি অংশে একসময় এমন ১০টি খাবারের স্থান ছিল। চলতি জুলাইয়ে সেখানে টিকে আছে মাত্র একটি।
২০২০ সালের জুনে করোনাকালের বিশেষ ব্যবস্থায় এসব রাস্তার পাশের খাবারের স্থান তৈরির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। রেস্তোরাঁগুলো গলি, পার্কিংয়ের জায়গা কিংবা সড়কের কিছু অংশ ব্যবহার করে বাইরে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারত। মহামারির সময় অনেক ছোট ব্যবসার জন্য এই ব্যবস্থা ছিল টিকে থাকার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
তবে অস্থায়ী অনুমতির সময়সীমা শেষ হওয়ার পর স্থায়ী ব্যবস্থার জন্য নতুন নিয়ম চালু করা হয়। নতুন ব্যবস্থায় প্রতি বর্গফুট সরকারি জায়গার জন্য বছরে ১৫ ডলার দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি যানবাহন থেকে খাবারের স্থান আলাদা রাখতে প্রায় তিন ফুট উঁচু কংক্রিটের প্রতিবন্ধক বসানোর বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।
অনুমোদনের পথেই বড় বাধা
নতুন নিয়মের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনুমোদনের দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। আবেদন করতে পরিবহন বিভাগ ছাড়াও ভবন বিভাগ এবং মদ ও গাঁজা নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে। কোথাও আবার স্থানীয় বৃক্ষ বিশেষজ্ঞ ও ঐতিহাসিক সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনও দরকার হচ্ছে।
মাউন্ট প্লেজ্যান্টের পিজা ব্যবসায়ী তারা স্মিথ স্থায়ী খাবারের স্থান তৈরির অনুমোদনের আবেদনকে প্রায় পূর্ণকালীন চাকরির মতো কঠিন বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি নিজে প্রায় সাত মাস অপেক্ষার পর অনুমোদন পান।
জুলাইয়ের ২৪ তারিখ পর্যন্ত স্থায়ী অনুমতির জন্য সক্রিয় থাকা ৭৮টি আবেদনের মধ্যে ৪৩টি অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি প্রতিষ্ঠান নতুন করে তাদের খাবারের স্থান তৈরি করেছে।
বাড়ছে খরচ, কমছে আসন
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শুধু সরকারি ফিই নয়, স্থপতি, নির্মাণকর্মী ও নিরাপত্তা প্রতিবন্ধক ভাড়ার খরচও তাদের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। আটজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, নতুন নিয়মের খরচ ও জটিলতা তাদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুজন ব্যবসায়ী স্থায়ী অনুমতির জন্য আবেদনই করেননি, কারণ বিনিয়োগের তুলনায় সম্ভাব্য লাভকে তারা আর যথেষ্ট মনে করেননি।
পার্পল প্যাচের পুরোনো খাবারের স্থানে একসঙ্গে ৯৬ জন বসতে পারতেন। এটি মৌসুমভেদে রেস্তোরাঁটির মোট আয়ের প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত এনে দিত। নতুন স্থায়ী ব্যবস্থায় বসার সুযোগ কমে হবে মাত্র ২২ জনের।
রেস্তোরাঁটির মালিক প্যাট্রিস ক্লিয়ারি জানিয়েছেন, পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুনটি তৈরির খরচই প্রায় ১২ হাজার ডলার হতে পারে। এর সঙ্গে অনুমোদন ফি হিসেবে আরও ৬ হাজার ৮৪১ ডলার দিতে হয়েছে। স্থপতি ও আবেদন প্রক্রিয়ায় সহায়তার খরচও আলাদা।
কর্মসংস্থান নিয়েও শঙ্কা
খাবারের জায়গা ছোট হয়ে যাওয়ায় কর্মীদের চাকরি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পার্পল প্যাচে ৬৫ জন কর্মী কাজ করেন। মালিক আগেই সতর্ক করেছিলেন, বাইরের খাবারের স্থান হারালে প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
আরেক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠান থেকে রাস্তার পাশের খাবারের স্থান সরিয়ে নেওয়ার পর আয় প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে। এর ফলে কর্মীদের কাজের পালা কমাতে হয়েছে।
পার্পল প্যাচের কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, নতুন কাঠামোয় আগের তুলনায় অনেক কম মানুষ বসতে পারবেন। তাই কর্মী ছাঁটাইয়ের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত বিবেচনা করতে হতে পারে।
ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে বাড়ে কর আদায়
ব্যবসায়ীদের যুক্তি, রাস্তার পাশের খাবারের স্থান শুধু রেস্তোরাঁর আয়ই বাড়ায়নি, নগর সরকারের কর আদায়ও বাড়িয়েছে।
পার্পল প্যাচের হিসাবে, ২০১৯ সালে বাইরের খাবারের স্থান চালুর আগে প্রতিষ্ঠানটি বিক্রয় ও ব্যবহার কর হিসেবে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার ডলার দিয়েছিল। ২০২৫ সালে সেই পরিমাণ বেড়ে ৫ লাখ ২ হাজার ডলারের বেশি হয়েছে।
তবে সবাই এই ব্যবস্থার পক্ষে নন। সমালোচকদের মতে, পার্কিংয়ের জায়গা খাবারের স্থান হিসেবে ব্যবহার করায় অন্য ব্যবসা ও নতুন ক্রেতারাও সমস্যায় পড়ছেন। কিছু ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, রাস্তার পাশের কাঠামোর কারণে তাদের দোকান দেখা কঠিন হয়ে গেছে।
বিদায়ের পরই এল অনুমোদন
পার্পল প্যাচের জন্য পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে। বিদায় অনুষ্ঠানের মাত্র দুই দিন পর রেস্তোরাঁটি স্থায়ী খাবারের স্থানের অনুমোদন পায়।
তবে ততক্ষণে পুরোনো কাঠামো সরানোর সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। পরে প্রয়োজনীয় বাকি অনুমোদন পাওয়ার পর সেটি ভেঙে নতুন কাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয়।
অনুমোদন পাওয়ায় মাউন্ট প্লেজ্যান্টে বাইরের খাবারের স্থানটি টিকে গেলেও মালিকের কাছে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত ক্লান্তিকর। নতুন কাঠামোতে আগের তুলনায় কম আসন থাকায় ব্যবসা ও কর্মসংস্থান নিয়ে তার উদ্বেগও কাটেনি।
ওয়াশিংটন ডিসিতে এই বিতর্ক এখন শুধু রেস্তোরাঁর বাইরের বসার জায়গা নিয়ে নয়। একদিকে ছোট ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখা, কর্মসংস্থান ও নগর রাজস্ব বাড়ানোর প্রশ্ন; অন্যদিকে পার্কিং, পথচারী চলাচল ও আশপাশের ব্যবসার স্বার্থ—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করাই হয়ে উঠেছে বড় চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















