দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিটের (এফএসআরইউ) একটিতে আগুন লাগার ঘটনায় এলএনজি আমদানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। ফলে চলমান গ্যাস সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইপিএসএস) আয়োজিত ‘ন্যাভিগেটিং গ্লোবাল শিফটস: ফস্টারিং এনার্জি সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক নীতিগত গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ তথ্য জানান।
গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ ও শিল্পে চাপ
মন্ত্রী জানান, প্রায় এক সপ্তাহ আগে এফএসআরইউর একটিতে আগুন লাগলেও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেনি। তবে ইউনিটটি এখন মেরামতের আওতায় রয়েছে এবং পুরোপুরি চালু হতে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন লাগবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত দুটি এলএনজি কার্গো সমুদ্রে অপেক্ষমাণ থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউর কারণে সেগুলো খালাস করা যাচ্ছে না। এর ফলে সারা দেশে গ্যাসের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ভোগান্তি বাড়ছে, একই সঙ্গে শিল্পকারখানা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মুখে পড়েছে।
আমদানিনির্ভর জ্বালানিতে বাড়ছে চাপ
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনও অনেকাংশে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত এলএনজি ও কয়লার বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
তিনি জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে যেতে পারছে না। তবুও বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সক্ষমতা বাবদ অর্থ পরিশোধ অব্যাহত রয়েছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, গত ছয় মাসে প্রায় ৩ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জ্বালানি আমদানি করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, আগের সরকারের রেখে যাওয়া প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া দায়ও বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ বাড়িয়েছে। এর পাশাপাশি বর্তমান সরকারকে নিয়মিত ভর্তুকির অর্থও পরিশোধ করতে হচ্ছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর
আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে গতি বাড়িয়েছে বলে জানান জ্বালানিমন্ত্রী। তিনি বলেন, নতুন নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতির আওতায় আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই লক্ষ্য অর্জনে বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হবে। নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে অর্থ ফেরত পাবেন।
এ ছাড়া সরকার বিনিয়োগকারীদের জন্য জমি বরাদ্দ দিয়ে ক্লাস্টারভিত্তিক বৃহৎ সৌরপার্ক গড়ে তুলতে চায়। উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনবে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। এ বিষয়ে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং আগামী আগস্ট থেকে নতুন সৌর প্রকল্পের জন্য জমি বরাদ্দ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, দিনের বেলায় উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ সন্ধ্যার চাহিদার সময় ব্যবহারের জন্য ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাঁচ বছরের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জন করা গেলে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি অনেকটাই সহজ হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন ভাবনার আহ্বান
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বিআইপিএসএসের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মুনিরুজ্জামান বলেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশকে শুধু জ্বালানি সংগ্রহের প্রচলিত ধারণায় সীমাবদ্ধ না থেকে ‘জ্বালানি সার্বভৌমত্ব’-এর দিকে এগোতে হবে।
তার ভাষ্য, দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত কমে আসছে, ফলে আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও জ্বালানির চাহিদা ও ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করছে। তাই বহুমুখী, দেশীয় সক্ষমতাভিত্তিক এবং আঞ্চলিকভাবে সমন্বিত জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলা সহজ হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জাতীয় উন্নয়ন আরও শক্ত ভিত্তি পাবে।
দেশে গ্যাস সংকট আরও ১৫ দিন থাকবে: বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী
গ্যাস সংকট
এফএসআরইউতে আগুনের কারণে এলএনজি খালাস ব্যাহত হওয়ায় দেশে গ্যাস সংকট আরও ১০–১৫ দিন স্থায়ী হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী। সংকটের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















