সিঙ্গাপুরের যৌথ সম্পত্তি বিক্রির বাজারে আবারও আশার আলো দেখা যাচ্ছে। আউটরামের তান বুন লিয়াট ভবন ৯৫০ কোটি সিঙ্গাপুরি ডলারে বিক্রি হওয়ায় বড় আকারের সম্পত্তি বিক্রির ক্ষেত্রে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে বাজারে গতি ফিরলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, বিক্রেতাদের বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণ করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
গত এক বছরে সিঙ্গাপুরে বড় অঙ্কের তিনটি যৌথ সম্পত্তি বিক্রির চুক্তি হয়েছে। এর মধ্যে তান বুন লিয়াট ভবনের বিক্রয়মূল্য সবচেয়ে বেশি। এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে চাঙ্গির লোয়াং ভ্যালি ৮৮ কোটি সিঙ্গাপুরি ডলারে এবং ২০২৫ সালে থমসন ভিউ ৮১ কোটি সিঙ্গাপুরি ডলারে বিক্রি হয়।
তবে এসব বড় চুক্তি বাদ দিলে বাজারের চিত্র এখনও খুব শক্তিশালী নয়। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত মাত্র তিনটি যৌথ সম্পত্তি বিক্রির চুক্তি হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে সেন্টারপয়েন্টের পেছনের একটি ভবন ৩৯ কোটি ১৯ লাখ সিঙ্গাপুরি ডলারে বিক্রি হওয়া এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
দাম কমানোর বাস্তবতা
সফল বড় চুক্তিগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিক্রেতাদের প্রত্যাশিত মূল্য শেষ পর্যন্ত কমাতে হয়েছে। তান বুন লিয়াট, লোয়াং ভ্যালি ও থমসন ভিউ—তিনটি সম্পত্তিই প্রাথমিক নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে বিক্রি হয়েছে।
এ কারণে যৌথ বিক্রির বাজারে বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণকে এখন সবচেয়ে বড় বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। একাধিকবার বিক্রির চেষ্টা ব্যর্থ হওয়া কিছু সম্পত্তির মালিকও নতুন করে দাম কমিয়ে বাজারে ফিরছেন।
পাইন গ্রোভ ও পিপলস পার্ক সেন্টারের মতো সম্পত্তিগুলোও আগের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর কম দামে নতুন করে বিক্রির চেষ্টা করছে।
বাড়ছে মালিকদের খরচ
সম্পত্তির মালিকদের জন্য সময় যত গড়াচ্ছে, পরিস্থিতি তত কঠিন হচ্ছে। পুরোনো ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে ইজারার মেয়াদ কমে আসছে। ফলে দীর্ঘদিন বেশি দাম ধরে রাখলে সম্ভাব্য ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যেতে পারে।
বিশেষ করে ইজারাভিত্তিক জমির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো ইজারার মেয়াদ নতুন করে দীর্ঘ করতে উন্নয়নকারীকে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। এতে প্রকল্পের মোট ব্যয় বেড়ে যায় এবং সম্পত্তিটি উন্নয়নকারীর কাছে কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
উন্নয়নকারীদেরও চাপ বাড়ছে
অন্যদিকে উন্নয়নকারীরাও আগের মতো সহজে বেশি দামে জমি কিনতে পারছেন না। নির্মাণ ব্যয়, জমির উন্নয়নসংক্রান্ত চার্জ, প্রকল্পের ঝুঁকি এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক শর্ত—সব মিলিয়ে তাদের খরচ বেড়েছে।
এর পাশাপাশি নতুন আবাসন কত দামে বিক্রি করা সম্ভব হবে, সেটিও তাদের হিসাবের বড় অংশ। ফলে সরকারি জমি বিক্রির মাধ্যমে তুলনামূলক সরল প্রক্রিয়ায় জমি সংগ্রহ করাই অনেক উন্নয়নকারীর কাছে এখনও বেশি আকর্ষণীয়।
এ অবস্থায় বিক্রেতা ও ক্রেতার মূল্য প্রত্যাশার ব্যবধান কমানো না গেলে আরও বেশি যৌথ সম্পত্তি বিক্রি সফল করা কঠিন হবে।
তান বুন লিয়াটে বাড়তি সুবিধা
তান বুন লিয়াটের ক্ষেত্রে শুধু দাম কমানোই সাফল্যের কারণ নয়। ভবনটির পুনঃউন্নয়নের সুযোগও বড় ভূমিকা রেখেছে।
শহর পুনর্গঠন কর্তৃপক্ষ ভবনটির জমির ব্যবহারসংক্রান্ত শ্রেণি ব্যবসায়িক ব্যবহার থেকে প্রথম তলায় বাণিজ্যিক সুবিধাসহ আবাসিক ব্যবহারে পরিবর্তন করেছে। একই সঙ্গে জমির নির্মাণযোগ্যতার অনুপাত ৩ দশমিক ১ থেকে বাড়িয়ে ৪ দশমিক ৯ করা হয়েছে।
ফলে ভবনটি নতুন করে উন্নয়নের জন্য অনেক বেশি সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছে। জমিটি কেনার সময় ব্যবসায়িক ব্যবহারের আওতায় থাকায় উন্নয়নকারীর ওপর আবাসিক জমি কেনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অতিরিক্ত ক্রয়করও একইভাবে চাপ তৈরি করবে না।
সব বড় সম্পত্তির ভাগ্যে একই ফল নাও আসতে পারে
তান বুন লিয়াটের সাফল্য বড় যৌথ বিক্রির প্রত্যাশী মালিকদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করলেও প্রতিটি সম্পত্তির পরিস্থিতি আলাদা। জমির ব্যবহারসংক্রান্ত অনুমোদন, পুনঃউন্নয়নের সম্ভাবনা, নির্মাণ ব্যয় এবং পুরো প্রকল্পের আর্থিক সম্ভাব্যতা—সবকিছু আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
পিপলস পার্ক সেন্টার ও ইন্টারন্যাশনাল প্লাজার মতো সম্পত্তির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ বেশি। এগুলো ইজারাভিত্তিক এবং পুনঃউন্নয়নের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জটিলতা রয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল প্লাজা এবার দ্বিতীয়বারের মতো যৌথ বিক্রির প্রক্রিয়ায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ৫০ তলা এই ভবনে আবাসিক ইউনিট, কার্যালয়, দোকান এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক সুবিধা রয়েছে। ২০২১ সালে ২৭০ কোটি সিঙ্গাপুরি ডলারের প্রাথমিক বিক্রির চেষ্টা কোনো প্রস্তাব ছাড়াই শেষ হয়েছিল।
পুরোনো ভবন বিক্রির চাপ বাড়াচ্ছে
ইন্টারন্যাশনাল প্লাজার মালিকদের জন্য ভবনটির বয়স বাড়া এবং ইজারার মেয়াদ কমে আসা নতুন করে বিক্রির আগ্রহ তৈরির অন্যতম কারণ। ভবিষ্যতে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও মালিকদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
এদিকে হরাইজন টাওয়ার্স ও ফার হরাইজন গার্ডেনসও আগের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর যৌথ বিক্রির প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু করছে।
সব মিলিয়ে সিঙ্গাপুরের যৌথ সম্পত্তি বিক্রির বাজারে যে নতুন গতি তৈরি হয়েছে, তা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। বিক্রেতারা যদি বাজারের বাস্তবতা অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করেন এবং উন্নয়নকারীরা প্রকল্পে পর্যাপ্ত লাভের সুযোগ দেখতে পান, তাহলে এই গতি আরও শক্তিশালী হতে পারে। তবে বাড়তি নির্মাণ ব্যয়, কর, উন্নয়ন ঝুঁকি এবং পুরোনো ভবনের ক্রমবর্ধমান খরচের কারণে বাজারের পুনরুদ্ধার যে বেছে বেছে হবে, সেটিও স্পষ্ট।
সিঙ্গাপুরের যৌথ সম্পত্তি বিক্রির বাজারে এখন মূল প্রশ্ন একটাই—মালিকদের প্রত্যাশা ও উন্নয়নকারীদের সক্ষমতার মধ্যে কতটা সমঝোতা তৈরি হয়।
সিঙ্গাপুরের যৌথ সম্পত্তি বিক্রির বাজারে ৯৫০ কোটি সিঙ্গাপুরি ডলারের তান বুন লিয়াট চুক্তি নতুন আশার জন্ম দিয়েছে, তবে বাস্তবসম্মত দামই হবে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর মূল চাবিকাঠি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















