তাইওয়ান দ্বীপের পূর্বদিকে সমুদ্র এলাকায় প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ মৎস্যসম্পদ ও সামুদ্রিক পরিবেশ জরিপ চালিয়েছে চীন। সাত দিনব্যাপী এই অভিযানের মাধ্যমে দেশটির মৎস্যবিষয়ক গবেষণায় দীর্ঘদিনের একটি ফাঁক পূরণ হয়েছে বলে জানিয়েছে গবেষণা দল।
চীনের মৎস্যবিজ্ঞান একাডেমির অধীন পূর্ব চীন সাগর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে গবেষণা জাহাজ ‘লানহাই ২০১’ অংশ নেয়। ২৩ জুলাই অভিযানটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হওয়ার কথা জানানো হয়।
সাত দিনের অভিযানে নতুন তথ্য সংগ্রহ
গবেষণা দলটি তাইওয়ানের পূর্বদিকে ২০ দশমিক ৫ থেকে ২৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ১২২ থেকে ১২৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার মধ্যে সমুদ্র এলাকায় জরিপ চালায়।
জরিপ চলাকালে বিভিন্ন গভীরতা থেকে মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর নমুনা সংগ্রহ করা হয়। গবেষকেরা প্রতিটি নমুনার দৈর্ঘ্য, ওজন, প্রজনন অঙ্গের বিকাশ এবং পাকস্থলীর অবস্থা পর্যন্ত পরীক্ষা করেন। এসব তথ্য ভবিষ্যতে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, মাছের প্রজনন এবং মৎস্যসম্পদের পরিমাণ নির্ধারণে কাজে লাগবে।
প্রধান বিজ্ঞানী ও পূর্ব চীন সাগর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক জেং হানফেংয়ের মতে, এই অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাইওয়ানের পূর্ব জলসীমায় চীনের মৎস্যসম্পদ জরিপের দীর্ঘদিনের ঘাটতি পূরণ করা।
গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যসম্পদের সন্ধানে গবেষকেরা
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সমুদ্র এলাকায় টুনা, ম্যাকারেল, স্কুইড, ডলফিনফিশসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের মাছ পাওয়া যায়। এসব প্রজাতির জীবনচক্র, বিস্তার ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা ভবিষ্যতে মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও মাছের প্রজনন গবেষণায় সহায়ক হতে পারে।
গবেষণা দলের সদস্যরা জানিয়েছেন, একই প্রজাতির মাছ ভিন্ন সমুদ্র এলাকায় ভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখাতে পারে। তাই নির্দিষ্ট অঞ্চলের মাছের শারীরিক ও জৈবিক তথ্য সংগ্রহ করা সামুদ্রিক সম্পদ সম্পর্কে সঠিক ধারণা তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও অভিযান
অভিযানের দ্বিতীয় দিন সমুদ্রে ঝড়ো আবহাওয়া তৈরি হয়। বাতাসের তীব্রতা আট মাত্রায় পৌঁছালে প্রায় পাঁচ মিটার উঁচু ঢেউ সৃষ্টি হয়। এতে তিন হাজার টনের বেশি ওজনের গবেষণা জাহাজটি ১৫ ডিগ্রির বেশি দুলতে থাকে।
তবুও গবেষণা কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। রাত গভীর হলেও জাহাজের ডেক ও গবেষণাগারে কাজ চলতে থাকে। প্রতিটি জাল তোলার পর পাওয়া নমুনা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে নতুন তথ্য পাওয়ার আগ্রহ দেখা যায়।
সমুদ্র এলাকায় নজরদারি নিয়ে উত্তেজনা
অভিযান চলাকালে গবেষণা জাহাজটির আশপাশে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নজরদারি ঘিরেও উত্তেজনা তৈরি হয়। গবেষণা দলের দাবি, একটি জাপানি টহল জাহাজ তাদের জাহাজের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করেছিল। একই সময়ে সামরিক উড়োজাহাজকেও আকাশে চক্কর দিতে দেখা যায়।
চীনের কোস্টগার্ডের একটি জাহাজ গবেষণা জাহাজটির কাছাকাছি অবস্থান করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং জাপানি টহল জাহাজটিকে আরও কাছে আসতে বাধা দেয় বলে জানানো হয়েছে।
মৎস্যসম্পদ রক্ষার সঙ্গে সমুদ্র অধিকারও জড়িত
গবেষণা দলের প্রধান বিজ্ঞানী মনে করেন, মৎস্যসম্পদ শুধু খাদ্য ও অর্থনীতির বিষয় নয়, সমুদ্র ব্যবস্থাপনা ও সামুদ্রিক অধিকারের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। সমুদ্রের জীবসম্পদ সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা হলে তা মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণে সহায়তা করতে পারে।
তাইওয়ানের পূর্ব জলসীমায় এই প্রথম পূর্ণাঙ্গ জরিপ চীনের সামুদ্রিক গবেষণায় নতুন তথ্যভাণ্ডার তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংগৃহীত নমুনা ও পরিবেশগত তথ্য ভবিষ্যতে মাছের প্রজনন, চাষাবাদ এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে আরও গবেষণার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















