পোশাক, আসবাব ও গৃহস্থালি পণ্যের পর সৌরবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও লিথিয়াম ব্যাটারির মাধ্যমে বিশ্ববাজারে বড় পরিবর্তন এনেছে চীন। এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট ও উদ্ভাবনী ওষুধ—এই ‘পরবর্তী নতুন তিন’ খাতকে সামনে রেখে বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের নতুন অধ্যায় তৈরি হচ্ছে।
চীনের এই নতুন প্রযুক্তি বিস্তারকে শুধু বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তিকে আরও সহজলভ্য করা, বিভিন্ন দেশের স্থানীয় শিল্পকে আধুনিক করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করার লক্ষ্যও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
কারখানা থেকে উদ্ভাবনের কেন্দ্রে
কয়েক দশক আগে চীনের উৎপাদন শিল্প মূলত পোশাক, আসবাব ও গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরির জন্য পরিচিত ছিল। তখন দেশটি বিশ্বের বড় উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
একবিংশ শতকে এসে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যায়। সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও লিথিয়াম ব্যাটারির ব্যাপক উৎপাদন চীনের শিল্প সক্ষমতাকে নতুন মাত্রা দেয়। এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট ও নতুন ধরনের ওষুধের ক্ষেত্রে গবেষণা ও উদ্ভাবন চীনকে উৎপাদনকেন্দ্রের পাশাপাশি প্রযুক্তি উদ্ভাবনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবেও তুলে ধরছে।
বিশ্ববাজারে বাড়ছে প্রযুক্তির ব্যবহার
চীনের তৈরি রোবট ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের হাসপাতাল ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহার হচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ব্যবসা, বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করে তুলছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন মডেল ব্যবহার করে বিদেশি ব্যবহারকারীরা লেখা তৈরি, প্রোগ্রাম তৈরি এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত ছবি বিশ্লেষণের মতো কাজ করছেন। একই সঙ্গে চীনে উদ্ভাবিত কয়েকটি নতুন ওষুধ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রোগীদের জন্য নতুন চিকিৎসার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বাড়ছে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব
চীনের উন্মুক্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ঘিরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তিবিদ ও নির্মাতাদের সহযোগিতাও বাড়ছে। চলতি জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে একটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মে চীনের বৃহৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলের সাপ্তাহিক ব্যবহার ৩৬ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন টোকেনে পৌঁছায়। আগের সময়ের তুলনায় ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ৩০ দশমিক ৯১ শতাংশ।
এতে বোঝা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে চীনের প্রযুক্তি শুধু নিজস্ব বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবহারকারী ও প্রযুক্তিবিদরা এসব ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।

রোবট ও ওষুধেও বড় অগ্রগতি
রোবট শিল্পেও চীনের আন্তর্জাতিক বাজার বিস্তার দ্রুত হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে চীনের শিল্প রোবটের রপ্তানি প্রায় ৬২৯ কোটি ইউয়ানে পৌঁছেছে। এসব রোবট বিশ্বের ১৪১টি দেশ ও অঞ্চলে গেছে। একই সময়ে অস্ত্রোপচার-সহায়ক রোবটের রপ্তানি বেড়েছে কয়েক গুণ।
উদ্ভাবনী ওষুধের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ছে। চীনের বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। এসব অংশীদারত্বের সম্ভাব্য মোট আর্থিক মূল্য প্রায় ১১ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন সুযোগ
চীনের নতুন প্রযুক্তির বিস্তারের একটি বড় দিক হলো উন্নত প্রযুক্তিকে তুলনামূলক কম খরচে বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সৌরবিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে যেমন প্রযুক্তির দাম কমেছে, তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ও আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তিও ধীরে ধীরে আরও সহজলভ্য হচ্ছে।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো এতে উপকৃত হতে পারে। স্থানীয় শিল্পে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু, ব্যবসায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং চিকিৎসাসেবায় আধুনিক যন্ত্র যুক্ত করার মাধ্যমে এসব দেশের অর্থনীতি ও জনসেবায় পরিবর্তন আনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতার বার্তা
চীনের ‘পরবর্তী নতুন তিন’ প্রযুক্তি নিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা তীব্র হলেও এর সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনাও বাড়ছে। প্রযুক্তির বাজারে একক আধিপত্যের পরিবর্তে গবেষণা, দক্ষতা, সরবরাহ ব্যবস্থা ও উদ্ভাবনে বিভিন্ন দেশের অংশীদারত্ব ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট মনে করে, প্রযুক্তির অগ্রযাত্রাকে সীমাবদ্ধ করার চেয়ে উদ্ভাবন ও সহযোগিতার সুযোগ বাড়ানোই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট ও উদ্ভাবনী ওষুধের এই নতুন ঢেউ শুধু চীনের শিল্প পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতি, চিকিৎসা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরনেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চূড়ান্তভাবে, আগামী দিনের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় কে কত বেশি পণ্য তৈরি করতে পারে, তার পাশাপাশি কে নতুন প্রযুক্তি তৈরি, ছড়িয়ে দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে তা মানুষের কাজে লাগাতে পারে—সেটিই হয়ে উঠতে পারে সাফল্যের বড় মাপকাঠি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















