এভারেস্টের দুর্গম পাহাড়ে পর্বতারোহীদের সহায়তা ও আবর্জনা সরানোর কাজে ড্রোন ব্যবহারে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। একদিকে চীনা প্রযুক্তি এরই মধ্যে এভারেস্টে বাস্তব কাজ শুরু করেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি নিয়ে এই কাজে প্রবেশের চেষ্টা করছে।
পর্বতারোহীদের সহায়তায় ড্রোনের নতুন ভূমিকা
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় থাকা এভারেস্টের বেস ক্যাম্প থেকে আরও প্রায় ২ হাজার ৪০০ ফুট ওপরে থাকা ক্যাম্পে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এতদিন এই দায়িত্বের বড় অংশ বহন করতেন শেরপা কর্মীরা।
ড্রোন প্রযুক্তি সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই খাবার, অক্সিজেনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম উঁচু ক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে পর্বতারোহীদের ফেলে যাওয়া আবর্জনাও নিচে নামিয়ে আনা যাচ্ছে।
এভারেস্টে চীনা ড্রোনের এগিয়ে থাকা
নেপালের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ২০২৪ সাল থেকে চীনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ভারী মাল বহনকারী ড্রোন নিয়ে এভারেস্টে পরীক্ষা চালিয়ে আসছে। চলতি বছরের পর্বতারোহণ মৌসুমে আরও শক্তিশালী ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠে ড্রোনটি ২০০ পাউন্ডের বেশি ওজন বহন করতে পারে। তবে এভারেস্টের উচ্চতায় এর বহনক্ষমতা কমে প্রায় ১০০ পাউন্ডে নেমে আসে।
চলতি মৌসুমে এসব ড্রোন কয়েক হাজার পাউন্ড ওজনের সরঞ্জাম পৌঁছে দিয়েছে এবং পর্বতারোহীদের ফেলে যাওয়া ৬ হাজার পাউন্ডের বেশি আবর্জনা নিচে নামিয়েছে। এর মধ্যে ব্যবহৃত অক্সিজেন সিলিন্ডার, পরিত্যক্ত পর্বতারোহণ সরঞ্জাম এবং মানববর্জ্যও রয়েছে।
দুর্গম বরফপথের নিরাপত্তায় প্রযুক্তি
এভারেস্টে ড্রোনের ব্যবহার শুধু মালপত্র বহনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিপজ্জনক খুম্বু বরফপ্রপাতের ওপর নজরদারি ও মানচিত্র তৈরিতেও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
বরফের বিশাল খণ্ড, গভীর ফাটল ও অনিশ্চিত পথের কারণে এই অংশটি এভারেস্ট অভিযানের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি। ড্রোনের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে অভিজ্ঞ শেরপারা নিরাপদ পথ নির্ধারণে সহায়তা পাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিও নামতে চায় এভারেস্টে
এভারেস্টে চীনা ড্রোনের ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার বিষয় নয়, এর সঙ্গে কৌশলগত গুরুত্বও জড়িয়ে আছে। কারণ এভারেস্ট নেপাল ও চীনের সীমান্তের ওপর অবস্থিত।
যুক্তরাষ্ট্র চায় তাদের ভারী মাল বহনকারী ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানও এভারেস্টে সরঞ্জাম পরিবহন ও আবর্জনা অপসারণের কাজে যুক্ত হোক। মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে গিয়ে একটি মার্কিন ড্রোনের সক্ষমতার প্রশংসাও করেন।
তবে সেই ড্রোনের পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের অনুমতি শেষ মুহূর্তে দেয়নি নেপাল সরকার। নিরাপত্তা সংবেদনশীলতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে পরামর্শ প্রয়োজন বলে অনুমতি আটকে দেওয়া হয়।

নেপালের সামনে কৌশলগত ভারসাম্যের প্রশ্ন
একই সময়ে নেপাল চীনা ড্রোনের অনুমতিও সাময়িকভাবে বাতিল করেছিল। এতে পর্বতারোহণের মৌসুমে সমস্যায় পড়েন অভিযানের আয়োজকেরা। উচ্চ ক্যাম্পে সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে ড্রোনের ওপর নির্ভরতা এতটাই বেড়েছে যে, অনুমতি বন্ধ হওয়ার পর বেস ক্যাম্পে থাকা অভিযানের আয়োজকেরা দ্রুত তা পুনর্বহালের দাবি জানান।
কয়েক দিন পর চীনা ড্রোনকে আবার তিন মাসের জন্য এভারেস্টে পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে আন্তর্জাতিক সীমান্ত থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা এবং অনুমোদিত এলাকার বাইরে কোনো ছবি ধারণ না করার মতো শর্তও দেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তির সঙ্গে ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ
চীনা ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা, বিদেশে ব্যবহৃত ড্রোনের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য চীনের হাতে যেতে পারে কিংবা ড্রোনের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে চীনা প্রতিষ্ঠানটি এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করে আসছে। তাদের বক্তব্য, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের পরিবর্তে ড্রোনের উৎপত্তি দেশকে গুরুত্ব দেওয়ায় প্রকৃত সমস্যার সমাধানে বাধা তৈরি হচ্ছে।
এভারেস্টে ড্রোন ব্যবহারের এই প্রতিযোগিতা তাই শুধু প্রযুক্তির লড়াই নয়। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতের দুর্গম পরিবেশে মানুষের নিরাপত্তা, পরিবেশ রক্ষা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা—সবকিছুই এখন একই সুতোয় বাঁধা পড়ছে।
এভারেস্টে ড্রোনের ব্যবহার যত বাড়বে, ততই স্পষ্ট হবে কোন প্রযুক্তি কঠিন পাহাড়ি পরিবেশে বেশি কার্যকর এবং নেপাল কীভাবে দুই পরাশক্তির প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজের কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখে।
এভারেস্টে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন প্রতিযোগিতা পর্বতারোহণে নতুন প্রযুক্তির পাশাপাশি নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















