০৮:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
এইডস প্রতিরোধে অর্থসংকট, বিশ্বজুড়ে আবারও এইচআইভি সংক্রমণ বাড়ার শঙ্কা চাকরি পেতে যোগ্যতার পাশাপাশি আপনার পোশাক-পরিচ্ছদও কি গুরুত্বপূর্ণ? হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরান-ওমানের তৎপরতা, যুদ্ধের উত্তেজনা কমার আশায় বিশ্ব এসঅ্যান্ডপি’র সতর্কবার্তা: বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ দক্ষিণ আফ্রিকায় ভয়াবহ আগুনে ৬ বাংলাদেশির মৃত্যু, আহত আরও একজন ইরান যুদ্ধের ধাক্কাতেও ২০২৮ সালে জেডি ভ্যান্সই কেন এগিয়ে, রুবিওর সম্ভাবনা কতটা যুদ্ধের ক্ষত পেরিয়ে ইরান: শোক, ক্ষোভ আর টিকে থাকার লড়াই ইবোলা ঠেকাতে সীমান্তে দড়ি, কঙ্গোর পাশের উগান্ডার শহরে নেই নতুন সংক্রমণ চার শিল্পীর ভিন্ন ভাবনায় নতুন আলোচনায় কোরিয়ার শিল্পজগৎ বিশ্বকাপের হারের পর আর্জেন্টিনাকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ, বর্ণবাদ বিতর্কে নতুন প্রশ্ন

আস্থার সংকটে বিনিয়োগ ঃঝুঁকিতে কর্মসংস্থান

অর্থনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো, বিনিয়োগ ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। ভোগব্যয় অর্থনীতিকে কিছু সময় সচল রাখতে পারে, সরকারি ব্যয়ও সাময়িক গতি দিতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং আয় বৃদ্ধির একমাত্র টেকসই উৎস হচ্ছে বিনিয়োগ। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি কেবল একটি খাতভিত্তিক সংকট নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য সতর্ক সংকেত।

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দেড় দশক ধরে যে কয়েকটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিল, তার অন্যতম ছিল বেসরকারি বিনিয়োগ। তৈরি পোশাক শিল্পের সম্প্রসারণ, অবকাঠামো নির্মাণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ, আবাসন খাতের বিস্তার এবং সেবা খাতের দ্রুত প্রসার, সবকিছুর চালিকাশক্তি ছিল উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ। কিন্তু গত প্রায় দুই বছরে সেই চিত্রে স্পষ্ট পরিবর্তন এসেছে। নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠার গতি কমেছে, পুরোনো অনেক শিল্প সম্প্রসারণের পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছে, আবার কিছু কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে কিংবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বদলে বেকারত্বের চাপ বাড়ছে, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

দেশের শিল্পাঞ্চলগুলো ঘুরে দেখলে কিংবা ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা বললে একটি অভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্প হাতে নিতে আগ্রহী নন। যাঁরা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই তা স্থগিত রেখেছেন। নতুন শিল্প স্থাপনের পরিবর্তে এখন অধিকাংশ উদ্যোক্তার লক্ষ্য বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখা। কারণ তাঁরা মনে করছেন, বর্তমান অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে নতুন ঝুঁকি নেওয়ার সময় এটি নয়।

বিনিয়োগের এই মন্থরতার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে কর্মসংস্থানে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও নতুন শিল্প ও সেবা খাত পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। অনেক কারখানায় নিয়োগ কার্যত বন্ধ। কোথাও কোথাও উৎপাদন কমে যাওয়ায় কর্মী ছাঁটাইও হচ্ছে। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণ থেকে শুরু করে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক, সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাহবুব আলী বলেন, ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগের বর্তমান স্থবিরতাকে অনেকেই সাময়িক অর্থনৈতিক মন্দা হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। এটি কেবল বৈশ্বিক অস্থিরতার ফল নয়, আবার শুধু একটি সরকারের নীতিগত ব্যর্থতারও পরিণতি নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা কাঠামোগত দুর্বলতা, আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা, নীতিগত অসঙ্গতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আস্থাহীনতার সম্মিলিত ফল আজকের বিনিয়োগ স্থবিরতা।’

বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার অর্থনীতি বিশেষ করে বিনিয়োগ চাঙা করতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে নানা ধরনের শুল্ক-করছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আবার সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য বিশেষ বরাদ্দসহ শুল্ক-করে ছাড় দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর প্রত্যাশা, আগামী দুই বছরের মধ্যে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে।

স্থবিরতার প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে বেসরকারিকরণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণ শুরু হয় মুলত আশির দশকে থেকে। ১৯৮২ সালের ‘নিউ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি’র (এনআইপি) মাধ্যমে অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ব্যক্তিখাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রামে দেশের প্রথম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) চালু হয়, যা পরবর্তীতে বিনিয়োগ আকর্ষণে অত্যন্ত সফল প্রমাণিত হয়।

পোশাক শিল্পে বাড়ছে না বিনিয়োগ | কালবেলা

আশির দশকে শুরু হওয়া তৈরি পোশাক শিল্প নব্বইয়ের দশকে বিশাল বৈদেশিক ও দেশীয় বিনিয়োগ আকর্ষণ করে। এই খাতটি বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। বিনিয়োগ বাড়াতে ১৯৯৮ সালে ‘বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট’ (বিওআই) গঠিত হয়। পরবর্তীতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ওয়ান-স্টপ সার্ভিস প্রদানের লক্ষ্যে ২০১৬ সালে বিওআই ও বেসরকারীকরণ কমিশন একীভূত হয়ে গঠিত হয় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। এছাড়া ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল (বেজা) গড়ে তোলার বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নেওয়া হয়।

আশির দশক-পরবর্তী ভিয়েতনাম, চীন, মেক্সিকো ও ভারতের মতো দেশ অর্থনৈতিকভাবে বিকাশ লাভ করে। সে সময় দেশগুলো উৎপাদন খাতে এফডিআই আকর্ষণ করতে পেরেছিল। মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলেও রয়েছে এফডিআই। দেশটিতে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও একই।

বাংলাদেশেও এফডিআইবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে গ্রহণ করতে হয় নানা ধরনের নীতি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে কোনো কার্যকর বিনিয়োগ নীতিমালা নেই। বিনিয়োগ আকর্ষণে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিনিয়োগের চেয়ে সরকারগুলোকে ঋণের পেছনেই বেশি ছুটতে দেখা গেছে।

এফডিআই বাড়াতে দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ৩৯টি হাইটেক পার্ক তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নেওয়া হয়েছে ওয়ান স্টপ সার্ভিস ব্যবস্থা। তবু বিনিয়োগ কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছায়নি।

বাংলাদেশের বিনিয়োগের প্রধান  বাধা ছিল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও লালফিাতর দৌরাত্ব্য। সাম্প্রতিক সময়ে এই জটিলতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট। ফলে বিভিন্ন সময়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও তা কাংখিত মাত্রায় বিনিয়োগ আকর্ষণে ভূমিকা খাততে পারেনি।

গত কয়েক বছর ধরেই দেশে বিনিয়োগে মন্দা চলছে। তার ওপর ক্ষমতার পটপরিবর্তন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক সংকটসহ নানা কারণে গত দুই বছর ধওে দেশে দেশি-বিনিয়োগে চরম স্থবিরতা চলছে। ব্যবসা-বাণিজ্যেও চলছে মারাত্মক শ্লথগতি। সরকারি পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিনিয়োগ সর্বনি¤œ অবস্থায় নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জিডিপির সাময়িক হিসাবে দেখা গেছে, এই অর্থবছরের জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। গত ১৪ বছরে জিডিপির অনুপাতে এত কম বিনিয়োগ হয়নি। ২০১২-১৩ অর্থবছরের পরে জিডিপি-বিনিয়োগ অনুপাত এত কমেনি।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ অংশ কমে যাওয়া বেশ উদ্বেগজনক। কয়েক দশক ধরে বেসরকারি খাত প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি হিসেবে পরিচিত। এই পরীক্ষিত চালিকা শক্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের মাধ্যমেই দেশের রপ্তানি বেড়েছে এবং তারা অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানে ভূমিকা রেখেছে।

৬ বছরে দেশের মানুষের গড় আয় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির জন্য আরও বেশি কার্যকর কর্মসংস্থান (শোভন কর্মসংস্থান) দরকার। কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির থাকায় সেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে বৈচিত্র্যময় রপ্তানি খাত দরকার। এ জন্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু বিনিয়োগ না থাকায় কর্মসংস্থানেও স্থবিরতা বিরাজ করছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, গত কয়েক বছরে বিনিয়োগ পরিস্থিতির বড় কোনো উন্নতি হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও বিনিয়োগ নিয়ে বড় অগ্রগতি ছিল না।

পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজধানী ঢাকায় ঘটা করে বিনিয়োগ সম্মেলন করা হয়। সম্মেলনে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আকর্ষণীয় উপস্থাপনা দেওয়া হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশা দেখানো হলেও বাস্তবতা ছিলো নেতিবাচক।

এছাড়া গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ করের পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায়ই দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তা ছাড়া ঋণের সুদের হারও বেশি। এসব কারণে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে।

অনেকেই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মহামারির অভিঘাত কিংবা যুদ্ধজনিত সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্নকে দায়ী করেন। এসব কারণের প্রভাব অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন একই বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও অনেক প্রতিযোগী দেশ তুলনামূলকভাবে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে, অথচ বাংলাদেশে বিনিয়োগের গতি এতটা কমে গেছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিশ্লেষণ করতে হবে। ডলার সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, উচ্চ সুদহার, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, নীতিগত অসামঞ্জস্য, প্রশাসনিক জটিলতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি, সব মিলিয়ে একটি জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা যুক্ত হয়ে বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

বন্ধ হচ্ছে শিল্প, বাড়ছে উদ্বেগ

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন খাতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কাঁচামাল আমদানির খরচ বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম, উচ্চ সুদে ঋণ, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিশ্চয়তা এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান লাভজনক অবস্থান হারিয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। বড় শিল্পগোষ্ঠী কোনোভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও ছোট উদ্যোক্তাদের অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে শিল্পায়নের গতিও মন্থর হবে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ার বদলে বিদ্যমান উদ্যোক্তারাই যদি বাজার থেকে সরে যেতে শুরু করেন, তাহলে অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সর্বশেষ আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২ হাজার ২০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, যার মধ্যে রয়েছেন ১ হাজার ৭০০ শ্রমিক।

তিন শিল্প এলাকায় সাত মাসে বন্ধ ৯৫ কারখানা | প্রথম আলো

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি জুন পর্যন্ত শিল্প অধ্যুষিত সাতটি এলাকায় মোট ৪৫৭ কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্প গোয়েন্দা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪৫৭ কারখানার মধ্যে ২০৫টি বন্ধ হয়েছে পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশের অভাবে। ১৯০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে মালিকের আর্থিক সংকটে। অর্থাৎ ৮৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ কারখানা বন্ধের প্রধান কারণ পর্যাপ্ত কাজের অভাব ও মালিকের আর্থিক সংকট। এছাড়া শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বন্ধ হয়েছে ১১টি কারখানা। রাজনৈতিক, ব্যাংক জটিলতা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, কাঁচামালের অভাব ও ফ্যাক্টরি স্থানান্তরসহ অন্যান্য কারণে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে ৫১টি কারখানা।

ফলে এসব কারখানার শ্রমিকরা নতুন করে বেকার হয়ে পড়েছেন। এভাবে প্রতিনিয়ত বিদ্যামান শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন বেকারত বাড়ছে। এতে দেশের চলমান বেকারত্বের মিছিলে ক্রমান্বয়ে দীর্ঘ হচ্ছে।

অন্যদিকে, বছরের পর বছর অপেক্ষার পরও মিলছে না গ্যাস সংযোগ। ডিমান্ড নোটের টাকা পরিশোধ করেও উৎপাদনে যেতে পারছে না সাড়ে পাঁচ শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এতে গ্যাস সংযোগের দীর্ঘসূত্রতায় চরম সংকটে পড়েছে দেশের শিল্প খাত। প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া শেষ করে এরই মধ্যে ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়ে গ্যাস সংযোগের জন্য চার-পাঁচ বছর ধরে অপেক্ষায় রয়েছে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করেও তারা পাচ্ছে না কাঙ্খিত গ্যাস সংযোগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দেশের বিভিন্ন গ্যাস বিতরণ কম্পানির কাছে শিল্প খাতে নতুন সংযোগের জন্য বর্তমানে এক হাজার ৮০০টিরও বেশি আবেদন জমা রয়েছে। কিন্তু গ্যাসসংকট ও নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বেশির ভাগ আবেদনই বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে।

এর ফলে নতুন কারখানা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক উদ্যোক্তার স্থাপনা প্রস্তুত থাকলেও উৎপাদন শুরু করতে না পারায় ব্যাংকঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং অন্যান্য আর্থিক চাপ বাড়ছে। এতে নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহ হচ্ছেন উদ্যোক্তারা।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতেও একই চিত্র। শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে গড়ে তোলা এসব অঞ্চলের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত করেও গ্যাস সংযোগের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারছে না। এতে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।

জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ছয়টি গ্যাস বিতরণ কম্পানির কাছে শিল্পে গ্যাস সংযোগের জন্য এক হাজার ৮০০টি আবেদন রয়েছে। এসব সংযোগ দিতে হলে প্রতিদিন অতিরিক্ত এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট বাড়তি গ্যাস প্রয়োজন হবে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন ডিভিশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, ‘বর্তমানে তিতাসের কাছে ডিমান্ড নোট পরিশোধ করা প্রায় ৪৯০টি প্রতিষ্ঠান গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে শুধু তিতাসেই নতুন সংযোগের জন্য আরো প্রায় এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০টি আবেদন জমা রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ না থাকায় এসব আবেদন নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না।’

তিনি বলেন. ‘এসব আবেদন ও তালিকা এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি পুরোপুরি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত। মন্ত্রণালয় যাদের অনুমোদন দেবে আমরা তাদেরই সংযোগ দেব।’

ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে চীনের আগ্রহ, সমঝোতার চেষ্টা সামিটের | কালের  কণ্ঠ

সাইদুল হাসান আরো বলেন, ‘বর্তমানে আমরা আমাদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছি না। কবে নাগাদ পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাবে, সেটাও নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বর্তমানে যে দুটি এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) রয়েছে, সেগুলোর মাধ্যমে বাড়তি গ্যাস সরবরাহ চলছে। এই সক্ষমতার বাইরে অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব নয়। তবে সরকার নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, অনশোর ও অফশোরে টেন্ডার এবং নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগবে।’

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, ‘বর্তমান শিল্পকারখানাগুলোই যখন পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না, তখন নতুন শিল্প স্থাপনের কথা বলা বাস্তবসম্মত নয়। বিদ্যমান শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হলে সরকারের প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও অর্জন করা কঠিন হবে।’

তিনি বলেন, ‘সরকার বন্ধ কারখানাগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে চালুর কথা বলছে। কিন্তু যেসব কারখানা এখনো চালু রয়েছে, সেগুলোই যদি গ্যাসসংকটের কারণে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে শুধু অর্থায়নের মাধ্যমে এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা সচল করা সম্ভব হবে না।’

আশিক চৌধুরী সমাচার

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এই আশিক চৌধুরী নামে সমধিক পরিচিত এই চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনকে নিয়েই বিস্তর ঢাকঢোল পেটানো হয়েছিল। সেই সময় বিনিয়োগ সম্মেলন করে অত্যন্ত জোর দিয়ে বলা হয়েছিল যে, তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বাংলাদেশে প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আসতে যাচ্ছেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক, আন্তর্জাতিক রোডশো, চীন-জাপান-যুক্তরাষ্ট্র-কাতার সফর, বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট আয়োজন, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সংস্কার, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, সবকিছু মিলিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজন আর খরচেরও কোনো কমতি ছিল না। সবকিছু মিলিয়ে তিনি বিনিয়োগ আকর্ষণের নতুন মুখ হয়ে ওঠেন।

বেসরকারি খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং করপোরেট বিশ্বের পরিচিত মুখ হওয়ায় তাকে ঘিরে ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রায় দুই বছর পর প্রশ্ন উঠছে, এই প্রচেষ্টা কি বাস্তব ফল দিয়েছে? নাকি বিনিয়োগের বড় বড় ঘোষণার আড়ালে বিদেশি বিনিয়োগের প্রকৃত চিত্র এখনও হতাশাজনক?

বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ডের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন ১৮ জুন এক কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে যা বলেছেন, তা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তার নিয়োগের সময় ছড়ানো আশার ফুলঝুরিতে গুড়েবালি ঢেলে দেওয়ার মতো হয়েছে। তিনি বলেছেন, তার প্রতিষ্ঠান এখন আর বিদেশি নয়, দেশিয় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কাজ করছে। তার যুক্তি হলো, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে বৈশ্বিকভাবে বিনিয়োগের প্রবাহ তুলনামূলকভাবে দুর্বল। এ কারণে তারা গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্টের ওপর বেশি ফোকাস না করে, দেশিয় বিনিয়োগকারীদের ওপর জোর দেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং দেশের বাইরের চেয়ে ভেতরের সম্ভাবনার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন।

কত টাকার বিনিয়োগ এলো সম্মেলনে, জানালেন বিডা চেয়ারম্যান

ইউনূস সরকারের বিদায়ের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরও আশিক চৌধুরী ওই পদে বহাল রয়েছেন। হয়তো কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখার বিবেচনায় তাকে ওই পদে বহাল রাখা হয়েছে। কিন্তু এখন যখন তিনি নিজেই বিদেশি বিনিয়োগের আশা ছেড়ে বৈশ্বিক পরিস্থিতির অজুহাতে দেশিয় বিনিয়োগের দিকে মুখ ফেরানোর কথা বলছেন, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় আমাদের সবুরের মেওয়া মাকাল ফলে পরিণত হতে যাচ্ছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কার স্থবিরতা দেখতে দেখতে দেশের মানুষের মনে আশার জন্ম হয়েছিল যে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরবে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার হবে এবং এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগ পরিস্থিতিরও উন্নতি ঘটবে। কিন্তু আশিক চৌধুরীর সাম্প্রতিক এই বক্তব্য সেই আশায় বড় একটি ধাক্কা দিল।

অবশ্য আশিক চৌধুরী পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তিনি বলছেন, বিনিয়োগ কমার পেছনে বিডার ব্যর্থতার চেয়ে বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং নির্বাচনকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের অপেক্ষার মনোভাব বড় ভূমিকা রেখেছে।

তার মতে, বিনিয়োগের একটি বড় পাইপলাইন তৈরি হয়েছে, কিন্তু তা বাস্তবায়নে সময় লাগছে। তাই বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগের চেয়ে দেশীয় বিনিয়োগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে বিনিয়োগ সংকট বিশ্লেষণে সবচেয়ে বড় ভুল হবে যদি সব দায় একটি নির্দিষ্ট সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। বাস্তবতা হলো, বর্তমান সংকটের বীজ অনেক আগেই রোপিত হয়েছিল।

দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, আর্থিক খাতে জবাবদিহির অভাব, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় চাপ এবং কিছু ক্ষেত্রে নীতিগত শৈথিল্য অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে তোলে। এসব দুর্বলতা তখন খুব বেশি দৃশ্যমান না হলেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা আসার পর সেগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে বড় সংকট আস্থা

অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত কেবল মুনাফার ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে সমানভাবে জড়িত আস্থা। একজন উদ্যোক্তা তখনই নতুন কারখানা গড়বেন, যখন তিনি বিশ্বাস করবেন যে আগামী পাঁচ বা দশ বছরে তাঁর ব্যবসার পরিবেশ মোটামুটি স্থিতিশীল থাকবে। তিনি প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাবেন, ব্যাংক থেকে অর্থায়ন করতে পারবেন, নীতিমালা হঠাৎ বদলে যাবে না এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজার থাকবে। তিনি কাঁচামাল আমদানি করতে পারবেন, করনীতি বারবার পরিবর্তিত হবে না এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অযথা হয়রানির শিকার হতে হবে না।

ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, এই নিশ্চয়তাগুলোর কোনোটিই পুরোপুরি নেই। ফলে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতির জন্য এটিই সবচেয়ে উদ্বেগজনক বার্তা। কারণ বিনিয়োগকারীর আস্থা হারিয়ে গেলে করছাড়, প্রণোদনা বা স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সুবিধা দিয়েও কাঙ্খিত ফল পাওয়া কঠিন।

অর্থনীতি গতিশীল করতে বিদেশি বিনিয়োগ কতটা ভূমিকা রেখেছে?

বাংলাদেশে বর্তমানে এই আস্থার জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনিশ্চয়তা এতটাই বেড়েছে যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে নগদ অর্থ সংরক্ষণকে নিরাপদ মনে করছেন। এটি অর্থনীতির জন্য একটি অশনি সংকেত। কারণ উদ্যোক্তারা যখন ঝুঁকি নিতে চান না, তখন নতুন শিল্প গড়ে ওঠে না, প্রযুক্তি আসে না, উৎপাদন বাড়ে না এবং কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয় না।

সব বিশ্লেষণের শেষে একটি বিষয়ই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাংলাদেশে অর্থ, উদ্যোক্তা বা বাজারের সম্পূর্ণ অভাব নেই। যা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা হলো আস্থা। ব্যবসায়ীরা বিশ্বাস করেন যে নীতির ধারাবাহিকতা থাকবে, আর্থিক খাত স্থিতিশীল হবে, জ্বালানি নিশ্চিত থাকবে, প্রশাসনিক সেবা দ্রুত পাওয়া যাবে এবং প্রতিযোগিতার জন্য সমান সুযোগ থাকবে, তবে বিনিয়োগ ফিরতে খুব বেশি সময় লাগবে না।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে আস্থা পুনর্গঠনই সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংস্কার। কারণ বিনিয়োগের চাকা সচল না হলে উৎপাদন বাড়বে না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না, রাজস্ব বাড়বে না এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যও অধরাই থেকে যাবে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকিং সংস্কার, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, বিনিময় হার ও আর্থিক খাতে কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নীতিগত ঘোষণার তুলনায় বাস্তবায়নের গতি ধীর, ফলে আস্থা ফিরতে সময় লাগছে।

বিনিয়োগের নীরব শত্রু ৫ সংকট  

বাংলাদেশের বিনিয়োগ বর্তমানে ৫ সংকটে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই পাচ সংকট হলো ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, নিরবিচ্ছিন্ন জ্বালানি প্রাপ্তিতে অনিশ্চয়তা, নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা এবং ডলার সংকট।

বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নির্ভর করছে এই পাঁচ সমস্যার চূড়ান্ত সমাধানের ওপর। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আস্থা সংকট কেটে গেলেও এই পাচ সমস্যার সমাধান না করা গেলে শেষ পর্যন্ত দেশে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ নাগালের বাইরেই থেকে যাবে।

বাংলাদেশের বিনিয়োগ সংকটের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি হলো ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা। বহু বছর ধরে খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি, দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব, ঝুঁকি মূল্যায়নের ঘাটতি এবং অনিয়মিত ঋণ পুনঃতফসিলের সংস্কৃতি ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

এর ফলে অনেক ব্যাংক নতুন শিল্পঋণ দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে। ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ থেকে দেখা যাচ্ছে, চার বছর (২০২১) আগেও দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আয়ের প্রধান উৎস ছিল ঋণ বিতরণ। কিন্তু মাত্র চার বছরের ব্যবধানে সেই চিরচেনা চিত্র পুরোপুরি উল্টে গেছে। এখন আর ঋণ নয়, বরং সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগেই মুনাফা বেশি হচ্ছে।

High interest rates deepen trouble for businesses and employment | |  Bangladesh Pratidin

অন্যদিকে উচ্চ সুদহার উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। যে উদ্যোক্তা কয়েক বছর আগে তুলনামূলক কম খরচে ঋণ নিয়ে কারখানা সম্প্রসারণের কথা ভাবতে পারতেন, তিনি এখন সুদ, জ্বালানি ব্যয় এবং বাজার অনিশ্চয়তার সম্মিলিত চাপ বিবেচনা করে বিনিয়োগ থেকে সরে আসছেন।

দ্বিতীয়ত: বাংলাদেশের শিল্পায়নের অন্যতম বড় ভিত্তি ছিল তুলনামূলক সস্তা জ্বালানি। কিন্তু গত দুই বছরে গ্যাসের সীমিত সরবরাহ, বিদ্যুতের ব্যাঘাত এবং জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটি আধুনিক কারখানা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে স্থাপন করার পর যদি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস বা বিদ্যুৎ না পাওয়া যায়, তাহলে সেই বিনিয়োগের অর্থনৈতিক যুক্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক উদ্যোক্তা তাই নতুন প্রকল্পে না গিয়ে অপেক্ষার কৌশল গ্রহণ করেছেন।

তৃতীয়ত: বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ শুধু করছাড় দিয়ে তৈরি হয় না; প্রয়োজন নীতির ধারাবাহিকতা। ব্যবসায়ীরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, করনীতি, শুল্কহার, আমদানি বিধি বা নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তে ঘন ঘন পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে কঠিন করে তোলে।

চতুর্থত: এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা। শিল্প স্থাপনের অনুমোদন, জমি, পরিবেশ ছাড়পত্র, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ, কর সংক্রান্ত প্রক্রিয়া—সব মিলিয়ে সময় ও ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এই অদৃশ্য ব্যয়ও বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে।

পঞ্চমত: শিল্পায়নের জন্য শুধু অর্থ নয়, প্রয়োজন কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি। কিন্তু গত কয়েক বছরে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এই পুরো প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলেছে।

অনেক উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্বের মুখে পড়েছেন। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও কমেছে। ফলে নতুন শিল্প স্থাপনের পরিবর্তে অনেক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান উৎপাদন ধরে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে। যারা নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন।

বিশ্ব অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। উচ্চ সুদহার, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার পরিবর্তন এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিনিয়োগে প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর শিল্প অর্থনীতির জন্য এই চাপ আরও বেশি।

তবে বৈশ্বিক সংকট সব দেশের জন্য সমান হলেও এর প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করে প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির ওপর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো আন্তর্জাতিক চাপকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাবমূর্তি

দুর্বল অবকাঠামো, সীমিত অর্থায়ন, বাড়তি কর, জ্বালানি সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি এবং দক্ষ জনবলের অভাব বাংলাদেশে বিনিয়োগের চিরচেনা কিছু সমস্যা। তবে এর বাইরে সম্পূর্ণ নতুন একটি সংকট এখন বিনিয়োগের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটি হলো- অগাস্ট-পরবর্তী ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অকার্যকারিতা।

সরেজমিন: পুড়ে ছাই গাজী টায়ার ফ্যাক্টরি, নিখোঁজদের খোঁজে স্বজনরা - BBC  News বাংলা

জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর আওয়ামীপন্থিদের কলকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের যে সব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর ছবি ও ভিডিও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। উপরন্তু, প্রতিযোগী ও অবন্ধুসুলভ রাষ্ট্রগুলো এই সমস্ত ধ্বংসাত্মক চিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বন্ধের জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।

আসলে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের একটি নিজস্ব নেটওয়ার্ক রয়েছে। কোন দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ কেমন, কোথায় ঝুঁকি বেশি আর কোথায় তাদের পুঁজি নিরাপদ, এসব নিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা করেন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের চিরাচরিত সমস্যাগুলো সম্পর্কে তাদের ধারণা থাকলেও, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তা তাদেরকে মারাত্মকভাবে আতঙ্কিত এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে তুলেছে।

জাপানের একটি শীর্ষ থিঙ্কট্যাঙ্কে কর্মরত এক কর্মকর্তার ভাষায়, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যেভাবে রূপগঞ্জের গাজী টায়ার কারখানায় দল বেঁধে লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, তা দেখে বিনিয়োগকারীরা সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন। এখনও জাপানে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হলে ‘গাজী টায়ার ট্র্যাজেডি’র উদাহরণ দেওয়া হচ্ছে। তাদের অভিমত ‘কোনো জাতি কতটা নির্বোধ ও আত্মঘাতী হলে নিজেদের দেশের এমন সচল কর্মসংস্থান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে এভাবে ধ্বংস করতে পারে।’ এই একটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও বিনিয়োগের নিরাপত্তাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।’

কর্মসংস্থান সংকটের নীরব বিস্তার

একটি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান শুধু কয়েকশ মানুষকে চাকরি দেয় না; এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন, কাঁচামাল সরবরাহ, খুচরা ব্যবসা, আবাসন, ব্যাংকিং, তথ্যপ্রযুক্তি, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ অসংখ্য সহায়ক খাত। অর্থাৎ একটি বিনিয়োগ বহুগুণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি করে।

বিপরীতভাবে, একটি বিনিয়োগ স্থগিত হলে তার প্রভাবও বহুমাত্রিক হয়। শুধু একটি কারখানা নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো স্থানীয় অর্থনীতি।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রতি বছর অন্তত ২০-২২ লাখ নতুন কর্মপ্রত্যাশীর সংখ্যা বাড়ছে। তার ওপর ওপর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর একের পর বন্ধ হচ্ছে শিল্প কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। অথচ শিল্পে নতুন বিনিয়োগের গতি সেই হারে বাড়ছে না। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একাংশ দীর্ঘদিন চাকরি পাচ্ছেন না, আবার অনেক দক্ষ কর্মী বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছেন। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতার জন্যও উদ্বেগজনক।

বিশ্বব্যাংক | কালবেলা

সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি

বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। বিনিয়োগ অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা, এক-স্টপ সেবার সম্প্রসারণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন প্রণোদনা, নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে বিশেষ তহবিলের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকার আগামী কয়েক বছরে এফডিআইকে মোট দেশজ উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে।

এসব উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে ইতিহাস বলে, বিনিয়োগকারীরা ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নকে বেশি গুরুত্ব দেন। যদি ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হয়, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে না আসে, দ্রুত ও নিরপেক্ষ প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত না হয়, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ করা না যায় এবং কর ও বাণিজ্যনীতিতে ধারাবাহিকতা বজায় না থাকে, তাহলে শুধু প্রণোদনা দিয়ে বড় ধরনের বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন হবে।

বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে তাদের মূল্যায়নে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি আর্থিক খাতের সংস্কার, প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা পরিবেশ, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, সহজ বাণিজ্যনীতি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

তাদের মতে, বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা কাটানো ছাড়া প্রবৃদ্ধির গতি পুনরুদ্ধার কঠিন। এই মূল্যায়ন নতুন নয়। দেশের অর্থনীতিবিদরাও দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের সংস্কারের কথা বলে আসছেন।

সব সংকটের মধ্যেও আশার জায়গা রয়েছে। বাংলাদেশ এখনও প্রায় ১৮ কোটির বৃহৎ ভোক্তা বাজার, প্রতিযোগিতামূলক শ্রমশক্তি, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, শক্তিশালী তৈরি পোশাক খাত, দ্রুত বিকাশমান তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং উন্নত অবকাঠামোর সুবিধা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব, পুনর্বিনিয়োগের বৃদ্ধি এবং ব্যবসা সহজীকরণে সংস্কার প্রচেষ্টা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু এগুলোকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে হলে আস্থার সংকট দূর করাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, অন্তর্বর্তী সময়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিনিয়োগ কমে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তার মতে, অতিরিক্ত প্রচারণার পরিবর্তে বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এখন কী করা প্রয়োজন

অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রবৃদ্ধির পরবর্তী ধাপে যেতে হলে উৎপাদনশীল বেসরকারি বিনিয়োগের বিকল্প নেই। সরকারি ব্যয় দিয়ে কিছু সময় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা গেলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং শিল্পায়নের জন্য শক্তিশালী বেসরকারি খাত অপরিহার্য।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আবারও বিনিয়োগমুখী করতে কয়েকটি বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রথমত, ব্যাংকিং খাতে কঠোর সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, করনীতি, শুল্কনীতি ও বিনিয়োগনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে উদ্যোক্তারা পাঁচ বা দশ বছরের পরিকল্পনা করতে পারেন।

তৃতীয়ত, শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে অনুমোদন ও সেবার পুরো প্রক্রিয়াকে সময়সীমার মধ্যে আনতে হবে। পঞ্চমত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়াতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বিনিয়োগকারীরা মূলধনের আগে আস্থাই বিনিয়োগ করেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতি অতীতেও বহু সংকট অতিক্রম করেছে। বৈশ্বিক মন্দা, মহামারি, যুদ্ধজনিত অভিঘাত—সবকিছুর মধ্যেও দেশের উদ্যোক্তারা উৎপাদন ধরে রেখেছেন। তাই বর্তমান সংকটও অতিক্রম করা অসম্ভব নয়।

কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, বিনিয়োগ কখনো অনিশ্চয়তার পরিবেশে বিকশিত হয় না। যে দেশে নীতির ধারাবাহিকতা থাকে, আর্থিক খাত শক্তিশালী থাকে, জ্বালানি ও অবকাঠামো নির্ভরযোগ্য থাকে, প্রশাসন হয় দক্ষ এবং আইনের শাসনের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা থাকে, সেই দেশেই শিল্প গড়ে ওঠে, কর্মসংস্থান বাড়ে এবং প্রবৃদ্ধি টেকসই হয়।

বাংলাদেশের সামনে এখনও সেই সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজন সাহসী সংস্কার, দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সর্বোপরি আস্থা ফিরিয়ে আনার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা।

কারণ অর্থনীতির ইতিহাস বারবার একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়, বিনিয়োগের চাকা থেমে গেলে উন্নয়নের চাকা বেশিদিন সচল থাকে না। আর সেই চাকা আবার ঘুরতে শুরু করলে শুধু শিল্প নয়, জেগে ওঠে একটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং মানুষের ভবিষ্যৎ।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ, পূঁজিবাজারে বিনিয়োগ এবং ফান্ড ম্যানেজারদের বিনিয়োগসহ সব ধরনের সুযোগ উন্মুক্ত হচ্ছে। সরকার প্রণীত বিনিয়োগ-বান্ধব বাজেটের হাত ধরে দেশ ধারাবাহিক অগ্রগতি ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে খুব দ্রুত এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

জনপ্রিয় সংবাদ

এইডস প্রতিরোধে অর্থসংকট, বিশ্বজুড়ে আবারও এইচআইভি সংক্রমণ বাড়ার শঙ্কা

আস্থার সংকটে বিনিয়োগ ঃঝুঁকিতে কর্মসংস্থান

০৭:০৪:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

অর্থনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো, বিনিয়োগ ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। ভোগব্যয় অর্থনীতিকে কিছু সময় সচল রাখতে পারে, সরকারি ব্যয়ও সাময়িক গতি দিতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং আয় বৃদ্ধির একমাত্র টেকসই উৎস হচ্ছে বিনিয়োগ। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি কেবল একটি খাতভিত্তিক সংকট নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য সতর্ক সংকেত।

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দেড় দশক ধরে যে কয়েকটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিল, তার অন্যতম ছিল বেসরকারি বিনিয়োগ। তৈরি পোশাক শিল্পের সম্প্রসারণ, অবকাঠামো নির্মাণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ, আবাসন খাতের বিস্তার এবং সেবা খাতের দ্রুত প্রসার, সবকিছুর চালিকাশক্তি ছিল উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ। কিন্তু গত প্রায় দুই বছরে সেই চিত্রে স্পষ্ট পরিবর্তন এসেছে। নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠার গতি কমেছে, পুরোনো অনেক শিল্প সম্প্রসারণের পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছে, আবার কিছু কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে কিংবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বদলে বেকারত্বের চাপ বাড়ছে, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

দেশের শিল্পাঞ্চলগুলো ঘুরে দেখলে কিংবা ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা বললে একটি অভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্প হাতে নিতে আগ্রহী নন। যাঁরা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই তা স্থগিত রেখেছেন। নতুন শিল্প স্থাপনের পরিবর্তে এখন অধিকাংশ উদ্যোক্তার লক্ষ্য বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখা। কারণ তাঁরা মনে করছেন, বর্তমান অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে নতুন ঝুঁকি নেওয়ার সময় এটি নয়।

বিনিয়োগের এই মন্থরতার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে কর্মসংস্থানে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও নতুন শিল্প ও সেবা খাত পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। অনেক কারখানায় নিয়োগ কার্যত বন্ধ। কোথাও কোথাও উৎপাদন কমে যাওয়ায় কর্মী ছাঁটাইও হচ্ছে। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণ থেকে শুরু করে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক, সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাহবুব আলী বলেন, ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগের বর্তমান স্থবিরতাকে অনেকেই সাময়িক অর্থনৈতিক মন্দা হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। এটি কেবল বৈশ্বিক অস্থিরতার ফল নয়, আবার শুধু একটি সরকারের নীতিগত ব্যর্থতারও পরিণতি নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা কাঠামোগত দুর্বলতা, আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা, নীতিগত অসঙ্গতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আস্থাহীনতার সম্মিলিত ফল আজকের বিনিয়োগ স্থবিরতা।’

বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার অর্থনীতি বিশেষ করে বিনিয়োগ চাঙা করতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে নানা ধরনের শুল্ক-করছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আবার সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য বিশেষ বরাদ্দসহ শুল্ক-করে ছাড় দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর প্রত্যাশা, আগামী দুই বছরের মধ্যে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে।

স্থবিরতার প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে বেসরকারিকরণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণ শুরু হয় মুলত আশির দশকে থেকে। ১৯৮২ সালের ‘নিউ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি’র (এনআইপি) মাধ্যমে অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ব্যক্তিখাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রামে দেশের প্রথম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) চালু হয়, যা পরবর্তীতে বিনিয়োগ আকর্ষণে অত্যন্ত সফল প্রমাণিত হয়।

পোশাক শিল্পে বাড়ছে না বিনিয়োগ | কালবেলা

আশির দশকে শুরু হওয়া তৈরি পোশাক শিল্প নব্বইয়ের দশকে বিশাল বৈদেশিক ও দেশীয় বিনিয়োগ আকর্ষণ করে। এই খাতটি বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। বিনিয়োগ বাড়াতে ১৯৯৮ সালে ‘বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট’ (বিওআই) গঠিত হয়। পরবর্তীতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ওয়ান-স্টপ সার্ভিস প্রদানের লক্ষ্যে ২০১৬ সালে বিওআই ও বেসরকারীকরণ কমিশন একীভূত হয়ে গঠিত হয় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। এছাড়া ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল (বেজা) গড়ে তোলার বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নেওয়া হয়।

আশির দশক-পরবর্তী ভিয়েতনাম, চীন, মেক্সিকো ও ভারতের মতো দেশ অর্থনৈতিকভাবে বিকাশ লাভ করে। সে সময় দেশগুলো উৎপাদন খাতে এফডিআই আকর্ষণ করতে পেরেছিল। মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলেও রয়েছে এফডিআই। দেশটিতে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও একই।

বাংলাদেশেও এফডিআইবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে গ্রহণ করতে হয় নানা ধরনের নীতি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে কোনো কার্যকর বিনিয়োগ নীতিমালা নেই। বিনিয়োগ আকর্ষণে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিনিয়োগের চেয়ে সরকারগুলোকে ঋণের পেছনেই বেশি ছুটতে দেখা গেছে।

এফডিআই বাড়াতে দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ৩৯টি হাইটেক পার্ক তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নেওয়া হয়েছে ওয়ান স্টপ সার্ভিস ব্যবস্থা। তবু বিনিয়োগ কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছায়নি।

বাংলাদেশের বিনিয়োগের প্রধান  বাধা ছিল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও লালফিাতর দৌরাত্ব্য। সাম্প্রতিক সময়ে এই জটিলতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট। ফলে বিভিন্ন সময়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও তা কাংখিত মাত্রায় বিনিয়োগ আকর্ষণে ভূমিকা খাততে পারেনি।

গত কয়েক বছর ধরেই দেশে বিনিয়োগে মন্দা চলছে। তার ওপর ক্ষমতার পটপরিবর্তন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক সংকটসহ নানা কারণে গত দুই বছর ধওে দেশে দেশি-বিনিয়োগে চরম স্থবিরতা চলছে। ব্যবসা-বাণিজ্যেও চলছে মারাত্মক শ্লথগতি। সরকারি পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিনিয়োগ সর্বনি¤œ অবস্থায় নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জিডিপির সাময়িক হিসাবে দেখা গেছে, এই অর্থবছরের জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। গত ১৪ বছরে জিডিপির অনুপাতে এত কম বিনিয়োগ হয়নি। ২০১২-১৩ অর্থবছরের পরে জিডিপি-বিনিয়োগ অনুপাত এত কমেনি।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ অংশ কমে যাওয়া বেশ উদ্বেগজনক। কয়েক দশক ধরে বেসরকারি খাত প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি হিসেবে পরিচিত। এই পরীক্ষিত চালিকা শক্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের মাধ্যমেই দেশের রপ্তানি বেড়েছে এবং তারা অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানে ভূমিকা রেখেছে।

৬ বছরে দেশের মানুষের গড় আয় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির জন্য আরও বেশি কার্যকর কর্মসংস্থান (শোভন কর্মসংস্থান) দরকার। কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির থাকায় সেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে বৈচিত্র্যময় রপ্তানি খাত দরকার। এ জন্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু বিনিয়োগ না থাকায় কর্মসংস্থানেও স্থবিরতা বিরাজ করছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, গত কয়েক বছরে বিনিয়োগ পরিস্থিতির বড় কোনো উন্নতি হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও বিনিয়োগ নিয়ে বড় অগ্রগতি ছিল না।

পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজধানী ঢাকায় ঘটা করে বিনিয়োগ সম্মেলন করা হয়। সম্মেলনে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আকর্ষণীয় উপস্থাপনা দেওয়া হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশা দেখানো হলেও বাস্তবতা ছিলো নেতিবাচক।

এছাড়া গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ করের পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায়ই দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তা ছাড়া ঋণের সুদের হারও বেশি। এসব কারণে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে।

অনেকেই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মহামারির অভিঘাত কিংবা যুদ্ধজনিত সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্নকে দায়ী করেন। এসব কারণের প্রভাব অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন একই বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও অনেক প্রতিযোগী দেশ তুলনামূলকভাবে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে, অথচ বাংলাদেশে বিনিয়োগের গতি এতটা কমে গেছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিশ্লেষণ করতে হবে। ডলার সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, উচ্চ সুদহার, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, নীতিগত অসামঞ্জস্য, প্রশাসনিক জটিলতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি, সব মিলিয়ে একটি জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা যুক্ত হয়ে বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

বন্ধ হচ্ছে শিল্প, বাড়ছে উদ্বেগ

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন খাতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কাঁচামাল আমদানির খরচ বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম, উচ্চ সুদে ঋণ, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিশ্চয়তা এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান লাভজনক অবস্থান হারিয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। বড় শিল্পগোষ্ঠী কোনোভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও ছোট উদ্যোক্তাদের অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে শিল্পায়নের গতিও মন্থর হবে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ার বদলে বিদ্যমান উদ্যোক্তারাই যদি বাজার থেকে সরে যেতে শুরু করেন, তাহলে অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সর্বশেষ আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২ হাজার ২০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, যার মধ্যে রয়েছেন ১ হাজার ৭০০ শ্রমিক।

তিন শিল্প এলাকায় সাত মাসে বন্ধ ৯৫ কারখানা | প্রথম আলো

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি জুন পর্যন্ত শিল্প অধ্যুষিত সাতটি এলাকায় মোট ৪৫৭ কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্প গোয়েন্দা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪৫৭ কারখানার মধ্যে ২০৫টি বন্ধ হয়েছে পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশের অভাবে। ১৯০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে মালিকের আর্থিক সংকটে। অর্থাৎ ৮৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ কারখানা বন্ধের প্রধান কারণ পর্যাপ্ত কাজের অভাব ও মালিকের আর্থিক সংকট। এছাড়া শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বন্ধ হয়েছে ১১টি কারখানা। রাজনৈতিক, ব্যাংক জটিলতা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, কাঁচামালের অভাব ও ফ্যাক্টরি স্থানান্তরসহ অন্যান্য কারণে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে ৫১টি কারখানা।

ফলে এসব কারখানার শ্রমিকরা নতুন করে বেকার হয়ে পড়েছেন। এভাবে প্রতিনিয়ত বিদ্যামান শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন বেকারত বাড়ছে। এতে দেশের চলমান বেকারত্বের মিছিলে ক্রমান্বয়ে দীর্ঘ হচ্ছে।

অন্যদিকে, বছরের পর বছর অপেক্ষার পরও মিলছে না গ্যাস সংযোগ। ডিমান্ড নোটের টাকা পরিশোধ করেও উৎপাদনে যেতে পারছে না সাড়ে পাঁচ শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এতে গ্যাস সংযোগের দীর্ঘসূত্রতায় চরম সংকটে পড়েছে দেশের শিল্প খাত। প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া শেষ করে এরই মধ্যে ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়ে গ্যাস সংযোগের জন্য চার-পাঁচ বছর ধরে অপেক্ষায় রয়েছে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করেও তারা পাচ্ছে না কাঙ্খিত গ্যাস সংযোগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দেশের বিভিন্ন গ্যাস বিতরণ কম্পানির কাছে শিল্প খাতে নতুন সংযোগের জন্য বর্তমানে এক হাজার ৮০০টিরও বেশি আবেদন জমা রয়েছে। কিন্তু গ্যাসসংকট ও নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বেশির ভাগ আবেদনই বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে।

এর ফলে নতুন কারখানা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক উদ্যোক্তার স্থাপনা প্রস্তুত থাকলেও উৎপাদন শুরু করতে না পারায় ব্যাংকঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং অন্যান্য আর্থিক চাপ বাড়ছে। এতে নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহ হচ্ছেন উদ্যোক্তারা।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতেও একই চিত্র। শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে গড়ে তোলা এসব অঞ্চলের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত করেও গ্যাস সংযোগের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারছে না। এতে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।

জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ছয়টি গ্যাস বিতরণ কম্পানির কাছে শিল্পে গ্যাস সংযোগের জন্য এক হাজার ৮০০টি আবেদন রয়েছে। এসব সংযোগ দিতে হলে প্রতিদিন অতিরিক্ত এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট বাড়তি গ্যাস প্রয়োজন হবে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন ডিভিশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, ‘বর্তমানে তিতাসের কাছে ডিমান্ড নোট পরিশোধ করা প্রায় ৪৯০টি প্রতিষ্ঠান গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে শুধু তিতাসেই নতুন সংযোগের জন্য আরো প্রায় এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০টি আবেদন জমা রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ না থাকায় এসব আবেদন নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না।’

তিনি বলেন. ‘এসব আবেদন ও তালিকা এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি পুরোপুরি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত। মন্ত্রণালয় যাদের অনুমোদন দেবে আমরা তাদেরই সংযোগ দেব।’

ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে চীনের আগ্রহ, সমঝোতার চেষ্টা সামিটের | কালের  কণ্ঠ

সাইদুল হাসান আরো বলেন, ‘বর্তমানে আমরা আমাদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছি না। কবে নাগাদ পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাবে, সেটাও নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বর্তমানে যে দুটি এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) রয়েছে, সেগুলোর মাধ্যমে বাড়তি গ্যাস সরবরাহ চলছে। এই সক্ষমতার বাইরে অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব নয়। তবে সরকার নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, অনশোর ও অফশোরে টেন্ডার এবং নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগবে।’

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, ‘বর্তমান শিল্পকারখানাগুলোই যখন পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না, তখন নতুন শিল্প স্থাপনের কথা বলা বাস্তবসম্মত নয়। বিদ্যমান শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হলে সরকারের প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও অর্জন করা কঠিন হবে।’

তিনি বলেন, ‘সরকার বন্ধ কারখানাগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে চালুর কথা বলছে। কিন্তু যেসব কারখানা এখনো চালু রয়েছে, সেগুলোই যদি গ্যাসসংকটের কারণে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে শুধু অর্থায়নের মাধ্যমে এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা সচল করা সম্ভব হবে না।’

আশিক চৌধুরী সমাচার

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এই আশিক চৌধুরী নামে সমধিক পরিচিত এই চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনকে নিয়েই বিস্তর ঢাকঢোল পেটানো হয়েছিল। সেই সময় বিনিয়োগ সম্মেলন করে অত্যন্ত জোর দিয়ে বলা হয়েছিল যে, তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বাংলাদেশে প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আসতে যাচ্ছেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক, আন্তর্জাতিক রোডশো, চীন-জাপান-যুক্তরাষ্ট্র-কাতার সফর, বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট আয়োজন, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সংস্কার, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, সবকিছু মিলিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজন আর খরচেরও কোনো কমতি ছিল না। সবকিছু মিলিয়ে তিনি বিনিয়োগ আকর্ষণের নতুন মুখ হয়ে ওঠেন।

বেসরকারি খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং করপোরেট বিশ্বের পরিচিত মুখ হওয়ায় তাকে ঘিরে ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রায় দুই বছর পর প্রশ্ন উঠছে, এই প্রচেষ্টা কি বাস্তব ফল দিয়েছে? নাকি বিনিয়োগের বড় বড় ঘোষণার আড়ালে বিদেশি বিনিয়োগের প্রকৃত চিত্র এখনও হতাশাজনক?

বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ডের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন ১৮ জুন এক কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে যা বলেছেন, তা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তার নিয়োগের সময় ছড়ানো আশার ফুলঝুরিতে গুড়েবালি ঢেলে দেওয়ার মতো হয়েছে। তিনি বলেছেন, তার প্রতিষ্ঠান এখন আর বিদেশি নয়, দেশিয় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কাজ করছে। তার যুক্তি হলো, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে বৈশ্বিকভাবে বিনিয়োগের প্রবাহ তুলনামূলকভাবে দুর্বল। এ কারণে তারা গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্টের ওপর বেশি ফোকাস না করে, দেশিয় বিনিয়োগকারীদের ওপর জোর দেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং দেশের বাইরের চেয়ে ভেতরের সম্ভাবনার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন।

কত টাকার বিনিয়োগ এলো সম্মেলনে, জানালেন বিডা চেয়ারম্যান

ইউনূস সরকারের বিদায়ের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরও আশিক চৌধুরী ওই পদে বহাল রয়েছেন। হয়তো কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখার বিবেচনায় তাকে ওই পদে বহাল রাখা হয়েছে। কিন্তু এখন যখন তিনি নিজেই বিদেশি বিনিয়োগের আশা ছেড়ে বৈশ্বিক পরিস্থিতির অজুহাতে দেশিয় বিনিয়োগের দিকে মুখ ফেরানোর কথা বলছেন, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় আমাদের সবুরের মেওয়া মাকাল ফলে পরিণত হতে যাচ্ছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কার স্থবিরতা দেখতে দেখতে দেশের মানুষের মনে আশার জন্ম হয়েছিল যে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরবে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার হবে এবং এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগ পরিস্থিতিরও উন্নতি ঘটবে। কিন্তু আশিক চৌধুরীর সাম্প্রতিক এই বক্তব্য সেই আশায় বড় একটি ধাক্কা দিল।

অবশ্য আশিক চৌধুরী পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তিনি বলছেন, বিনিয়োগ কমার পেছনে বিডার ব্যর্থতার চেয়ে বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং নির্বাচনকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের অপেক্ষার মনোভাব বড় ভূমিকা রেখেছে।

তার মতে, বিনিয়োগের একটি বড় পাইপলাইন তৈরি হয়েছে, কিন্তু তা বাস্তবায়নে সময় লাগছে। তাই বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগের চেয়ে দেশীয় বিনিয়োগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে বিনিয়োগ সংকট বিশ্লেষণে সবচেয়ে বড় ভুল হবে যদি সব দায় একটি নির্দিষ্ট সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। বাস্তবতা হলো, বর্তমান সংকটের বীজ অনেক আগেই রোপিত হয়েছিল।

দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, আর্থিক খাতে জবাবদিহির অভাব, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় চাপ এবং কিছু ক্ষেত্রে নীতিগত শৈথিল্য অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে তোলে। এসব দুর্বলতা তখন খুব বেশি দৃশ্যমান না হলেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা আসার পর সেগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে বড় সংকট আস্থা

অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত কেবল মুনাফার ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে সমানভাবে জড়িত আস্থা। একজন উদ্যোক্তা তখনই নতুন কারখানা গড়বেন, যখন তিনি বিশ্বাস করবেন যে আগামী পাঁচ বা দশ বছরে তাঁর ব্যবসার পরিবেশ মোটামুটি স্থিতিশীল থাকবে। তিনি প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাবেন, ব্যাংক থেকে অর্থায়ন করতে পারবেন, নীতিমালা হঠাৎ বদলে যাবে না এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজার থাকবে। তিনি কাঁচামাল আমদানি করতে পারবেন, করনীতি বারবার পরিবর্তিত হবে না এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অযথা হয়রানির শিকার হতে হবে না।

ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, এই নিশ্চয়তাগুলোর কোনোটিই পুরোপুরি নেই। ফলে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতির জন্য এটিই সবচেয়ে উদ্বেগজনক বার্তা। কারণ বিনিয়োগকারীর আস্থা হারিয়ে গেলে করছাড়, প্রণোদনা বা স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সুবিধা দিয়েও কাঙ্খিত ফল পাওয়া কঠিন।

অর্থনীতি গতিশীল করতে বিদেশি বিনিয়োগ কতটা ভূমিকা রেখেছে?

বাংলাদেশে বর্তমানে এই আস্থার জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনিশ্চয়তা এতটাই বেড়েছে যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে নগদ অর্থ সংরক্ষণকে নিরাপদ মনে করছেন। এটি অর্থনীতির জন্য একটি অশনি সংকেত। কারণ উদ্যোক্তারা যখন ঝুঁকি নিতে চান না, তখন নতুন শিল্প গড়ে ওঠে না, প্রযুক্তি আসে না, উৎপাদন বাড়ে না এবং কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয় না।

সব বিশ্লেষণের শেষে একটি বিষয়ই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাংলাদেশে অর্থ, উদ্যোক্তা বা বাজারের সম্পূর্ণ অভাব নেই। যা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা হলো আস্থা। ব্যবসায়ীরা বিশ্বাস করেন যে নীতির ধারাবাহিকতা থাকবে, আর্থিক খাত স্থিতিশীল হবে, জ্বালানি নিশ্চিত থাকবে, প্রশাসনিক সেবা দ্রুত পাওয়া যাবে এবং প্রতিযোগিতার জন্য সমান সুযোগ থাকবে, তবে বিনিয়োগ ফিরতে খুব বেশি সময় লাগবে না।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে আস্থা পুনর্গঠনই সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংস্কার। কারণ বিনিয়োগের চাকা সচল না হলে উৎপাদন বাড়বে না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না, রাজস্ব বাড়বে না এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যও অধরাই থেকে যাবে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকিং সংস্কার, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, বিনিময় হার ও আর্থিক খাতে কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নীতিগত ঘোষণার তুলনায় বাস্তবায়নের গতি ধীর, ফলে আস্থা ফিরতে সময় লাগছে।

বিনিয়োগের নীরব শত্রু ৫ সংকট  

বাংলাদেশের বিনিয়োগ বর্তমানে ৫ সংকটে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই পাচ সংকট হলো ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, নিরবিচ্ছিন্ন জ্বালানি প্রাপ্তিতে অনিশ্চয়তা, নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা এবং ডলার সংকট।

বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নির্ভর করছে এই পাঁচ সমস্যার চূড়ান্ত সমাধানের ওপর। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আস্থা সংকট কেটে গেলেও এই পাচ সমস্যার সমাধান না করা গেলে শেষ পর্যন্ত দেশে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ নাগালের বাইরেই থেকে যাবে।

বাংলাদেশের বিনিয়োগ সংকটের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি হলো ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা। বহু বছর ধরে খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি, দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব, ঝুঁকি মূল্যায়নের ঘাটতি এবং অনিয়মিত ঋণ পুনঃতফসিলের সংস্কৃতি ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

এর ফলে অনেক ব্যাংক নতুন শিল্পঋণ দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে। ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ থেকে দেখা যাচ্ছে, চার বছর (২০২১) আগেও দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আয়ের প্রধান উৎস ছিল ঋণ বিতরণ। কিন্তু মাত্র চার বছরের ব্যবধানে সেই চিরচেনা চিত্র পুরোপুরি উল্টে গেছে। এখন আর ঋণ নয়, বরং সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগেই মুনাফা বেশি হচ্ছে।

High interest rates deepen trouble for businesses and employment | |  Bangladesh Pratidin

অন্যদিকে উচ্চ সুদহার উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। যে উদ্যোক্তা কয়েক বছর আগে তুলনামূলক কম খরচে ঋণ নিয়ে কারখানা সম্প্রসারণের কথা ভাবতে পারতেন, তিনি এখন সুদ, জ্বালানি ব্যয় এবং বাজার অনিশ্চয়তার সম্মিলিত চাপ বিবেচনা করে বিনিয়োগ থেকে সরে আসছেন।

দ্বিতীয়ত: বাংলাদেশের শিল্পায়নের অন্যতম বড় ভিত্তি ছিল তুলনামূলক সস্তা জ্বালানি। কিন্তু গত দুই বছরে গ্যাসের সীমিত সরবরাহ, বিদ্যুতের ব্যাঘাত এবং জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটি আধুনিক কারখানা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে স্থাপন করার পর যদি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস বা বিদ্যুৎ না পাওয়া যায়, তাহলে সেই বিনিয়োগের অর্থনৈতিক যুক্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক উদ্যোক্তা তাই নতুন প্রকল্পে না গিয়ে অপেক্ষার কৌশল গ্রহণ করেছেন।

তৃতীয়ত: বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ শুধু করছাড় দিয়ে তৈরি হয় না; প্রয়োজন নীতির ধারাবাহিকতা। ব্যবসায়ীরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, করনীতি, শুল্কহার, আমদানি বিধি বা নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তে ঘন ঘন পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে কঠিন করে তোলে।

চতুর্থত: এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা। শিল্প স্থাপনের অনুমোদন, জমি, পরিবেশ ছাড়পত্র, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ, কর সংক্রান্ত প্রক্রিয়া—সব মিলিয়ে সময় ও ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এই অদৃশ্য ব্যয়ও বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে।

পঞ্চমত: শিল্পায়নের জন্য শুধু অর্থ নয়, প্রয়োজন কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি। কিন্তু গত কয়েক বছরে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এই পুরো প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলেছে।

অনেক উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্বের মুখে পড়েছেন। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও কমেছে। ফলে নতুন শিল্প স্থাপনের পরিবর্তে অনেক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান উৎপাদন ধরে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে। যারা নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন।

বিশ্ব অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। উচ্চ সুদহার, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার পরিবর্তন এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিনিয়োগে প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর শিল্প অর্থনীতির জন্য এই চাপ আরও বেশি।

তবে বৈশ্বিক সংকট সব দেশের জন্য সমান হলেও এর প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করে প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির ওপর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো আন্তর্জাতিক চাপকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাবমূর্তি

দুর্বল অবকাঠামো, সীমিত অর্থায়ন, বাড়তি কর, জ্বালানি সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি এবং দক্ষ জনবলের অভাব বাংলাদেশে বিনিয়োগের চিরচেনা কিছু সমস্যা। তবে এর বাইরে সম্পূর্ণ নতুন একটি সংকট এখন বিনিয়োগের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটি হলো- অগাস্ট-পরবর্তী ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অকার্যকারিতা।

সরেজমিন: পুড়ে ছাই গাজী টায়ার ফ্যাক্টরি, নিখোঁজদের খোঁজে স্বজনরা - BBC  News বাংলা

জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর আওয়ামীপন্থিদের কলকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের যে সব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর ছবি ও ভিডিও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। উপরন্তু, প্রতিযোগী ও অবন্ধুসুলভ রাষ্ট্রগুলো এই সমস্ত ধ্বংসাত্মক চিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বন্ধের জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।

আসলে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের একটি নিজস্ব নেটওয়ার্ক রয়েছে। কোন দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ কেমন, কোথায় ঝুঁকি বেশি আর কোথায় তাদের পুঁজি নিরাপদ, এসব নিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা করেন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের চিরাচরিত সমস্যাগুলো সম্পর্কে তাদের ধারণা থাকলেও, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তা তাদেরকে মারাত্মকভাবে আতঙ্কিত এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে তুলেছে।

জাপানের একটি শীর্ষ থিঙ্কট্যাঙ্কে কর্মরত এক কর্মকর্তার ভাষায়, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যেভাবে রূপগঞ্জের গাজী টায়ার কারখানায় দল বেঁধে লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, তা দেখে বিনিয়োগকারীরা সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন। এখনও জাপানে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হলে ‘গাজী টায়ার ট্র্যাজেডি’র উদাহরণ দেওয়া হচ্ছে। তাদের অভিমত ‘কোনো জাতি কতটা নির্বোধ ও আত্মঘাতী হলে নিজেদের দেশের এমন সচল কর্মসংস্থান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে এভাবে ধ্বংস করতে পারে।’ এই একটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও বিনিয়োগের নিরাপত্তাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।’

কর্মসংস্থান সংকটের নীরব বিস্তার

একটি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান শুধু কয়েকশ মানুষকে চাকরি দেয় না; এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন, কাঁচামাল সরবরাহ, খুচরা ব্যবসা, আবাসন, ব্যাংকিং, তথ্যপ্রযুক্তি, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ অসংখ্য সহায়ক খাত। অর্থাৎ একটি বিনিয়োগ বহুগুণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি করে।

বিপরীতভাবে, একটি বিনিয়োগ স্থগিত হলে তার প্রভাবও বহুমাত্রিক হয়। শুধু একটি কারখানা নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো স্থানীয় অর্থনীতি।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রতি বছর অন্তত ২০-২২ লাখ নতুন কর্মপ্রত্যাশীর সংখ্যা বাড়ছে। তার ওপর ওপর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর একের পর বন্ধ হচ্ছে শিল্প কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। অথচ শিল্পে নতুন বিনিয়োগের গতি সেই হারে বাড়ছে না। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একাংশ দীর্ঘদিন চাকরি পাচ্ছেন না, আবার অনেক দক্ষ কর্মী বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছেন। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতার জন্যও উদ্বেগজনক।

বিশ্বব্যাংক | কালবেলা

সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি

বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। বিনিয়োগ অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা, এক-স্টপ সেবার সম্প্রসারণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন প্রণোদনা, নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে বিশেষ তহবিলের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকার আগামী কয়েক বছরে এফডিআইকে মোট দেশজ উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে।

এসব উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে ইতিহাস বলে, বিনিয়োগকারীরা ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নকে বেশি গুরুত্ব দেন। যদি ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হয়, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে না আসে, দ্রুত ও নিরপেক্ষ প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত না হয়, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ করা না যায় এবং কর ও বাণিজ্যনীতিতে ধারাবাহিকতা বজায় না থাকে, তাহলে শুধু প্রণোদনা দিয়ে বড় ধরনের বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন হবে।

বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে তাদের মূল্যায়নে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি আর্থিক খাতের সংস্কার, প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা পরিবেশ, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, সহজ বাণিজ্যনীতি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

তাদের মতে, বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা কাটানো ছাড়া প্রবৃদ্ধির গতি পুনরুদ্ধার কঠিন। এই মূল্যায়ন নতুন নয়। দেশের অর্থনীতিবিদরাও দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের সংস্কারের কথা বলে আসছেন।

সব সংকটের মধ্যেও আশার জায়গা রয়েছে। বাংলাদেশ এখনও প্রায় ১৮ কোটির বৃহৎ ভোক্তা বাজার, প্রতিযোগিতামূলক শ্রমশক্তি, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, শক্তিশালী তৈরি পোশাক খাত, দ্রুত বিকাশমান তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং উন্নত অবকাঠামোর সুবিধা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব, পুনর্বিনিয়োগের বৃদ্ধি এবং ব্যবসা সহজীকরণে সংস্কার প্রচেষ্টা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু এগুলোকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে হলে আস্থার সংকট দূর করাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, অন্তর্বর্তী সময়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিনিয়োগ কমে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তার মতে, অতিরিক্ত প্রচারণার পরিবর্তে বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এখন কী করা প্রয়োজন

অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রবৃদ্ধির পরবর্তী ধাপে যেতে হলে উৎপাদনশীল বেসরকারি বিনিয়োগের বিকল্প নেই। সরকারি ব্যয় দিয়ে কিছু সময় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা গেলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং শিল্পায়নের জন্য শক্তিশালী বেসরকারি খাত অপরিহার্য।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আবারও বিনিয়োগমুখী করতে কয়েকটি বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রথমত, ব্যাংকিং খাতে কঠোর সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, করনীতি, শুল্কনীতি ও বিনিয়োগনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে উদ্যোক্তারা পাঁচ বা দশ বছরের পরিকল্পনা করতে পারেন।

তৃতীয়ত, শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে অনুমোদন ও সেবার পুরো প্রক্রিয়াকে সময়সীমার মধ্যে আনতে হবে। পঞ্চমত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়াতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বিনিয়োগকারীরা মূলধনের আগে আস্থাই বিনিয়োগ করেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতি অতীতেও বহু সংকট অতিক্রম করেছে। বৈশ্বিক মন্দা, মহামারি, যুদ্ধজনিত অভিঘাত—সবকিছুর মধ্যেও দেশের উদ্যোক্তারা উৎপাদন ধরে রেখেছেন। তাই বর্তমান সংকটও অতিক্রম করা অসম্ভব নয়।

কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, বিনিয়োগ কখনো অনিশ্চয়তার পরিবেশে বিকশিত হয় না। যে দেশে নীতির ধারাবাহিকতা থাকে, আর্থিক খাত শক্তিশালী থাকে, জ্বালানি ও অবকাঠামো নির্ভরযোগ্য থাকে, প্রশাসন হয় দক্ষ এবং আইনের শাসনের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা থাকে, সেই দেশেই শিল্প গড়ে ওঠে, কর্মসংস্থান বাড়ে এবং প্রবৃদ্ধি টেকসই হয়।

বাংলাদেশের সামনে এখনও সেই সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজন সাহসী সংস্কার, দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সর্বোপরি আস্থা ফিরিয়ে আনার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা।

কারণ অর্থনীতির ইতিহাস বারবার একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়, বিনিয়োগের চাকা থেমে গেলে উন্নয়নের চাকা বেশিদিন সচল থাকে না। আর সেই চাকা আবার ঘুরতে শুরু করলে শুধু শিল্প নয়, জেগে ওঠে একটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং মানুষের ভবিষ্যৎ।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ, পূঁজিবাজারে বিনিয়োগ এবং ফান্ড ম্যানেজারদের বিনিয়োগসহ সব ধরনের সুযোগ উন্মুক্ত হচ্ছে। সরকার প্রণীত বিনিয়োগ-বান্ধব বাজেটের হাত ধরে দেশ ধারাবাহিক অগ্রগতি ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে খুব দ্রুত এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক