০৬:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
বিশ্বমানের জোড্রেল ব্যাংক বন্ধের শঙ্কা, ব্রিটেনে পদার্থবিজ্ঞানীদের দেশ ছাড়ার আশঙ্কা ১৭ বছর পর বিবিসি ব্রেকফাস্ট ছাড়ছেন নাগা মুনচেট্টি, এবার রেডিও ফাইভ লাইভে নতুন সকাল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় দুই শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার, তদন্ত কমিটি গঠন ককরোচের উপমা, শিক্ষার সংকট এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি যুক্তরাজ্যে বছরের চতুর্থ তাপপ্রবাহ, বৃষ্টির অভাবে বাড়ছে দাবানলের শঙ্কা বাংলাদেশে হামের উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি বেড়ে ৮২৮ ফরিদপুরে সবজি ব্যবসায়ী হত্যা: ১৪ বছর পর তিনজনের মৃত্যুদণ্ড সত্যজিৎ রায়ের প্রশংসায় ক্রিস্টোফার নোলান, ‘ভারতের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র নির্মাতা’ পাকিস্তানে মৌসুমি বৃষ্টির তাণ্ডব: আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষয়ক্ষতি, আরও ভারী বৃষ্টির সতর্কতা যুক্তরাজ্যে ধনীদের সংখ্যা কমছে: আর্থিক সংকটের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে মিলিয়নিয়ার, কারণ কী?

ট্রাম্প-পরবর্তী বিশ্বে এশিয়া কেন দ্রুত মানিয়ে নিচ্ছে, আর ইউরোপ কেন এখনও অতীত আঁকড়ে?

  • জন লি
  • ০৪:৫৬:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
  • 15

ডোনাল্ড ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতি নিয়ে সবচেয়ে বড় অস্বস্তিতে পড়েছে ইউরোপ। কয়েক দশক ধরে যে আটলান্টিক জোটকে তারা আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্থায়ী ভিত্তি হিসেবে দেখেছে, সেই সম্পর্কের ধরনই ট্রাম্প আমলে বদলে যেতে শুরু করেছে। ওয়াশিংটনের কাছ থেকে নিঃশর্ত নিরাপত্তা, উদার বাণিজ্যনীতি কিংবা মূল্যবোধভিত্তিক নেতৃত্বের যে প্রত্যাশা ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে লালন করেছে, ট্রাম্প সেই ধারণার প্রায় প্রতিটি স্তম্ভকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

কিন্তু একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় মিত্রদের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান কিংবা ফিলিপাইন—কেউই ট্রাম্পের নীতি নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিল না। তবুও তারা নতুন বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে সেটির মধ্যেই নিজেদের কৌশল খুঁজতে শুরু করে। কারণ তারা বুঝেছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আদর্শের চেয়ে শক্তির গুরুত্ব আবারও বেড়ে যাচ্ছে।

এই পার্থক্যই আজকের ভূরাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

ইউরোপ ও এশিয়ার নিরাপত্তা বাস্তবতা এক নয়। তাই একই ওয়াশিংটনকে তারা সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখে।

ইউরোপের সামনে রাশিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হলেও মহাদেশটির চারপাশে ন্যাটোর শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত ইউরোপীয় নিরাপত্তার প্রধান গ্যারান্টর হিসেবে কাজ করেছে। ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো দীর্ঘ সময় নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়ানোর পরিবর্তে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে বিনিয়োগ করেছে। স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণে বিপুল ব্যয় করার সুযোগ তারা পেয়েছে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার কারণে।

এই দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা ইউরোপে একটি মানসিক কাঠামো তৈরি করেছে। তারা বিশ্বাস করেছে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, আইন, নিয়ম এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতাই বিশ্বকে স্থিতিশীল রাখে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শক্তিও মূলত এখানেই—সামরিক শক্তিতে নয়, বরং নিয়ম নির্ধারণে, মানদণ্ড তৈরিতে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিধিব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারে।

কিন্তু ট্রাম্পের রাজনীতি এই পুরো দর্শনের বিপরীত। তাঁর যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার খরচ বহন করেছে, যার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী অন্য দেশগুলো। তাই ওয়াশিংটন এখন আর নিঃস্বার্থ অভিভাবকের ভূমিকা পালন করবে না; বরং প্রতিটি সম্পর্ককে দেখবে জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে।

এশিয়ার কাছে এই ভাষা নতুন নয়।

চীনের উত্থান গত দুই দশকে এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশকে আমূল বদলে দিয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, দ্রুত আধুনিকায়নশীল সামরিক বাহিনী এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে বেইজিং এখন এশিয়ার প্রতিটি দেশের কৌশলগত হিসাবের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি কেবল একটি কূটনৈতিক সুবিধা নয়; অনেক দেশের কাছে এটি অস্তিত্বগত নিরাপত্তার প্রশ্ন।

এই কারণেই এশীয় মিত্ররা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ককে আদর্শের চেয়ে প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিচার করে। তারা জানে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কঠিন বা অসম চুক্তি করাও শেষ পর্যন্ত চীনের প্রভাববলয়ে চলে যাওয়ার চেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ।

এখানেই ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য।

ইউরোপ বহু বছর ধরে ধরে নিয়েছিল, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রগুলোর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু এশিয়া কখনও এমন বিশ্বাসে অভ্যস্ত ছিল না। এখানে শক্তির ভারসাম্যই সবসময় রাজনীতির প্রধান নির্ধারক ছিল। তাই হোয়াইট হাউসে নতুন প্রেসিডেন্ট এলেই এশিয়ার রাজধানীগুলো দ্রুত নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের অবস্থান সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করে।

এর পেছনে আরেকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে।

ইউরোপের মতো এশিয়ায় ন্যাটোর সমতুল্য কোনো সমষ্টিগত নিরাপত্তা জোট নেই। যুক্তরাষ্ট্র পৃথক পৃথক দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করে। ফলে প্রতিটি নতুন মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে প্রতিটি মিত্র দেশকে আবারও নিজেদের গুরুত্ব প্রমাণ করতে হয়। নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ব্যাখ্যাও অনেক সময় প্রেসিডেন্টভেদে বদলে যায়।

এই অভিজ্ঞতা এশিয়ার কূটনীতিকে অনেক বেশি বাস্তববাদী করে তুলেছে। এখানে কেউ ধরে নেয় না যে কোনো জোট চিরস্থায়ী বা নিঃশর্ত। বরং প্রতিটি সম্পর্ক নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে টিকিয়ে রাখতে হয়।

ফলে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে এসে যখন বাণিজ্য শুল্ক বাড়ালেন, দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ওপর জোর দিলেন এবং পুরোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করলেন, তখন ইউরোপ বিস্মিত হলেও এশিয়ার অনেক দেশ এটিকে নতুন খেলা হিসেবে গ্রহণ করল।

তাদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না ট্রাম্পের ভাষা; বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি ধরে রাখা।

এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যনীতির ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্র যখন তথাকথিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বহু দেশের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করল, তখন ইউরোপ ও এশিয়ার প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। উভয় পক্ষই অভিযোগ করেছিল যে এসব শুল্ক বিদ্যমান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি ও চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিন্তু আপত্তি জানানোর পর তাদের পথ আলাদা হয়ে যায়।

এশিয়া - উইকিপিডিয়া

ইউরোপ প্রথমে পাল্টা শুল্ক, আইনি প্রতিক্রিয়া এবং সমষ্টিগত প্রতিরোধের ভাষা বেছে নেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশ্বাস করত, একটি ঐক্যবদ্ধ বাজার হিসেবে তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে দর-কষাকষিতে শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে পারবে। কিন্তু দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর শেষ পর্যন্ত ব্রাসেলসকেও এমন এক সমঝোতায় পৌঁছাতে হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাজার আরও উন্মুক্ত করা, বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং মার্কিন জ্বালানি আমদানি বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত ফলাফল খুব ভিন্ন ছিল না, যদিও সেখানে পৌঁছানোর পথ ছিল অনেক বেশি সংঘাতপূর্ণ।

অন্যদিকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা তাইওয়ান শুরু থেকেই পরিস্থিতিকে নতুন বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেয়। তারা বুঝেছিল, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে মূল্যবোধের বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে লাভ নেই; বরং এমন একটি সমঝোতা দরকার, যা ওয়াশিংটনের কাছে তাদের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলবে। ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল বিনিয়োগ, গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে অংশীদারিত্ব এবং জ্বালানি ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এসব সিদ্ধান্তে অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেয়েছে, কিন্তু এশিয়ার দৃষ্টিতে সেটিই ছিল নিরাপত্তা সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার মূল্য।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—কেন এশিয়ার দেশগুলো অসম চুক্তি মেনে নিতে প্রস্তুত?

এর উত্তর শুধু অর্থনীতিতে নয়, নিরাপত্তার মনস্তত্ত্বে নিহিত। চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্থান এশিয়ার ছোট ও মাঝারি শক্তিগুলোর সামনে এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে স্বাধীন কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এই দেশগুলোর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কেবল বাণিজ্যের বিষয় নয়; এটি সম্ভাব্য আঞ্চলিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থা। তাই ওয়াশিংটনের সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে আপস করাও তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য, যদি সেটি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।

তবে এই কৌশল ঝুঁকিমুক্ত নয়। সম্পূর্ণ লেনদেনভিত্তিক সম্পর্কের একটি সীমা রয়েছে। যদি কোনো মার্কিন প্রশাসন বৃহত্তর কৌশলগত স্বার্থে বেইজিংয়ের সঙ্গে সমঝোতাকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে এশিয়ার মিত্ররা নিজেদের আরও অনিশ্চিত অবস্থায় দেখতে পারে। তাইওয়ানের মতো দেশগুলোর জন্য এই উদ্বেগ বিশেষভাবে বাস্তব। নিরাপত্তার নিশ্চয়তার বিনিময়ে তারা অর্থনৈতিক ছাড় দিতে রাজি হলেও শেষ পর্যন্ত সেই নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত থাকবে, তার কোনো লিখিত গ্যারান্টি নেই।

অন্যদিকে ইউরোপের সমস্যাও কম নয়। যদি তারা সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়, তাহলে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় অনেক বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। কিন্তু তার অর্থ হবে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যয় পুনর্বিবেচনা করা। সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা পেনশন ব্যবস্থায় কাটছাঁট রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন। ফলে ইউরোপ এমন এক দ্বিধার মধ্যে পড়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে যাওয়াও কঠিন, আবার আগের সম্পর্কও আর আগের মতো নেই।

আরও একটি বাস্তবতা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। ইউরোপ নিজেও আর একক অবস্থানে নেই। রাশিয়ার সীমান্তঘেঁষা পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় অনেক বেশি। এস্তোনিয়া, লাটভিয়া কিংবা লিথুয়ানিয়ার মতো দেশগুলো প্রতিরক্ষায় জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে অপরিহার্য মনে করছে। ফলে ইউরোপীয় ঐক্যের ধারণাও ভবিষ্যতে আরও বড় চাপের মুখে পড়তে পারে।

এসব পরিবর্তন একটি বৃহত্তর প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যে উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে, সেটি এখন নতুন এক ক্ষমতার বাস্তবতার মুখোমুখি। প্রযুক্তি, সামরিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত সম্পদের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনও সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র। একই সঙ্গে চীনও দ্রুত নিজের প্রভাব বিস্তার করছে। এই প্রতিযোগিতার মধ্যে মাঝারি শক্তিগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আর আদর্শ নয়; বরং কার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক বজায় রাখলে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সবচেয়ে ভালোভাবে রক্ষা করা যাবে।

এই কারণেই এশিয়ার অনেক দেশ ভবিষ্যৎকে অতীতের ধারাবাহিকতা হিসেবে নয়, বরং নতুন বাস্তবতার সূচনা হিসেবে দেখছে। তারা ধরে নিচ্ছে, ট্রাম্প হয়তো একদিন হোয়াইট হাউস ছাড়বেন, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে যে পরিবর্তনের ধারা শুরু হয়েছে, তা সম্ভবত কোনো একক ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ওয়াশিংটন ভবিষ্যতেও মিত্রদের কাছ থেকে আরও বেশি দায়িত্ব, আরও বেশি বিনিয়োগ এবং আরও বেশি কৌশলগত আনুগত্য প্রত্যাশা করতে পারে।

ইউরোপের সামনে তাই মূল চ্যালেঞ্জ কেবল ট্রাম্প নন; বরং সেই পরিবর্তিত বিশ্ব, যেখানে পুরোনো বিশেষ মর্যাদা আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত নয়। আর এশিয়ার শিক্ষা হলো—আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য বদলালে দ্রুত মানিয়ে নেওয়াই টিকে থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

একবিংশ শতাব্দীর নতুন ভূরাজনীতিতে হয়তো এটিই সবচেয়ে কঠিন সত্য: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আর কেবল অভিন্ন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; ক্রমশ তা নির্ধারিত হচ্ছে শক্তি, সক্ষমতা এবং স্বার্থের নতুন সমীকরণে। যারা এই পরিবর্তন যত দ্রুত বুঝতে পারবে, ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থায় তাদের অবস্থানও তত বেশি শক্তিশালী হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্বমানের জোড্রেল ব্যাংক বন্ধের শঙ্কা, ব্রিটেনে পদার্থবিজ্ঞানীদের দেশ ছাড়ার আশঙ্কা

ট্রাম্প-পরবর্তী বিশ্বে এশিয়া কেন দ্রুত মানিয়ে নিচ্ছে, আর ইউরোপ কেন এখনও অতীত আঁকড়ে?

০৪:৫৬:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

ডোনাল্ড ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতি নিয়ে সবচেয়ে বড় অস্বস্তিতে পড়েছে ইউরোপ। কয়েক দশক ধরে যে আটলান্টিক জোটকে তারা আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্থায়ী ভিত্তি হিসেবে দেখেছে, সেই সম্পর্কের ধরনই ট্রাম্প আমলে বদলে যেতে শুরু করেছে। ওয়াশিংটনের কাছ থেকে নিঃশর্ত নিরাপত্তা, উদার বাণিজ্যনীতি কিংবা মূল্যবোধভিত্তিক নেতৃত্বের যে প্রত্যাশা ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে লালন করেছে, ট্রাম্প সেই ধারণার প্রায় প্রতিটি স্তম্ভকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

কিন্তু একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় মিত্রদের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান কিংবা ফিলিপাইন—কেউই ট্রাম্পের নীতি নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিল না। তবুও তারা নতুন বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে সেটির মধ্যেই নিজেদের কৌশল খুঁজতে শুরু করে। কারণ তারা বুঝেছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আদর্শের চেয়ে শক্তির গুরুত্ব আবারও বেড়ে যাচ্ছে।

এই পার্থক্যই আজকের ভূরাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

ইউরোপ ও এশিয়ার নিরাপত্তা বাস্তবতা এক নয়। তাই একই ওয়াশিংটনকে তারা সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখে।

ইউরোপের সামনে রাশিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হলেও মহাদেশটির চারপাশে ন্যাটোর শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত ইউরোপীয় নিরাপত্তার প্রধান গ্যারান্টর হিসেবে কাজ করেছে। ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো দীর্ঘ সময় নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়ানোর পরিবর্তে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে বিনিয়োগ করেছে। স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণে বিপুল ব্যয় করার সুযোগ তারা পেয়েছে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার কারণে।

এই দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা ইউরোপে একটি মানসিক কাঠামো তৈরি করেছে। তারা বিশ্বাস করেছে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, আইন, নিয়ম এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতাই বিশ্বকে স্থিতিশীল রাখে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শক্তিও মূলত এখানেই—সামরিক শক্তিতে নয়, বরং নিয়ম নির্ধারণে, মানদণ্ড তৈরিতে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিধিব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারে।

কিন্তু ট্রাম্পের রাজনীতি এই পুরো দর্শনের বিপরীত। তাঁর যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার খরচ বহন করেছে, যার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী অন্য দেশগুলো। তাই ওয়াশিংটন এখন আর নিঃস্বার্থ অভিভাবকের ভূমিকা পালন করবে না; বরং প্রতিটি সম্পর্ককে দেখবে জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে।

এশিয়ার কাছে এই ভাষা নতুন নয়।

চীনের উত্থান গত দুই দশকে এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশকে আমূল বদলে দিয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, দ্রুত আধুনিকায়নশীল সামরিক বাহিনী এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে বেইজিং এখন এশিয়ার প্রতিটি দেশের কৌশলগত হিসাবের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি কেবল একটি কূটনৈতিক সুবিধা নয়; অনেক দেশের কাছে এটি অস্তিত্বগত নিরাপত্তার প্রশ্ন।

এই কারণেই এশীয় মিত্ররা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ককে আদর্শের চেয়ে প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিচার করে। তারা জানে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কঠিন বা অসম চুক্তি করাও শেষ পর্যন্ত চীনের প্রভাববলয়ে চলে যাওয়ার চেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ।

এখানেই ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য।

ইউরোপ বহু বছর ধরে ধরে নিয়েছিল, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রগুলোর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু এশিয়া কখনও এমন বিশ্বাসে অভ্যস্ত ছিল না। এখানে শক্তির ভারসাম্যই সবসময় রাজনীতির প্রধান নির্ধারক ছিল। তাই হোয়াইট হাউসে নতুন প্রেসিডেন্ট এলেই এশিয়ার রাজধানীগুলো দ্রুত নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের অবস্থান সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করে।

এর পেছনে আরেকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে।

ইউরোপের মতো এশিয়ায় ন্যাটোর সমতুল্য কোনো সমষ্টিগত নিরাপত্তা জোট নেই। যুক্তরাষ্ট্র পৃথক পৃথক দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করে। ফলে প্রতিটি নতুন মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে প্রতিটি মিত্র দেশকে আবারও নিজেদের গুরুত্ব প্রমাণ করতে হয়। নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ব্যাখ্যাও অনেক সময় প্রেসিডেন্টভেদে বদলে যায়।

এই অভিজ্ঞতা এশিয়ার কূটনীতিকে অনেক বেশি বাস্তববাদী করে তুলেছে। এখানে কেউ ধরে নেয় না যে কোনো জোট চিরস্থায়ী বা নিঃশর্ত। বরং প্রতিটি সম্পর্ক নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে টিকিয়ে রাখতে হয়।

ফলে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে এসে যখন বাণিজ্য শুল্ক বাড়ালেন, দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ওপর জোর দিলেন এবং পুরোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করলেন, তখন ইউরোপ বিস্মিত হলেও এশিয়ার অনেক দেশ এটিকে নতুন খেলা হিসেবে গ্রহণ করল।

তাদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না ট্রাম্পের ভাষা; বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি ধরে রাখা।

এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যনীতির ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্র যখন তথাকথিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বহু দেশের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করল, তখন ইউরোপ ও এশিয়ার প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। উভয় পক্ষই অভিযোগ করেছিল যে এসব শুল্ক বিদ্যমান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি ও চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিন্তু আপত্তি জানানোর পর তাদের পথ আলাদা হয়ে যায়।

এশিয়া - উইকিপিডিয়া

ইউরোপ প্রথমে পাল্টা শুল্ক, আইনি প্রতিক্রিয়া এবং সমষ্টিগত প্রতিরোধের ভাষা বেছে নেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশ্বাস করত, একটি ঐক্যবদ্ধ বাজার হিসেবে তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে দর-কষাকষিতে শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে পারবে। কিন্তু দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর শেষ পর্যন্ত ব্রাসেলসকেও এমন এক সমঝোতায় পৌঁছাতে হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাজার আরও উন্মুক্ত করা, বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং মার্কিন জ্বালানি আমদানি বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত ফলাফল খুব ভিন্ন ছিল না, যদিও সেখানে পৌঁছানোর পথ ছিল অনেক বেশি সংঘাতপূর্ণ।

অন্যদিকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা তাইওয়ান শুরু থেকেই পরিস্থিতিকে নতুন বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেয়। তারা বুঝেছিল, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে মূল্যবোধের বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে লাভ নেই; বরং এমন একটি সমঝোতা দরকার, যা ওয়াশিংটনের কাছে তাদের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলবে। ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল বিনিয়োগ, গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে অংশীদারিত্ব এবং জ্বালানি ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এসব সিদ্ধান্তে অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেয়েছে, কিন্তু এশিয়ার দৃষ্টিতে সেটিই ছিল নিরাপত্তা সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার মূল্য।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—কেন এশিয়ার দেশগুলো অসম চুক্তি মেনে নিতে প্রস্তুত?

এর উত্তর শুধু অর্থনীতিতে নয়, নিরাপত্তার মনস্তত্ত্বে নিহিত। চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্থান এশিয়ার ছোট ও মাঝারি শক্তিগুলোর সামনে এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে স্বাধীন কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এই দেশগুলোর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কেবল বাণিজ্যের বিষয় নয়; এটি সম্ভাব্য আঞ্চলিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থা। তাই ওয়াশিংটনের সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে আপস করাও তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য, যদি সেটি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।

তবে এই কৌশল ঝুঁকিমুক্ত নয়। সম্পূর্ণ লেনদেনভিত্তিক সম্পর্কের একটি সীমা রয়েছে। যদি কোনো মার্কিন প্রশাসন বৃহত্তর কৌশলগত স্বার্থে বেইজিংয়ের সঙ্গে সমঝোতাকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে এশিয়ার মিত্ররা নিজেদের আরও অনিশ্চিত অবস্থায় দেখতে পারে। তাইওয়ানের মতো দেশগুলোর জন্য এই উদ্বেগ বিশেষভাবে বাস্তব। নিরাপত্তার নিশ্চয়তার বিনিময়ে তারা অর্থনৈতিক ছাড় দিতে রাজি হলেও শেষ পর্যন্ত সেই নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত থাকবে, তার কোনো লিখিত গ্যারান্টি নেই।

অন্যদিকে ইউরোপের সমস্যাও কম নয়। যদি তারা সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়, তাহলে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় অনেক বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। কিন্তু তার অর্থ হবে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যয় পুনর্বিবেচনা করা। সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা পেনশন ব্যবস্থায় কাটছাঁট রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন। ফলে ইউরোপ এমন এক দ্বিধার মধ্যে পড়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে যাওয়াও কঠিন, আবার আগের সম্পর্কও আর আগের মতো নেই।

আরও একটি বাস্তবতা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। ইউরোপ নিজেও আর একক অবস্থানে নেই। রাশিয়ার সীমান্তঘেঁষা পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় অনেক বেশি। এস্তোনিয়া, লাটভিয়া কিংবা লিথুয়ানিয়ার মতো দেশগুলো প্রতিরক্ষায় জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে অপরিহার্য মনে করছে। ফলে ইউরোপীয় ঐক্যের ধারণাও ভবিষ্যতে আরও বড় চাপের মুখে পড়তে পারে।

এসব পরিবর্তন একটি বৃহত্তর প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যে উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে, সেটি এখন নতুন এক ক্ষমতার বাস্তবতার মুখোমুখি। প্রযুক্তি, সামরিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত সম্পদের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনও সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র। একই সঙ্গে চীনও দ্রুত নিজের প্রভাব বিস্তার করছে। এই প্রতিযোগিতার মধ্যে মাঝারি শক্তিগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আর আদর্শ নয়; বরং কার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক বজায় রাখলে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সবচেয়ে ভালোভাবে রক্ষা করা যাবে।

এই কারণেই এশিয়ার অনেক দেশ ভবিষ্যৎকে অতীতের ধারাবাহিকতা হিসেবে নয়, বরং নতুন বাস্তবতার সূচনা হিসেবে দেখছে। তারা ধরে নিচ্ছে, ট্রাম্প হয়তো একদিন হোয়াইট হাউস ছাড়বেন, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে যে পরিবর্তনের ধারা শুরু হয়েছে, তা সম্ভবত কোনো একক ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ওয়াশিংটন ভবিষ্যতেও মিত্রদের কাছ থেকে আরও বেশি দায়িত্ব, আরও বেশি বিনিয়োগ এবং আরও বেশি কৌশলগত আনুগত্য প্রত্যাশা করতে পারে।

ইউরোপের সামনে তাই মূল চ্যালেঞ্জ কেবল ট্রাম্প নন; বরং সেই পরিবর্তিত বিশ্ব, যেখানে পুরোনো বিশেষ মর্যাদা আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত নয়। আর এশিয়ার শিক্ষা হলো—আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য বদলালে দ্রুত মানিয়ে নেওয়াই টিকে থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

একবিংশ শতাব্দীর নতুন ভূরাজনীতিতে হয়তো এটিই সবচেয়ে কঠিন সত্য: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আর কেবল অভিন্ন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; ক্রমশ তা নির্ধারিত হচ্ছে শক্তি, সক্ষমতা এবং স্বার্থের নতুন সমীকরণে। যারা এই পরিবর্তন যত দ্রুত বুঝতে পারবে, ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থায় তাদের অবস্থানও তত বেশি শক্তিশালী হবে।