পাকিস্তানে ২০২৬ সালের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটির উত্তর ও পার্বত্য অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও মেঘভাঙা বৃষ্টির ঘটনায় মানবিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ২৮ জুন থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত টানা বৃষ্টিপাতের কারণে বিভিন্ন প্রদেশে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে বহু এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জরুরি সেবা ব্যাহত হয়েছে।
দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিএমএ), প্রাদেশিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (পিডিএমএ) এবং পাকিস্তান আবহাওয়া বিভাগ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং নিয়মিত আবহাওয়া সতর্কতা জারি করছে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল
গিলগিট-বালতিস্তান, খাইবার পাখতুনখোয়া, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান এবং আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরের (এজেকে) বিভিন্ন জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জেলার মধ্যে রয়েছে দিয়ামের, ঘিজার, ঘানচে, নাগার, আস্তোর, আপার ও লোয়ার চিত্রাল, শাংলা, খাইবার, লোয়ার দির, মারদান, রাজানপুর, ডেরা গাজি খান, খুজদার এবং নিলাম।
এসব এলাকায় আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও মেঘভাঙা বৃষ্টিতে বসতবাড়ি, বিদ্যালয়, সড়ক, সেতু, সেচব্যবস্থা, পানি সরবরাহ অবকাঠামো, বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক, কৃষিজমি ও ফলের বাগানের ক্ষতি হয়েছে। এতে হতাহত, আহত, বাস্তুচ্যুতি এবং জরুরি সেবায় বিঘ্নের ঘটনাও ঘটেছে।
নিলাম ও আস্তোরে বড় ক্ষয়ক্ষতি
১৯ জুলাই আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরের নিলাম জেলার লারি মেঙ্গাল, ডোগা টপ এবং কাথা পীরান এলাকায় মেঘভাঙা বৃষ্টির পর আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি, দোকানপাট ও যানবাহনের ক্ষতি হয়। স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী দল দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন শুরু করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়।
একই দিনে গিলগিট-বালতিস্তানের আস্তোর জেলার রুপাল ভ্যালিতেও ভারী বৃষ্টির কারণে আকস্মিক বন্যা হয়। সেখানে কোনো প্রাণহানির খবর না মিললেও কৃষিজমির আংশিক ক্ষতি হয়েছে।
এরপর ২১ জুলাই আস্তোর জেলার লাউস গ্রামে আরেকটি আকস্মিক বন্যায় বেশ কয়েকটি বসতবাড়ি প্লাবিত হয়। এতে পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ও সম্পদের ক্ষতি হয়। প্রাথমিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে একাধিক বাড়ি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং গিলগিট-বালতিস্তান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণের প্রস্তুতি নিয়েছে। বিস্তারিত ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন এখনও চলছে।
আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস
পাকিস্তান আবহাওয়া বিভাগ এবং এনডিএমএর সর্বশেষ সতর্কতা অনুযায়ী, ২৪ জুলাই পর্যন্ত সক্রিয় মৌসুমি পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। আরব সাগর থেকে আসা আর্দ্র মৌসুমি বায়ু এবং পশ্চিমা আবহাওয়া ব্যবস্থার প্রভাবে খাইবার পাখতুনখোয়া, গিলগিট-বালতিস্তান, আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর, উত্তর-পূর্ব পাঞ্জাব ও পার্বত্য এলাকায় ব্যাপক বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোথাও অতিভারী বৃষ্টিও হতে পারে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পার্বত্য এলাকায় আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস, মেঘভাঙা বৃষ্টি এবং হিমবাহের হ্রদ ভেঙে সৃষ্ট বন্যার ঝুঁকি এখনো রয়েছে। তবে ইন্দুস, ঝেলাম, চেনাব, রাভি ও শতদ্রু নদীর পানি বর্তমানে স্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে এবং বড় ধরনের নদীবন্যার আশঙ্কা নেই। তবুও সম্ভাব্য স্থানীয় দুর্যোগের কারণে নদীর প্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
জরুরি প্রস্তুতি অব্যাহত
পাকিস্তান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, তারা জাতীয় ও প্রাদেশিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সংস্থাটির জরুরি কার্যক্রম কেন্দ্র সার্বক্ষণিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও মাঠপর্যায়ের তথ্য পর্যবেক্ষণ করছে।
প্রয়োজনে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দিতে জরুরি ত্রাণসামগ্রী প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং প্রশিক্ষিত দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া দল, স্বেচ্ছাসেবক ও প্রাথমিক চিকিৎসা কর্মীরা প্রস্তুত রয়েছে। ২২ জুলাই একটি সমন্বয় বৈঠকেরও আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে চলমান পরিস্থিতি, প্রস্তুতি, সম্ভাব্য ঘাটতি এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হবে।
পাকিস্তানে মৌসুমি বৃষ্টিতে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। উত্তর ও পার্বত্য এলাকায় আরও ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















