মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়া যেন এখন আর অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকও সেই পরিচিত পরিণতির শিকার হয়েছে। যুদ্ধ থামানো, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং পরবর্তী আলোচনার জন্য ৬০ দিনের একটি সুযোগ তৈরি করার যে লক্ষ্য নিয়ে চুক্তিটি হয়েছিল, তা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভেঙে পড়েছে। আবারও ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যে অচলাবস্থা ফিরে এসেছে। এই ব্যর্থতা আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি গভীর সংকটের প্রতিফলন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ব রাজনীতিতে এমন এক ধরনের কূটনীতি শক্তিশালী হয়েছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পরিবর্তে তাৎক্ষণিক লাভকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, দ্রুত সমঝোতা এবং সীমিত চুক্তির মাধ্যমে সংকটকে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এই পদ্ধতি যখন মূল রাজনৈতিক সমস্যার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেটি শান্তির ভিত্তি তৈরি করতে পারে না। বরং সংঘাতকে সাময়িক বিরতিতে রেখে ভবিষ্যতের আরও বড় সংঘর্ষের পথ তৈরি করে।
অবশ্যই যুদ্ধবিরতি, বন্দি বিনিময় কিংবা মানবিক করিডর তৈরির মতো সীমিত সমঝোতার নিজস্ব গুরুত্ব আছে। অনেক সময় এগুলো প্রাণহানি কমায়, আলোচনার সুযোগ তৈরি করে এবং উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রাখে। কিন্তু এগুলো কখনোই স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প হতে পারে না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগ, সীমান্ত বিরোধ, ক্ষমতার ভারসাম্য, পারস্পরিক অবিশ্বাস কিংবা ঐতিহাসিক বিরোধ অমীমাংসিত রেখে কেবল একটি কাগুজে সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
মধ্যপ্রাচ্যে এই বাস্তবতা আরও জটিল। কারণ এখানকার প্রতিটি সংঘাত অন্য একটি সংঘাতের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে তেহরান নিজের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি মনে করে। ফলে এক পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ অন্য পক্ষের কাছে আক্রমণের প্রস্তুতি বলে মনে হয়। এই নিরাপত্তা-দ্বন্দ্বের রাজনৈতিক সমাধান না হলে যুদ্ধবিরতি বারবার ভেঙে পড়াই স্বাভাবিক।
এই ধরনের লেনদেনভিত্তিক কূটনীতি নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এটি নতুন গতি পেয়েছে। রাষ্ট্রগুলো এখন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বদলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সম্পর্ক এবং সীমিত চুক্তির ওপর বেশি নির্ভর করছে। এতে নেতারা দ্রুত সাফল্যের দাবি করতে পারেন, জটিল আলোচনার রাজনৈতিক মূল্যও কম দিতে হয়। কিন্তু সংকট ব্যবস্থাপনা আর সংকটের সমাধান এক বিষয় নয়। কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির জায়গায় যখন ধারাবাহিক ছোট ছোট চুক্তি স্থান নেয়, তখন দীর্ঘমেয়াদে তার মূল্য অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়।
ইতিহাসও একই শিক্ষা দেয়। উনিশ শতকের ইউরোপে শক্তিগুলোর মধ্যে যে ভারসাম্য ও নিয়মভিত্তিক সমঝোতা গড়ে উঠেছিল, তা কয়েক দশক স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছিল। কিন্তু পরে জাতীয়তাবাদ, সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা এবং পারস্পরিক সন্দেহ সেই কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। রাষ্ট্রগুলো ধীরে ধীরে যৌথ নিরাপত্তার বদলে সংকীর্ণ জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করে। পরামর্শ ও সমন্বয়ের পরিবর্তে আলটিমেটাম, সামরিক প্রস্তুতি এবং জোট-রাজনীতি সামনে চলে আসে। ১৯১৪ সালে সারায়েভোর একটি হত্যাকাণ্ড কীভাবে সমগ্র ইউরোপকে বিশ্বযুদ্ধে ঠেলে দিয়েছিল, তা দেখায়—যখন রাজনৈতিক কাঠামো দুর্বল হয়ে যায়, তখন একটি আঞ্চলিক সংকটও বৈশ্বিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
আজকের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায়ও একই ধরনের পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা কমেছে, বৃহৎ কূটনৈতিক উদ্যোগগুলোর প্রতি আস্থা হ্রাস পেয়েছে এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো আরও স্বাধীনভাবে নিজেদের স্বার্থ অনুসরণ করছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও নেতাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে তাৎক্ষণিক সাফল্য দেখাতে উৎসাহিত করছে। ফলে ধৈর্য, আলোচনার ধারাবাহিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার পরিবর্তে দ্রুত চুক্তিই যেন কূটনীতির প্রধান ভাষা হয়ে উঠছে।
এই প্রবণতার একটি বড় উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যনীতি। দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদারিত্বকে অনেক সময় লেনদেনের দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, বিপুল বাণিজ্যিক চুক্তি এবং অস্ত্র বিক্রির মাধ্যমে আঞ্চলিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর অনেকেই মনে করেছিল, ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। কিন্তু বাস্তবতা দেখিয়েছে, ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রবেশাধিকার আর নীতিনির্ধারণে প্রকৃত প্রভাব এক বিষয় নয়। সংকটের সময় সেই ঘনিষ্ঠতা তাদের প্রত্যাশিত নিরাপত্তা দিতে পারেনি।
আব্রাহাম চুক্তিও একই বাস্তবতার আরেকটি উদাহরণ। কয়েকটি আরব রাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে তাৎক্ষণিক কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করলেও ফিলিস্তিন প্রশ্ন অমীমাংসিতই থেকে যায়। ফলে মূল রাজনৈতিক সংকট দূর হয়নি; বরং জমে থাকা ক্ষোভ আরও বিস্ফোরক রূপ নিয়েছে। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে, একটি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক সমস্যাকে উপেক্ষা করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানকে ঘিরে ঝুঁকিও একইভাবে বাড়ছে। যদি সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়, তবে শুধু হরমুজ প্রণালিই নয়, লোহিত সাগরের প্রবেশপথও অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে। যার সূচনা ইতোমধ্যে হয়েছে। এরফলে জ্বালানি সরবরাহ, বৈশ্বিক বাণিজ্য, বীমা ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর অস্ত্র প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে, যা নিরাপত্তা বাড়ানোর বদলে পারস্পরিক অবিশ্বাসকে আরও গভীর করবে। সামরিক প্রস্তুতি তখন প্রতিরোধের পরিবর্তে সংঘর্ষের সম্ভাবনাই বাড়িয়ে তুলবে।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন হলো, বিকল্প কী? উত্তরটি সহজ নয়, তবে দিকনির্দেশনা পরিষ্কার। একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য এমন একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক কাঠামো দরকার, যেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রশ্নকে একই আলোচনার আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশ, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি নিয়মভিত্তিক নিরাপত্তা সংলাপের প্রয়োজন, যেখানে পারস্পরিক স্বচ্ছতা, সামরিক যোগাযোগ এবং সংকট ব্যবস্থাপনার স্থায়ী ব্যবস্থা থাকবে।
এ ধরনের উদ্যোগ এখন হয়তো উচ্চাভিলাষী বলে মনে হতে পারে। যুদ্ধ চলছে, অবিশ্বাস গভীর এবং প্রতিটি পক্ষ নিজেদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবু ইতিহাসের শিক্ষা হলো, সংকীর্ণ সমঝোতা সাধারণত পক্ষগুলোকে তাদের প্রকৃত উদ্বেগ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখে, আর বিস্তৃত রাজনৈতিক কাঠামো সেই উদ্বেগগুলোকে একসঙ্গে মোকাবিলার সুযোগ সৃষ্টি করে। তাই দীর্ঘস্থায়ী শান্তির সম্ভাবনাও সেখানেই বেশি।
মধ্যপ্রাচ্যের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আজ যুদ্ধ থামানো নয়; বরং এমন একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে নিরাপত্তা আর কেবল শক্তির ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করবে না। কারণ যুদ্ধবিরতি যদি কেবল পরবর্তী যুদ্ধের প্রস্তুতির বিরতি হয়ে ওঠে, তাহলে প্রতিটি নতুন সমঝোতা শেষ পর্যন্ত আরও বড় সংঘাতের সূচনা ছাড়া আর কিছুই হবে না।
সানাম ভাকিল 



















