ভারতের সাম্প্রতিক শিক্ষা-সংকট শুধু একটি প্রশ্নফাঁস বা একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা নয়। এটি এমন এক রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা খাতকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, জবাবদিহি দুর্বল হয়েছে এবং রাজনৈতিক দায়িত্ববোধ ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। তাই এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যার বহিঃপ্রকাশ।
কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন এবং সরকারের দীর্ঘ নীরবতার পর যে পদত্যাগ ঘটেছে, সেটি সংসদের ভেতরে রাজনৈতিক জবাবদিহির মাধ্যমে আসেনি; এসেছে রাজপথের চাপের মুখে। গণতন্ত্রে জনগণের প্রতিবাদ অবশ্যই বৈধ, কিন্তু যখন সরকারের জবাবদিহির প্রধান ক্ষেত্র সংসদ না হয়ে রাজপথে পরিণত হয়, তখন সেটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের শক্তি নয়, বরং দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
এই সংকটের সূচনা হয়েছিল জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে ধারাবাহিক অভিযোগ থেকে। লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত একটি ব্যবস্থায় বারবার একই ধরনের ত্রুটি দেখা দেওয়ার অর্থ হলো সমস্যাটি আর প্রশাসনিক ভুলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। বছরের পর বছর ধরে পরীক্ষা বাতিল, পুনরায় পরীক্ষা, আইনি জটিলতা এবং অনিশ্চয়তা তরুণদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাকে ক্ষয় করেছে।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়, যখন বেকার তরুণদের নিয়ে অবমাননাকর একটি মন্তব্যে তাদের “ককরোচ” ও “পরজীবী”র সঙ্গে তুলনা করা হয়। একটি অবিবেচক মন্তব্য দ্রুত প্রতীকে পরিণত হয়। শিক্ষার্থীরা সেই অপমানজনক শব্দকেই প্রতিবাদের ভাষা বানিয়ে ফেলে। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং তরুণদের সৃজনশীল সংগঠন আন্দোলনকে নতুন গতি দেয়। শেষ পর্যন্ত সরকার বুঝতে পারে, প্রশাসনিক ব্যাখ্যা দিয়ে নয়, রাজনৈতিকভাবে জবাব দিতে হবে।
কিন্তু পুরো ঘটনাকে যদি কেবল একজন শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে মূল সমস্যাটি আড়ালে থেকে যাবে। ভারতের স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা এমন একটি খাতে পরিণত হয়েছে, যাকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় খুব কমই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাজেট, অবকাঠামো, শিক্ষার মান কিংবা প্রশাসনিক সক্ষমতা—সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি জমেছে বছরের পর বছর।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, যারা সরকারি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন, তাঁদের অনেকেই নিজেদের সন্তানদের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল রাখেন না। ফলে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি গভীর দূরত্ব তৈরি হয়েছে। যে মানুষ নিজে কোনো ব্যবস্থার ফল ভোগ করেন না, তার পক্ষে সেই ব্যবস্থার ব্যর্থতার দায় গভীরভাবে অনুভব করাও কঠিন।
বিভিন্ন শিক্ষাবিষয়ক জরিপও বহুদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে সরকারি বিদ্যালয়ের বড় একটি অংশে মৌলিক পাঠদক্ষতাই প্রত্যাশিত পর্যায়ে নেই। অর্থাৎ সংকট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় শুরু হয়নি; এর ভিত্তি আরও নিচে, প্রাথমিক শিক্ষার স্তরেই দুর্বল হয়ে গেছে। সেই দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে একটি প্রতিযোগিতামূলক, দক্ষ ও উদ্ভাবনী অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি কোথায় হারিয়ে গেল?
একসময় প্রশাসনিক ব্যর্থতার নৈতিক দায় গ্রহণ করা নেতৃত্বের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হতো। এখন তার জায়গা নিয়েছে দীর্ঘ তদন্ত, আইনি প্রক্রিয়া এবং দায় এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি। বলা হয়, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কিন্তু সেই গতি যদি এত ধীর হয় যে জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ে, তাহলে আইনি প্রক্রিয়া রাজনৈতিক দায়িত্বের বিকল্প হতে পারে না।

সমস্যার আরেকটি দিক সরকারের ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্রমশ কেন্দ্রীয় হয়ে যায়, কিন্তু দায়বদ্ধতা সমানভাবে বণ্টিত হয় না, তখন প্রশাসন ভারসাম্য হারায়। মন্ত্রীরা তখন নীতিগতভাবে স্বাধীন নন, আবার ব্যর্থতার দায়ও স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয় না। এই ধরনের কাঠামো শেষ পর্যন্ত জবাবদিহির সংকটই সৃষ্টি করে।
তাই একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেটি কীভাবে ঘটল। যদি সংসদ সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় এবং প্রতিটি বড় সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত জনবিক্ষোভের মাধ্যমে আদায় করতে হয়, তাহলে সংসদীয় গণতন্ত্রের মৌলিক ভারসাম্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এই ঘটনার পেছনে আরও একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রবণতা কাজ করছে। নির্বাচন জেতা, ভোটের সমীকরণ রক্ষা এবং স্বল্পমেয়াদি জনপ্রিয়তা অর্জনের রাজনীতি অনেক সময় রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক দায়িত্বকে আড়াল করে দেয়। শিক্ষা এমন একটি খাত, যার ফল তাৎক্ষণিকভাবে ভোটে প্রতিফলিত হয় না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থা এমন নাগরিক তৈরি করে, যারা দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী এবং রাষ্ট্রের কাছে আরও বেশি জবাবদিহি দাবি করে। তাই শিক্ষাকে অবহেলা করার মূল্য শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজকেই দিতে হয়।
এর অর্থনৈতিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বাড়লে শুধু কর্মসংস্থানের সংকট তৈরি হয় না; উদ্ভাবন কমে যায়, উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সামাজিক অসন্তোষ বাড়তে থাকে। জনসংখ্যাগত সুবিধা তখন দ্রুত বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
এই সংকট শেষ পর্যন্ত একটি বড় সত্য সামনে নিয়ে আসে—রাষ্ট্র পরিচালনায় নৈতিকতার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখা যেন দায়িত্ব স্বীকারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অথচ একটি সুস্থ গণতন্ত্রে ভুল হলে তা দ্রুত স্বীকার করা, দায় নেওয়া এবং সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়াই নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা।
শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট কোনো একক মন্ত্রী পরিবর্তনের মাধ্যমে শেষ হবে না। প্রয়োজন শিক্ষা খাতকে রাষ্ট্রগঠনের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা, মন্ত্রিসভার ভেতরে প্রকৃত যৌথ দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করা, সংসদকে আবার কার্যকর জবাবদিহির মঞ্চে পরিণত করা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার ক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃশ্যমান দায়িত্ব নির্ধারণ করা।
অন্যথায় প্রতিটি নতুন সংকট আবারও প্রমাণ করবে, “ককরোচ” কখনোই প্রকৃত সমস্যা ছিল না। আসল সংকট সেই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভেতরে, যা বছরের পর বছর নিজের দুর্বলতাকে আড়াল করে এসেছে।
গৌতম আর. দেশিরাজু ও দীক্ষিত ভট্টাচার্য 



















