দক্ষিণ কোরিয়ার সমকালীন শিল্পে ভিন্নধর্মী চিন্তা ও নতুন শিল্পভাষার এক অনন্য প্রদর্শনী শুরু হয়েছে রাজধানী সিউলের জাতীয় আধুনিক ও সমকালীন শিল্প জাদুঘরে। চলতি বছরের কোরিয়া শিল্পী পুরস্কারের চূড়ান্ত পর্বে থাকা চার শিল্পীর কাজ নিয়ে সাজানো এই প্রদর্শনীতে উঠে এসেছে ইতিহাস, প্রযুক্তি, স্মৃতি, প্রতিবাদ ও চিত্রকলার নতুন সম্ভাবনা।
কোরিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প পুরস্কারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত এই আয়োজনের চূড়ান্ত চার শিল্পী এবার কোনো নির্দিষ্ট বিষয় বা মাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। বরং প্রত্যেকে সমাজ ও বিশ্বের ভেতরে থাকা ছোট ছোট অসঙ্গতি, অসম্পূর্ণতা ও ফাটলকে নিজস্ব শিল্পভাষায় সামনে এনেছেন।
অক্টোবরে চূড়ান্ত বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে। এর আগে চার শিল্পীর কাজ দর্শকদের সামনে তুলে ধরছে এই প্রদর্শনী।
অসম্পূর্ণতার মধ্যেই শিল্পের খোঁজ
এবারের চার চূড়ান্ত শিল্পীর কাজের মধ্যে সরাসরি কোনো মিল নেই। কেউ হারিয়ে যাওয়া দৃশ্যকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন, কেউ ছবিকে দেয়াল থেকে বের করে নতুন কাঠামো দিয়েছেন, কেউ প্রতিবাদের ছবি তোলা ছেড়ে দিয়ে সেই অভিজ্ঞতাকেই শিল্পের বিষয় করেছেন।
আয়োজকদের মতে, চার শিল্পীর মধ্যে একটি মানসিক মিল রয়েছে। তাঁরা পৃথিবীর বর্তমান কাঠামোকে সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত বলে মেনে নেননি। বরং সেই কাঠামোর ছোট ছোট ফাটল, অসংগতি ও অপূর্ণতাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিজেদের মতো করে দৃশ্যমান করেছেন।
তুষার নেই, অথচ তুষারের উপস্থিতি
চূড়ান্ত শিল্পীদের একজন লি হে মিন সনের কাজের কেন্দ্রে রয়েছে এমন সব জিনিস, যা প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পরও কোনো না কোনো চিহ্ন রেখে যায়।
তাঁর ‘লিঙ্গারিং স্নো’ ধরনের কাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাদা তুষার। আলোকচিত্রের কাগজে সাদা রং আলাদা করে ছাপা যায় না। ফলে ছবিতে তুষার থাকলেও ছাপা ছবিতে সেটি অনুপস্থিত থাকে। শিল্পী সেই শূন্য জায়গাটিই রেখে দিয়েছেন এবং তার চারপাশে ধুলো, দাগ ও গলে যাওয়ার চিহ্ন এঁকেছেন।
আরেকটি কাজে দীর্ঘদিন ধরে কোনো স্থাপনার ওপর পড়ে থাকা ত্রিপলের উপস্থিতিও তিনি একইভাবে দেখিয়েছেন। সাময়িক সমাধান হিসেবে টাঙানো জিনিস কীভাবে বছরের পর বছর স্থায়ী হয়ে যায়, সেই বাস্তবতাও তাঁর ছবিতে জায়গা পেয়েছে।
হারিয়ে যাওয়া চলচ্চিত্র ফিরিয়ে আনার চেষ্টা
শিল্পী লি জং উয়ের কাজ আরও সরাসরি ইতিহাস ও প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত। তিনি ১৯৪৬ সালের একটি হারিয়ে যাওয়া কোরীয় চলচ্চিত্রের ভগ্নাংশকে কেন্দ্র করে কাজ করেছেন।
স্বাধীনতার পর নির্মিত প্রথম দিকের কোরীয় স্বাধীনতা বিষয়ক চলচ্চিত্রটির বড় অংশ সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায়। বর্তমানে এর প্রায় ৫০ মিনিটের মতো অংশ টিকে আছে। এমনকি প্রধান চরিত্রের মুখও বেশির ভাগ জায়গায় অনুপস্থিত।
লি জং উ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে হারিয়ে যাওয়া অংশ পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এখানেই তাঁর কাজ নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। যে প্রযুক্তিকে প্রায় সবকিছু তৈরি করতে সক্ষম বলে মনে করা হয়, সেটিই ইতিহাসকে হুবহু ফিরিয়ে আনতে পারছে না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পুরোনো চলচ্চিত্রের ভাষা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে বর্তমান সময়ের নিজস্ব মানদণ্ডে বিচার করছে। ফলে পুনর্গঠনের চেষ্টা করতে গিয়েও তৈরি হচ্ছে নতুন বিকৃতি ও সীমাবদ্ধতা।
এই কাজের মাধ্যমে শিল্পী দেখাতে চেয়েছেন, প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সব সময় সম্ভব নয়।
দেয়াল পেরিয়ে বিশাল ক্যানভাস
তৃতীয় চূড়ান্ত শিল্পী জিওন হিয়ন সন চিত্রকলাকে প্রচলিত দেয়ালের সীমা থেকে বের করে এনেছেন। তাঁর একটি বিশাল কাজের ক্যানভাস মিলিয়ে প্রায় ৩২ মিটার দীর্ঘ। পুরো কাঠামোটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা দূর থেকে দেখলে একটি বিশাল মুখের মতো মনে হয়।
প্রায় ছয় মিটার উঁচু ও ২০ মিটার প্রশস্ত এই কাজ দর্শকের দিকে কিছুটা কাত করা। দূর থেকে ছবিটিকে ছোট ছোট বিন্দুর তৈরি এক ধরনের জালের মতো মনে হলেও কাছে গেলে বোঝা যায়, প্রতিটি বিন্দু জলরঙ দিয়ে হাতে তৈরি।
চিত্রকলা শুধু দেয়ালে ঝোলানো কোনো স্থির বস্তু নয়—এই ধারণাকেই নতুনভাবে সামনে এনেছেন শিল্পী।
প্রতিবাদের ছবি থেকে সরে যাওয়া
চতুর্থ শিল্পী হং জিন হোয়ান দীর্ঘদিন পেশাদার আলোকচিত্রী হিসেবে প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক আন্দোলনের ছবি তুলেছেন। কিন্তু একসময় তিনি ছবি তোলা থেকে সরে দাঁড়ান।
প্রতিবাদের ঘটনাগুলোর মূল বক্তব্য ধীরে ধীরে আড়ালে পড়ে গিয়ে কেবল উত্তেজনাপূর্ণ দৃশ্য মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে—এমন উপলব্ধি থেকেই তাঁর এই পরিবর্তন।
তাঁর শিল্পকর্মে তাই প্রতিবাদের মুহূর্তকে সরাসরি দেখানোর বদলে সেই মুহূর্তের অর্থ, স্মৃতি এবং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
পুরস্কারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অক্টোবরে
কোরিয়া শিল্পী পুরস্কারের চূড়ান্ত চার শিল্পীর প্রত্যেকে ৫০ লাখ কোরীয় মুদ্রা পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন। চূড়ান্ত বিজয়ী আরও ১০ লাখ কোরীয় মুদ্রা পাবেন। পাশাপাশি তাঁকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করা হবে।
চূড়ান্ত বিজয়ী নির্বাচনের আগে বিচারকদের সঙ্গে দর্শকদের জন্য একটি প্রকাশ্য আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর দ্বিতীয় দফার গোপন মূল্যায়নের মাধ্যমে বিজয়ীর নাম চূড়ান্ত করা হবে।
২০১২ সালে এই পুরস্কারের যাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকে এটি কোরিয়ার সমকালীন শিল্পীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মঞ্চ হয়ে উঠেছে।
বিশ্বশিল্পে কোরিয়ার অবস্থান আরও শক্ত করার প্রত্যাশা
কোরিয়ার শিল্প এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ক্রমশ বেশি মনোযোগ পাচ্ছে। এই আগ্রহ যেন সাময়িক প্রবণতায় আটকে না থাকে এবং কোরীয় শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি শক্ত ভিত তৈরি হয়, সে জন্য শিল্পীদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আয়োজকেরা।
এবারের প্রদর্শনী সেই সম্ভাবনাকেই সামনে এনেছে। চার শিল্পীর চার রকমের ভাবনা দেখিয়ে দিয়েছে, সমকালীন কোরীয় শিল্প শুধু একটি নির্দিষ্ট ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসের ক্ষত থেকে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা, চিত্রকলার নতুন কাঠামো থেকে প্রতিবাদের অর্থ—সবকিছু নিয়েই তৈরি হচ্ছে নতুন শিল্পভাষা।
অক্টোবরে চূড়ান্ত বিজয়ীর নাম ঘোষণার আগেই তাই এবারের আয়োজন কোরিয়ার শিল্পজগতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কোরীয় শিল্পের নতুন প্রজন্ম যে পরিচিত গণ্ডির বাইরে গিয়ে প্রশ্ন তুলতে এবং নতুনভাবে ভাবতে প্রস্তুত, চার শিল্পীর এই প্রদর্শনী যেন তারই শক্তিশালী প্রমাণ।
কোরিয়ার চার শিল্পীর নতুন ভাবনা, ইতিহাস ও প্রযুক্তির সংঘাত এবং সমকালীন শিল্পের পরিবর্তন নিয়ে সিউলের এই প্রদর্শনী দর্শকদের সামনে খুলে দিয়েছে নতুন এক জানালা।
কোরিয়ার চার শিল্পীর প্রদর্শনীতে ইতিহাস, প্রযুক্তি ও চিত্রকলার নতুন ভাবনা উঠে এসেছে; অক্টোবরে ঘোষণা হবে চূড়ান্ত বিজয়ীর নাম।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















