যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ, অর্থনৈতিক সংকট, শোক আর প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষার মধ্যেও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে ইরান। দেশটির সাম্প্রতিক বাস্তবতা যেন একই সঙ্গে দৃঢ়তা, ক্ষোভ, ক্লান্তি, ভয় ও আশার এক জটিল ছবি তুলে ধরছে।
ইরানে প্রবেশের পর থেকেই যুদ্ধের স্মৃতি ও নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উপস্থিতি চোখে পড়েছে। রাজধানী তেহরানের বিমানবন্দর থেকে শুরু করে শহরের বিভিন্ন স্থানে তাঁর ছবি, শোকের ব্যানার ও প্রতিশোধের আহ্বান দেখা গেছে। রাষ্ট্রীয় বার্তায় বারবার উঠে এসেছে—ইরান আঘাত পেয়েছে, কিন্তু ভেঙে পড়েনি।
যুদ্ধের ক্ষত এখনো স্পষ্ট
রাজধানী তেহরানের ঐতিহাসিক গোলেস্তান প্রাসাদেও যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন দেখা গেছে। কাছাকাছি একটি বিচার বিভাগীয় স্থাপনায় হামলার প্রভাবে ঐতিহাসিক স্থাপনাটির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শরিফ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইরানের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র এবং আজাদি ক্রীড়া কমপ্লেক্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং দেশটির শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশেও ছড়িয়ে পড়েছে।
খামেনির শেষকৃত্যের সময় এসব ধ্বংসের স্মৃতি আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল। একই সময়ে শিয়া মুসলমানদের শোকের মাস মহররম চলায় সাম্প্রতিক যুদ্ধে নিহতদের স্মৃতিও ধর্মীয় শোক ও আত্মত্যাগের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে যায়।
প্রতিশোধের দাবিতে সরব জনতা
তেহরানে খামেনির শেষকৃত্যে অংশ নেওয়া অনেক মানুষের মধ্যে আপসের প্রতি আগ্রহের চেয়ে প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষাই বেশি দেখা গেছে। তাদের কেউ কেউ মনে করেন, শক্তিশালী বিদেশি সামরিক শক্তির হামলার পরও ইরান টিকে আছে—এটাই তাদের কাছে এক ধরনের বিজয়।
শেষকৃত্যের সময় ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে জনতার মধ্যে প্রতিশোধের স্লোগানও শোনা যায়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আহভাজ শহর থেকে আসা এক ব্যবসায়ীর বক্তব্যে উঠে আসে প্রতিরোধ ও প্রতিশোধের কথাই।
তবে এই ক্ষোভের পাশাপাশি ইরানের মানুষের মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে ভয় ও ক্লান্তিও রয়েছে। জাতীয় গর্ব এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা যেমন আছে, তেমনি সরকারের নীতি ও অর্থনৈতিক দুরবস্থা নিয়ে হতাশাও রয়েছে।
একই শহরে দুই রকম ইরান
তেহরানের উত্তরাঞ্চলে দেখা যায় একেবারেই ভিন্ন এক চিত্র। সেখানে তরুণদের ভিড় ক্যাফে, খাবারের দোকান ও বিপণিকেন্দ্রে। বিলাসবহুল গাড়ি, আধুনিক পোশাক এবং সামাজিক জীবনের নানা দৃশ্য দেখে মনে হয়, যুদ্ধের শোক যেন এই অংশের জীবনকে পুরোপুরি থামিয়ে দিতে পারেনি।
কিছু নারীকে প্রচলিত পোশাকবিধির বাইরে দেখা গেছে। কোথাও আবার নারী কণ্ঠশিল্পীর গানও বাজছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক ও ধর্মীয় অনুশাসনের যে ছবি সামনে আনা হচ্ছে, তার পাশাপাশি ইরানের সমাজে ব্যক্তিগত জীবনযাপন ও আধুনিকতার আরেকটি প্রবাহও সক্রিয়।
এই বৈপরীত্যই দেশটির বর্তমান বাস্তবতাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুদ্ধের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ
ইরানের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি অর্থনৈতিক সংকট। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বহু মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। মুদ্রার মূল্য কমে যাওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও কমেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া তরুণদের অনেকে স্থায়ী কাজ পাচ্ছেন না। যারা চাকরি করছেন, তাদের অনেকেরই আয় দিয়ে আগের মতো সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
একটি রেস্তোরাঁর কর্মী জানান, শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতার কারণে রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখতে হলে তাঁর আয় বন্ধ হয়ে যাবে। পরিবারের খাবারের খরচ চালানো নিয়ে তাঁর উদ্বেগ ছিল স্পষ্ট।

পানি ও বিদ্যুতের সংকটও বাড়ছে
যুদ্ধের ক্ষতির পাশাপাশি ইরানের মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার মধ্যে রয়েছে পানি ও বিদ্যুতের সংকট। রাষ্ট্রীয়ভাবে বড় আয়োজন করে শোক অনুষ্ঠান পরিচালনা করা হলেও সাধারণ মানুষের একাংশ প্রশ্ন তুলছে, তাদের প্রয়োজনীয় পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
এ কারণে খামেনির শেষকৃত্য অনেকের কাছে শুধু শোকের অনুষ্ঠান ছিল না, বরং রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলার একটি উপলক্ষ হয়ে উঠেছিল।
মাশহাদেও যুদ্ধের স্মৃতি
ইরানের ধর্মীয় নগরী মাশহাদে খামেনিকে সমাহিত করার আয়োজন ঘিরে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ জড়ো হয়। কিন্তু সেখানেও যুদ্ধের স্মৃতি থেকে মুক্তি মেলেনি।
বিমানবন্দরে হামলায় নিহত শিশুদের স্মরণে ছোট ছোট ব্যাগ, ফুল ও শিশুদের জুতা প্রদর্শন করা হয়। শহরের একটি বাজারে এক কর্মী যুদ্ধে নিহত তাঁর স্বজনের ছবি দোকানের দরজায় টাঙিয়ে রেখেছিলেন।
এর মধ্যেই নতুন করে নিষেধাজ্ঞা ও হামলার কারণে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে শোকের আবহের মধ্যেও নতুন সংঘাতের আশঙ্কা মানুষের মনে থেকে যায়।
শক্তিশালী, কিন্তু ক্লান্ত এক সমাজ
ইরান ছাড়ার পথে সীমান্তের কাছে দেশটির দুই কর্মকর্তার সঙ্গে কথোপকথন যেন পুরো যাত্রার একটি প্রতীকী সমাপ্তি তৈরি করে। তারা জানতে চেয়েছিলেন, ইরান ও ইরানের মানুষ সম্পর্কে কী ধারণা তৈরি হয়েছে এবং ইরানকে শক্তিশালী মনে হয় কি না।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তায় দেশটির শক্তি ও প্রতিরোধের ওপর জোর দেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের বাস্তবতায় শুধু শক্তির গল্প নেই। সেখানে আছে প্রিয়জন হারানোর বেদনা, যুদ্ধের আতঙ্ক, অর্থনৈতিক চাপ, সরকারি বিধিনিষেধ নিয়ে অসন্তোষ, বিদেশি হামলার বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
তবু এসবের মধ্যেও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা থেমে নেই। বাজারে কেনাবেচা চলছে, তরুণেরা আড্ডা দিচ্ছেন, মানুষ কাজের সন্ধান করছেন এবং পরিবারকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
ইরানের বর্তমান বাস্তবতা তাই একক কোনো অনুভূতিতে ব্যাখ্যা করা কঠিন। দেশটির মানুষের মধ্যে একই সঙ্গে রয়েছে দৃঢ়তা, শোক, প্রতিবাদ, ক্লান্তি, ভয় এবং ভবিষ্যতের প্রতি এক ধরনের আশাবাদ। যুদ্ধ তাদের জীবনকে বদলে দিয়েছে, কিন্তু পুরোপুরি থামিয়ে দিতে পারেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















