যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য দৌড় নিয়ে এখন থেকেই হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের অবস্থান নিয়ে দলের ভেতরে প্রশ্ন উঠলেও এখনো তাঁকে পেছনে ফেলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর এগিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধকে ঘিরে ভ্যান্সের অবস্থান তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে কিছুটা জটিল করলেও তাঁকে দুর্বল করে দেওয়ার মতো প্রমাণ এখনো স্পষ্ট নয়।
কঠোর অবস্থান থেকে কূটনীতির পথে ভ্যান্স
দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম বছরে ভ্যান্সকে মূলত প্রেসিডেন্টের কঠোর অবস্থানের অন্যতম মুখ হিসেবে দেখা হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে প্রকাশ্যে চাপ দেওয়া, অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়া কিংবা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে প্রতীকী সফর—বিভিন্ন ঘটনায় তিনি ট্রাম্পের নীতির কঠোর সমর্থক হিসেবে সামনে ছিলেন।
তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাঁর ভূমিকা বদলেছে। ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে সবচেয়ে দৃশ্যমান সংশয়ীদের একজন হয়ে ওঠেন তিনি। একই সঙ্গে যুদ্ধের জটিলতা কাটিয়ে কূটনৈতিক সমাধান খোঁজার চেষ্টাতেও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে দেখা যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই পরিবর্তনই ভ্যান্সকে একদিকে যুদ্ধবিরোধী রক্ষণশীলদের কাছে কিছুটা গ্রহণযোগ্য করেছে, অন্যদিকে যুদ্ধের পক্ষে থাকা কট্টরপন্থীদের সমালোচনার মুখে ফেলেছে।
রুবিও কি ভ্যান্সের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী?
রুবিওর রাজনৈতিক অবস্থানও এখন আলোচনার কেন্দ্রে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের প্রথম বছরে তাঁর কর্মকাণ্ডকে কার্যকর বলে মনে করা হলেও ইরান সংকটে তাঁর অবস্থান তুলনামূলকভাবে সতর্ক। যুদ্ধের দায় নেওয়া বা শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়ার বদলে তিনি অনেক সময় নিজের রাজনৈতিক অবস্থান খোলা রেখেছেন।
এদিকে সাম্প্রতিক এক জরিপে নিউ হ্যাম্পশায়ারের প্রাথমিক নির্বাচনে রুবিও ভ্যান্সের কাছাকাছি চলে এসেছেন। সম্ভাব্য ২০২৮ সালের প্রার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক হিসাবেও রুবিওর অবস্থান খুব বেশি পিছিয়ে নেই।
তবে শুধু জরিপে ব্যবধান কমে আসা মানেই ভ্যান্সের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যাচ্ছে—এমনটা বলার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।
ইরান যুদ্ধ ভ্যান্সের জন্য কতটা ঝুঁকি?
ভ্যান্সের সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হলো, তিনি প্রেসিডেন্টের যুদ্ধনীতির বিরোধিতা করলেও প্রকাশ্যে এমন অবস্থান নিতে পারবেন না যাতে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সরাসরি ভুল বলা হয়। কারণ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁকে শেষ পর্যন্ত নিজের রাজনৈতিক প্রধানের অবস্থানকেই সমর্থন করতে হবে।
অন্যদিকে যুদ্ধবিরোধী রক্ষণশীলদের কাছ থেকেও তিনি পুরোপুরি সমর্থন পাচ্ছেন না। কারণ তাঁরা চাইছেন যুদ্ধ বন্ধে আরও দৃশ্যমান ও সফল কূটনৈতিক উদ্যোগ।
ভ্যান্সের জন্য সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতি হতে পারত এমন একটি শান্তিচুক্তি, যেখানে ট্রাম্প রাজনৈতিক বিজয়ের কৃতিত্ব নিতেন আর ভ্যান্স শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের ভূমিকা তুলে ধরতে পারতেন। কিন্তু সেই সমাধান এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে যুদ্ধ নিয়ে ভ্যান্সকে একই সঙ্গে দুই দিকের চাপ সামলাতে হচ্ছে।

ট্রাম্পের সমর্থনই হতে পারে মূল বিষয়
২০২৮ সালের দৌড়ে ভ্যান্সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হতে পারে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। ভ্যান্সকে সরিয়ে রুবিওকে উত্তরসূরি হিসেবে এগিয়ে নিতে হলে ট্রাম্পের নীরব বা প্রকাশ্য সমর্থন প্রয়োজন হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্প ভ্যান্সের ওপর আস্থা হারিয়েছেন—এমন পরিষ্কার কোনো ইঙ্গিত নেই। বরং সাম্প্রতিক সময়ে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্টের সম্পর্ক কিছুটা উষ্ণ হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
ইরান ইস্যুতে ভ্যান্সের কিছু সমালোচনামূলক মন্তব্যও ট্রাম্পের নিজস্ব হতাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে যুদ্ধ নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও সেটিকে এখনই ট্রাম্প-ভ্যান্স সম্পর্কের বড় সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ কম।
রুবিওর সামনে কোন সুযোগ?
রুবিওর সম্ভাবনা বাড়াতে হলে ইরান যুদ্ধের গতিপথে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়ে অচলাবস্থায় আটকে গেলে ভ্যান্সের বিরুদ্ধে তিনি শক্তিশালী যুক্তি দাঁড় করাতে পারবেন না। কারণ তখন যুদ্ধের ব্যর্থতার দায় শুধু ভাইস প্রেসিডেন্টের ওপর চাপানো কঠিন হবে।
আবার যুক্তরাষ্ট্র যদি আরও বড় সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, তাহলেও রুবিওর জন্য পথ সহজ হবে না। কারণ এমন ব্যর্থতার দায় ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য সব উত্তরসূরির ওপরই পড়বে।
রুবিওর জন্য সবচেয়ে অনুকূল পরিস্থিতি হতে পারে এমন একটি দৃশ্যপট, যেখানে ট্রাম্প যুদ্ধ আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন, ভ্যান্স সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন, আর রুবিও সামরিক অবস্থানকে সমর্থন করেন। এরপর যদি ইরানের সরকার ভেঙে পড়ে এবং জ্বালানির দামও কমে যায়, তাহলে ট্রাম্পের চোখে রুবিও বিজয়ের অন্যতম কারিগর হিসেবে উঠে আসতে পারেন।
এখনো ভ্যান্সই এগিয়ে
তবে এমন পরিস্থিতি বাস্তবে তৈরি হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভ্যান্সকে সরিয়ে রুবিওকে রিপাবলিকান দলের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো শক্তিশালী কারণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
ইরান যুদ্ধ ভ্যান্সের রাজনৈতিক অবস্থানকে নিঃসন্দেহে কঠিন করেছে। কিন্তু একই যুদ্ধ রুবিওর জন্যও বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে—এমনটা এখনই বলা যায় না। ২০২৮ সালের লড়াই যত এগোবে, ট্রাম্পের উত্তরাধিকার, ইরান যুদ্ধের ফলাফল এবং রিপাবলিকান ভোটারদের মনোভাব—এই তিনটি বিষয়ই ভ্যান্স ও রুবিওর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















