পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ায় গোপনে মেথামফেটামিন তৈরির কারখানা গড়ে তুলছে আন্তর্জাতিক মাদকচক্র। শুধু মাদক পাচারের পথ হিসেবে নয়, এবার আফ্রিকাকে মাদক উৎপাদনের ঘাঁটি হিসেবেও ব্যবহার করছে এসব চক্র। নাইজেরিয়ায় সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে মেক্সিকোর মাদকচক্রের সঙ্গে স্থানীয় অপরাধীদের যোগসূত্রের বিষয়টি সামনে এসেছে। গত মে মাসে নাইজেরিয়ার ওগুন রাজ্যের ঘন জঙ্গলের মধ্যে একটি কথিত মাদক কারখানায় অভিযান চালিয়ে দুই টনের বেশি মেথামফেটামিন জব্দ করা হয়। এর আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩৬ কোটি মার্কিন ডলার। অভিযানে তিন মেক্সিকান ও সাত নাইজেরীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়।
জঙ্গলের ভেতরেই বসানো হয়েছিল কারখানা
নাইজেরিয়ার একটি ফেডারেল আদালতও মামলার গুরুত্ব বোঝাতে প্রচলিত আদালতকক্ষের বদলে ওই মাদক কারখানার জায়গাতেই শুনানি করে। সেখানে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক, গ্যাসের সিলিন্ডার, ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ এবং মেথ তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম পাওয়া যায়।
মাদকবিরোধী কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কারখানাটি ছিল বেশ পরিকল্পিত ও আধুনিক। তরল মেথামফেটামিনকে জমাট করে মাদক তৈরির প্রক্রিয়াও সেখানে চলছিল। দুর্গম বনাঞ্চলে কারখানাটি স্থাপন করায় বাইরে থেকে এর কার্যক্রম শনাক্ত করা কঠিন ছিল।

এর মাত্র এক মাস পর পাশের ওয়ো রাজ্যের একটি জঙ্গল থেকেও আরেকটি গোপন মাদক কারখানা শনাক্ত করা হয়। সেখান থেকে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে একজন মেক্সিকান নাগরিককে মেথামফেটামিন তৈরির বিশেষজ্ঞ বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
মেক্সিকোর মাদকচক্রের সঙ্গে যোগসূত্র
নাইজেরিয়ার সাম্প্রতিক অভিযানগুলোকে আফ্রিকায় মাদক উৎপাদনের বিস্তৃত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মকর্তারা। তাদের মতে, আগে আফ্রিকা মূলত মাদক পাচারের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এখন মহাদেশটির বিভিন্ন দেশে মাদক তৈরির কারখানাও গড়ে উঠছে।
মেক্সিকোর মাদক তৈরির বিশেষজ্ঞদের স্থানীয় অপরাধীদের সঙ্গে কাজ করার ঘটনাও বাড়ছে। গত কয়েক বছরে কেনিয়া, মোজাম্বিক, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নাইজেরিয়ায় মেক্সিকান নাগরিকদের সংশ্লিষ্টতা থাকা একাধিক গোপন মেথ কারখানা ধরা পড়েছে।
২০২৩ সাল থেকে আফ্রিকায় মেক্সিকানদের পরিচালিত অন্তত ১৪টি মেথ কারখানায় অভিযান চালানোর তথ্য সামনে এসেছে। এর মধ্যে চলতি বছরেই পাঁচটি কারখানায় অভিযান হয়েছে, যার চারটিই নাইজেরিয়ায়।
কেন আফ্রিকাকে বেছে নিচ্ছে মাদকচক্র

বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিম আফ্রিকার বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, সহজলভ্য শ্রম এবং বড় তরুণ জনগোষ্ঠী মাদকচক্রের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি রাসায়নিক আমদানির দুর্বল নজরদারি ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নানা দুর্বলতাও অপরাধীদের সুবিধা দিচ্ছে।
মেথামফেটামিনের ক্ষেত্রে আরও একটি বড় সুবিধা রয়েছে। কোকেন বা হেরোইনের মতো উদ্ভিদনির্ভর মাদক নির্দিষ্ট অঞ্চলে উৎপাদন করতে হয়। কিন্তু মেথামফেটামিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক ও দক্ষতা পাওয়া গেলে বিশ্বের প্রায় যেকোনো জায়গায় কারখানা স্থাপন করা সম্ভব।
ফলে মেক্সিকোর বড় মাদকচক্রগুলো উৎপাদন কেন্দ্র ভোক্তা বাজারের কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারছে। পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আটলান্টিক নৌপথ ব্যবহার করে ইউরোপে মাদক পাঠানো যেমন সহজ, তেমনি আফ্রিকার অবস্থান এশিয়ার বাজারেও পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করছে।
ইউরোপ ও এশিয়াতেও বাড়ছে মেথের বিস্তার
মেথামফেটামিন অত্যন্ত আসক্তিকর একটি কৃত্রিম মাদক। এটি দ্রুত উত্তেজনা তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে শরীর ও মস্তিষ্কে গুরুতর ক্ষতি করতে পারে। হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা, অপুষ্টি, মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ ও তীব্র মাদকাসক্তি এর বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
গত এক দশকে ইউরোপে মেথামফেটামিন ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এশিয়ার পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলেও ২০২৪ সালে মেথামফেটামিন জব্দের পরিমাণ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উৎপাদন যদি ভোক্তা বাজারের কাছাকাছি চলে আসে, তাহলে মাদকের সরবরাহ ব্যবস্থা আরও দ্রুত ও বিস্তৃত হতে পারে। এতে আফ্রিকার স্থানীয় বাজারেও মাদকাসক্তি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

নাইজেরিয়াকে নিরাপদ ঘাঁটি হতে দিতে চায় না কর্তৃপক্ষ
নাইজেরিয়ার মাদকবিরোধী সংস্থা বলছে, দেশটিকে আন্তর্জাতিক মাদকচক্রের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হতে দেওয়া হবে না। গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি এবং দ্রুত অভিযান বাড়ানোর মাধ্যমে গোপন কারখানাগুলো শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
কর্মকর্তাদের মতে, মেক্সিকোর মাদকচক্রের ওপর বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চাপ বাড়ায় তারা নতুন উৎপাদনকেন্দ্র খুঁজছে। পশ্চিম আফ্রিকাকে তারা এক ধরনের বড় উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে নাইজেরিয়ার ধারাবাহিক অভিযান ও বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দের ঘটনা দেখাচ্ছে, কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করছে। আফ্রিকা যে শুধু মাদক পাচারের পথ নয়, বরং আন্তর্জাতিক মাদক উৎপাদনের নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠছে—সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই উদ্বেগই আরও স্পষ্ট করেছে।
মেথামফেটামিনের বিস্তার ঠেকাতে তাই শুধু মাদক জব্দ নয়, রাসায়নিক আমদানি, সীমান্ত, বনাঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের ওপরও নজরদারি বাড়ানো জরুরি হয়ে উঠেছে।
নাইজেরিয়ার সাম্প্রতিক অভিযান থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—আন্তর্জাতিক মাদকচক্রের বিরুদ্ধে লড়াই এখন আর কোনো একটি দেশের সীমায় আটকে নেই। উৎপাদন, পাচার ও বাজার—তিন ক্ষেত্রেই আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা ছাড়া এই নতুন হুমকি মোকাবিলা কঠিন।
নাইজেরিয়ায় মেক্সিকোর মাদকচক্রের গোপন মেথ কারখানা ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে; পশ্চিম আফ্রিকা হয়ে উঠছে আন্তর্জাতিক কৃত্রিম মাদকের নতুন উৎপাদন ঘাঁটি।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















