২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্বের তিনটি মহাদেশে গণঅভ্যুত্থানের ফলে নির্বাচিত সরকারগুলো হয় ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে, নয়তো মারাত্মকভাবে অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ, কেনিয়া ও সার্বিয়ার পর ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়া, মাদাগাস্কার, মেক্সিকো, মরক্কো, নেপাল, পেরু, ফিলিপাইন ও তিমুর-লেস্তেতে একই ধরনের আন্দোলন দেখা যায়। এর মধ্যে দুটি দেশে সরকার সরাসরি ক্ষমতাচ্যুত হয়।
এই ঢেউ ২০২৬ সালের জুলাইয়ে নয়াদিল্লিতেও পৌঁছে যায়, যখন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নেতৃত্বাধীন সাত সপ্তাহের আন্দোলনের মুখে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একজন সদস্য পদত্যাগ করেন।
পশ্চিমা বিশ্বের বহু বিশ্লেষণে এই ধরনের আন্দোলনের প্রধান ব্যাখ্যা হিসেবে প্রজন্মগত বৈষম্যের কথা বলা হয়। তাদের মতে, বেকারত্ব, আয়বৈষম্য এবং রাজনৈতিক অভিজাতদের দুর্নীতিতে ক্ষুব্ধ একটি প্রজন্ম এমন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সংগঠিত হচ্ছে, যা তারা শাসকদের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে বোঝে ও পরিচালনা করতে পারে।
এই ব্যাখ্যা আংশিকভাবে সঠিক হলেও নীতিনির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক এতে অনুপস্থিত। অনেক অভিযোগই স্থানীয় বাস্তবতা থেকে জন্ম নেয়, কিন্তু সেই অসন্তোষকে কীভাবে সরকার পতনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়, সেই প্রক্রিয়া স্থানীয় নয়। গত দুই দশকে এসব আন্দোলনে একই ধরনের ঘটনাক্রম, ভাষা, অর্থায়নের কাঠামো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক সংগঠন এবং কূটনৈতিক পরিবেশের পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে, যা কেবল কাকতালীয় বলে ব্যাখ্যা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
আন্দোলনের অভিন্ন বৈশিষ্ট্য
এ ধরনের আন্দোলনের একটি পুনরাবৃত্ত বৈশিষ্ট্য হলো, এর সূচনালগ্নে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো দৃশ্যমান থাকে না। পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে নির্দলীয়, তুলনামূলক তরুণ, প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগে থেকেই প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দ্রুত আন্দোলনের মুখপাত্রে পরিণত হন।

জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতীকী জনসমাগমস্থলগুলো সচেতনভাবে আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়, যাতে সহজেই জাতীয় শিরোনাম এবং আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়।
আন্দোলন সাধারণত অহিংস দাবিদাওয়া দিয়ে শুরু হয়। এর ফলে আন্দোলন জনসমর্থন ও বৈধতা অর্জন করে। এরপর ধীরে ধীরে তা সংঘাত, উসকানি এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জে রূপ নেয়।
বাইরে থেকে এসব আন্দোলনকে বিকেন্দ্রীভূত ও নেতৃত্বহীন মনে হলেও, এর অন্তরালে সংগঠন, বার্তা প্রচার, লজিস্টিক সহায়তা, গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ডিজিটাল প্রচারণায় উল্লেখযোগ্য মাত্রার সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়।
পূর্ব ইউরোপে সূচনা
এই মডেলের ভিত্তি গড়ে ওঠে ২০০০-এর দশকের শুরুতে পূর্ব ইউরোপে।
২০০৪ সালের নভেম্বরে কিছু সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়, ইউক্রেনের ‘পোরা’ যুব আন্দোলনের প্রচারণা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, জরিপকারী সংস্থা, কূটনীতিক এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন ও সংগঠনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল।
একই ধরনের প্যাকেজ ২০০০ সালে বেলগ্রেডে প্রয়োগ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে, যেখানে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার। ইউক্রেনে একই ধরনের কার্যক্রমে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার।
ফ্রিডম হাউস এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমে অর্থায়ন করে এবং এক্সিট পোল পরিচালনা করে। সরকারি ফল ঘোষণার আগেই এসব এক্সিট পোল প্রকাশ তথ্যপ্রবাহের দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্লোবোদান মিলোশেভিচের পতনের সময় বেলগ্রেডে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ছিলেন রিচার্ড মাইলস। তিন বছর পর জর্জিয়ার ‘রোজ রেভল্যুশন’-এর সময়ও তিনি একই পদে দায়িত্ব পালন করেন।
আরব বসন্ত: মধ্যপ্রাচ্যে একই পদ্ধতির বিস্তার
২০১১ সালের মধ্যে এই পদ্ধতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও পৌঁছে যায়। আরব গণঅভ্যুত্থানে সরাসরি অংশ নেওয়া সংগঠনগুলোর মধ্যে মিশরের এপ্রিল ৬ ইয়ুথ মুভমেন্ট এবং বাহরাইন সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ছিল উল্লেখযোগ্য। সাক্ষাৎকার এবং উইকিলিকসে প্রকাশিত মার্কিন কূটনৈতিক বার্তার তথ্য অনুযায়ী, এসব সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) এবং ফ্রিডম হাউস থেকে প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন পেয়েছিল।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, এসব গণঅভ্যুত্থান ছিল নিজ নিজ দেশের ভেতর থেকেই জন্ম নেওয়া আন্দোলন এবং ওয়াশিংটন আন্দোলনের সূচনা করেনি; বরং দক্ষতা ও নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিল। এই ব্যাখ্যাই পুরো ব্যবস্থাটির প্রকৃত ভূমিকা ব্যাখ্যা করে, তাকে খাটো করে না।
দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র
এরপর মাত্র চার বছরের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া এই মডেলের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ উপস্থাপন করে।
বাংলাদেশ
বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সুপ্রিম কোর্ট দাবির বড় অংশ মেনে নেওয়ার পরও আন্দোলন থামেনি; বরং আরও তীব্র হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যান।
তিনি অভিযোগ করেন, একটি বেসামরিক আন্দোলনের মাধ্যমে পশ্চিমা শক্তি তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। তবে তার এই অভিযোগ তার দল বা পরিবারের কেউ নিশ্চিত করেনি।
যদিও অভিযোগটি এখনো যাচাই হয়নি, তবে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নথিভুক্ত রয়েছে। একটি থিংক ট্যাঙ্কের বিশ্লেষণে দুই দশক ধরে ইউএসএআইডি (USAID) এবং ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি (NED)-এর বিভিন্ন কর্মসূচির কথা তুলে ধরা হয়েছে, যা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (IRI) এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (NDI)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।
একই বিশ্লেষণে আরও দাবি করা হয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ শক্তিশালী করার জন্য ইউএসএআইডির ২ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলারের একটি প্রকল্প পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিজেই সমালোচনা করেছিলেন।

শ্রীলঙ্কা
২০২২ সালের শ্রীলঙ্কা এই মডেলের আরেকটি দিক তুলে ধরে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষ তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, গল ফেসের আন্দোলনস্থলে তাঁবু, ভ্রাম্যমাণ টয়লেট এবং যেন কখনো শেষ না হওয়া খাবার ও পানীয়ের সরবরাহ ছিল। তিনি আরও লিখেছেন, ইউরোপের দুই রাষ্ট্রদূত তাকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের উচ্ছেদ না করার অনুরোধ জানান।
এই বিবরণ আত্মপক্ষসমর্থনমূলক হতে পারে এবং শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের নিকটতম কারণ ছিল তার সরকারের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা। কিন্তু এতে একটি প্রশ্নের উত্তর মেলে না—বিদেশি মুদ্রাশূন্য হয়ে পড়া একটি দেশে দীর্ঘ সময় ধরে চলা রাজধানীকেন্দ্রিক আন্দোলনের অর্থায়ন ও রসদ সরবরাহ কে করেছিল?
নেপাল
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালে এই মডেলটি সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত আকারে দেখা যায়।
২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৮ সেপ্টেম্বর বিক্ষোভ শুরু হয়। সেদিন ১৯ জন বিক্ষোভকারী নিহত হন। পরদিনই প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা অলি পদত্যাগ করেন এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে পড়ে।
এরপর এক লাখের বেশি সদস্যবিশিষ্ট একটি ডিসকর্ড চ্যাট সার্ভারে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাঁচজন প্রার্থীর ওপর ভোট গ্রহণ করা হয়। সেই ভোটের পর ১২ সেপ্টেম্বর সুশীলা কার্কিকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ফলে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এমন একটি বিদেশি মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যা নেপালের কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাবদিহি করে না।
পরে সেনাপ্রধানের ভাষায় আন্দোলনের অংশীজন হিসেবে চিহ্নিত রাষ্ট্রিয় স্বাধীনতা পার্টি ২০২৬ সালের মার্চ মাসের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে।

দিল্লির আন্দোলন: একই কাঠামোর পুনরাবৃত্তি
সাম্প্রতিক দিল্লির আন্দোলনে এই কাঠামোর বহু উপাদান অস্বাভাবিক স্পষ্টতার সঙ্গে পুনরায় দেখা গেছে।
ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬ মে। এর প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে, বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী। এর আগে তিনি তিন বছর আম আদমি পার্টির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিমে কাজ করেছেন, যার মধ্যে প্রবাসী ভারতীয়দের নিয়ে কাজ করার দায়িত্বও ছিল।
প্রধান বিচারপতি বেকার তরুণদের ‘ককরোচ’-এর সঙ্গে তুলনা করে মন্তব্য করার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সংগঠনটি গঠিত হয়।
বোস্টন থেকেই আন্দোলনের সূচনা
দিপকে প্রথমে বোস্টন থেকেই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
শুরুর দিকে তিনি বিভিন্ন বিদেশি সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেন। এর ফলে আন্দোলনটি আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করে এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উপস্থাপিত হয়। বিশেষ করে প্রবাসী ভারতীয় এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় তরুণদের মধ্যে এর প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
যদিও আন্দোলনটি শুরুতে অহিংসার ওপর জোর দেয়, পরে এর সংগঠন সংঘর্ষ, উসকানি এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার দিকে অগ্রসর হয়।
দ্রুত বিস্তার
মাত্র ৭২ ঘণ্টায় দলটির সদস্যসংখ্যা এক লাখে পৌঁছে যায়। ইনস্টাগ্রামে অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ৫০ লাখ অতিক্রম করে, যা ক্ষমতাসীন দলের অনুসারীর সংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি। শুরু থেকেই এটি প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যেও সাড়া ফেলে।
ম্যাসাচুসেটস থেকে দিপকে তথাকথিত জাতীয় আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দেন। পরে ৬ জুন প্রথম যন্তর মন্তরের সমাবেশে অংশ নিতে ভারতে আসেন। এরপর বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলো এমন একটি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়, যা তারা নিজেরা গড়ে তোলেনি।
এরপর সোনম ওয়াংচুকের ২৬ দিনের অনশন আন্দোলনের জন্য একটি অপরিহার্য প্রতীকী চরিত্র তৈরি করে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো একটি বৈধ অভিযোগ ধীরে ধীরে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়।
এরপর মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন দাবি উঠতে থাকে যে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের অর্থ, সরঞ্জাম ও অন্যান্য সহায়তা বিদেশ থেকে এসেছে। এসব অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়। তবে গত দুই দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা আন্দোলনের পুনরাবৃত্ত ধারা বিবেচনায় এগুলো সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
বিরোধী রাজনীতির সম্পৃক্ততা
ভারতের বিরোধী দলগুলোও সরকারকে বিব্রত করা এবং ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের মধ্যেও নেতিবাচক মনোভাব তৈরির উদ্দেশ্যে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দমনমূলক শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের একটি প্রতিষ্ঠিত কৌশল ব্যবহার করা হয়, যাতে বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে ভারতের উত্থানের বিরোধী আন্তর্জাতিক বাম-উদারপন্থী সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়।
সংসদ অধিবেশন চলাকালে আন্দোলনকারীরা সংসদ ভবনের মাত্র ৫০০ মিটারের মধ্যে পৌঁছে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে আন্দোলনকারীরা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত ছিল। তাদের এই মাত্রার সমাবেশের জন্য প্রস্তুতি না থাকায় রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
সংসদমুখী এই আন্দোলনের সাফল্যের পর আরও কয়েকটি রাজ্যের রাজধানীতে একই ধরনের বিক্ষোভ শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত সরকার ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখতে প্রধান দাবিটি মেনে নিতে বাধ্য হয়।

ক্ষোভ বাস্তব, কিন্তু প্রশ্ন রূপান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে
উপসংহারে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। এসব আন্দোলনের পেছনের অভিযোগগুলো মনগড়া ছিল না। ভারতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল, নেপালে দুর্নীতি ছিল দীর্ঘদিনের বাস্তবতা এবং শ্রীলঙ্কার ঋণ খেলাপিও সত্য ছিল।
পার্থক্যটি অভিযোগে নয়, বরং সেই অভিযোগকে সরকার পতনের সংকটে রূপান্তর করার প্রক্রিয়ায়।
প্রতিটি রাষ্ট্রেই জনঅসন্তোষ তৈরি হয়। কিন্তু সেই অসন্তোষ সরকারকে অস্থিতিশীলতায় রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করে বিদেশভিত্তিক সাংগঠনিক অবকাঠামো, প্রবাসী নেটওয়ার্কের প্রচারণা, দেশীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং এমন একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ওপর, যার নিজস্ব অগ্রাধিকার রয়েছে কোন সরকারকে কতটা চাপে রাখা হবে। এই অবকাঠামো বিদ্যমান, সব দেশে সমানভাবে বিস্তৃত নয় এবং এর প্রভাবও নিরপেক্ষ নয়।
প্রতিটি আন্দোলনকে যদি পুরোপুরি স্বতঃস্ফূর্ত বলে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে একই ধরনের ঘটনার মুখে রাষ্ট্রগুলো বারবার বিস্মিত হবে। আবার প্রতিটি আন্দোলনকে যদি বিদেশি শক্তি পরিচালিত বলে ধরে নেওয়া হয়, তবে সেটিও এমন একটি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে, যা এই ধরনের কৌশলের সফলতার জন্য প্রয়োজনীয়।
২০০৪ সালের কিয়েভ থেকে ২০২৬ সালের যন্তর মন্তর পর্যন্ত অভিজ্ঞতা অন্তত একটি বিষয় নির্দেশ করে—এই কাঠামো মানুষের ক্ষোভ তৈরি করে না; বরং বিদ্যমান ক্ষোভ থেকে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সংকট তৈরি হওয়ার মধ্যবর্তী সময়কে অনেক কমিয়ে দেয়।
শিশির গুপ্ত 


















