গণতন্ত্রে ভোটাধিকার একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু সেই অধিকারকে যদি আইনি বাধ্যবাধকতায় পরিণত করা হয়, তাহলে কি গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে? নাকি নাগরিকের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারই ক্ষতিগ্রস্ত হবে? যুক্তরাজ্যে বাধ্যতামূলক ভোট চালুর প্রস্তাব আবারও আলোচনায় এসেছে। সমর্থকদের দাবি, এতে ভোটার উপস্থিতি বাড়বে, নির্বাচিত সরকারের বৈধতা আরও শক্তিশালী হবে এবং রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে। কিন্তু বাস্তবতা কি সত্যিই এত সহজ?
কোনো একটি ধারণা জনপ্রিয় হয়ে উঠলেই সেটি যে কার্যকর বা গণতন্ত্রের জন্য কল্যাণকর হবে, এমন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, অনেক মানুষ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের আরও বেশি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় যেমন একাংশ মানুষ দীর্ঘমেয়াদে মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, এমনকি রাতের কারফিউ কিংবা নাইটক্লাব স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখার মতো পদক্ষেপের পক্ষেও মত দিয়েছিলেন। জনমত কখনও কখনও স্বাধীনতার চেয়ে নিয়ন্ত্রণকে বেশি সমর্থন করে। বাধ্যতামূলক ভোটের ধারণাও অনেকটা সেই প্রবণতারই অংশ।
বাধ্যতামূলক ভোটের সমর্থকদের যুক্তি বেশ আকর্ষণীয় শোনায়। তাদের মতে, সবাই যদি ভোট দেয়, তাহলে নির্বাচিত সরকারের প্রতিনিধিত্ব আরও বিস্তৃত হবে। সমাজের দরিদ্র, তরুণ কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়বে। রাজনৈতিক দলগুলো কেবল নিজেদের সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে আনার কৌশল না নিয়ে নীতিগত বিতর্কে বেশি মনোযোগ দেবে। ভোট দেওয়ার বাধ্যবাধকতা মানুষকে রাজনীতি সম্পর্কে জানতেও উৎসাহিত করবে।

কিন্তু এসব যুক্তির বাস্তব ভিত্তি খুবই দুর্বল। মানুষকে জোর করে ভোটকেন্দ্রে পাঠানো যায়, কিন্তু কাউকে জোর করে রাজনীতির প্রতি আস্থা রাখতে বাধ্য করা যায় না। যে ব্যক্তি রাজনীতিবিদদের বিশ্বাস করেন না, তাকে জরিমানার ভয় দেখিয়ে ভোট দিতে বাধ্য করলে তার সেই অনাস্থা দূর হবে না; বরং রাষ্ট্রের প্রতি বিরক্তি আরও বাড়তে পারে।
গবেষণাও একই ইঙ্গিত দেয়। যেসব দেশে বাধ্যতামূলক ভোট চালু রয়েছে, সেখানে মানুষ রাজনীতি সম্পর্কে বেশি জানে বা সংবাদপত্র বেশি পড়ে—এমন প্রমাণ খুবই সীমিত। ভোট দিতে বাধ্য করার ফলে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সচেতনতা বেড়ে যায়—এ দাবিও গবেষণায় শক্ত সমর্থন পায়নি।
অস্ট্রিয়ার অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কিছু অঞ্চলে বাধ্যতামূলক ভোট চালু করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯২ সালে সেই আইন বাতিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভোটদানের হার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। অর্থাৎ বাধ্যবাধকতা মানুষের মধ্যে স্থায়ী নাগরিক অভ্যাস তৈরি করতে পারেনি।
কিছু গবেষণা আরও উদ্বেগজনক একটি বিষয় তুলে ধরে। বাধ্যতামূলক ভোটের কারণে মানুষ মনে করতে পারে, ভোট দিয়েই নাগরিক দায়িত্ব শেষ হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক আলোচনা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে অংশগ্রহণ কিংবা অন্যান্য নাগরিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহ কমে যেতে পারে। অর্থাৎ ভোট বাড়লেও সক্রিয় গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
আরেকটি বাস্তব সমস্যা হলো এই আইন কার্যকর করা। যারা ভোট দেবে না, তাদের খুঁজে বের করা, জরিমানা করা, আপিল নিষ্পত্তি করা—এসবের জন্য বিশাল প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এমন একটি ব্যবস্থা ব্যয়বহুল, জটিল এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক চাপ তৈরি করতে পারে।
তাহলে কেন এই প্রস্তাব বারবার ফিরে আসে?
এর একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা রয়েছে। বাধ্যতামূলক ভোটের ফলে নির্বাচনের ফলাফল বদলে যেতে পারে। যারা সাধারণত ভোট দিতে যান না, তাদের বড় অংশ তরুণ, নিম্ন আয়ের মানুষ কিংবা রাজনীতির প্রতি অনাগ্রহী নাগরিক। তারা ভোট দিলে রাজনৈতিক সমীকরণও বদলে যেতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে এমন প্রবণতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বিশ শতকের প্রথমার্ধে বিভিন্ন অঞ্চলে বাধ্যতামূলক ভোট চালুর পর সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। কারণ রাজনৈতিক দলগুলো নতুন ভোটারদের আকৃষ্ট করতে আরও বেশি সরকারি সুবিধা, ভর্তুকি ও ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ ভোটার বৃদ্ধি কেবল অংশগ্রহণ বাড়ায়নি, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ধরনও বদলে দিয়েছিল।
ব্রিটেনেও একই ধরনের পরিবর্তনের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যারা এতদিন ভোট দিতেন না, তাদের অনেকেই রাজনীতির প্রতি ক্ষুব্ধ বা বিচ্ছিন্ন অনুভব করেন। তাদের কেউ কেউ ভোট নষ্ট করবেন, কেউ হয়তো প্রতিবাদী বা চরমপন্থী দলকে সমর্থন করবেন। এতে মূলধারার রাজনীতির পাশাপাশি বিভাজনমূলক বা জনতুষ্টিবাদী রাজনীতিও শক্তিশালী হতে পারে।
অবশ্যই গণতন্ত্রে জনগণের সিদ্ধান্তই শেষ কথা। মানুষ যদি বেশি কর, বেশি সরকারি ব্যয় কিংবা নতুন রাজনৈতিক শক্তিকে সমর্থন করতে চান, সেটি তাদের অধিকার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যিনি ভোট দিতে চান না, তাকে কি রাষ্ট্র শাস্তির ভয় দেখিয়ে সেই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে বাধ্য করবে?

গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি কেবল ভোট নয়; ব্যক্তিস্বাধীনতাও। রাষ্ট্র কিছু ক্ষেত্রে নাগরিককে বাধ্য করতে পারে—যেমন জুরি বোর্ডে দায়িত্ব পালন বা যুদ্ধকালীন সামরিক দায়িত্ব। কিন্তু ভোট দেওয়া এমন একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যেখানে অংশ নেওয়া কিংবা অংশ না নেওয়া—উভয়ই ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ।
ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্তও এক ধরনের রাজনৈতিক অবস্থান হতে পারে। কেউ হয়তো মনে করেন কোনো দলই তার প্রতিনিধিত্ব করছে না। কেউ হয়তো রাজনীতির প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা হারিয়েছেন। আবার কেউ হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবেই ভোট থেকে বিরত থেকে প্রতিবাদ জানাতে চান। এসব অবস্থান গণতন্ত্রের পরিসরের মধ্যেই পড়ে।
তাই ভোটের হার বাড়ানোর প্রকৃত উপায় শাস্তি বা বাধ্যবাধকতা নয়; বরং এমন রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে আগ্রহী হবে। রাজনীতির প্রতি আস্থা, জবাবদিহি, সুশাসন এবং কার্যকর নেতৃত্বই ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসে। আইন দিয়ে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়, কিন্তু গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাস সৃষ্টি করা যায় না।
গণতন্ত্রের শক্তি মানুষের স্বাধীন ইচ্ছায়। সেই স্বাধীনতাকে সম্মান জানানোই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
ড্যানিয়েল ফিঙ্কেলস্টেইন 


















