মাত্র ১০ দিন ধরে চলা একটানা মাথাব্যথাকে প্রথমে সাধারণ ক্লান্তি বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের রেক্সহ্যামের বাসিন্দা ৩৪ বছর বয়সী জশ স্মিথ। কিন্তু পরে সেই মাথাব্যথাই ধরা পড়ে মস্তিষ্কের আক্রমণাত্মক ক্যানসার গ্লিওব্লাস্টোমার লক্ষণ হিসেবে। এখন তিনি বলছেন, স্ত্রী কেলি জোর করে চিকিৎসকের কাছে না নিয়ে গেলে হয়তো তিনি আজ বেঁচেই থাকতেন না।
জশের অভিজ্ঞতা এখন শুধু ব্যক্তিগত লড়াইয়ের গল্প নয়, বরং মস্তিষ্কের টিউমার নিয়ে আরও গবেষণা ও সচেতনতার দাবির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
উপসর্গকে গুরুত্ব দেননি
জশ জানান, চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি অদ্ভুত ধরনের অসুস্থতা অনুভব করতে শুরু করেন। মাঝে মাঝে মনোযোগ হারিয়ে ফেলতেন, মাথা ভার লাগত, কিন্তু তিনি ভেবেছিলেন অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণেই এমন হচ্ছে।
ফেব্রুয়ারিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। টানা ১০ দিন মাথাব্যথার পাশাপাশি পরিবার বা স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সময় হঠাৎ মনোযোগ হারিয়ে ফেলতেন। পরে চিকিৎসকেরা জানান, এগুলো আসলে ছোট ছোট খিঁচুনির লক্ষণ ছিল।
দীর্ঘদিন চিকিৎসকের কাছে না যাওয়ার অভ্যাস থাকায় তিনি প্রথমে শুধু ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে স্ত্রী কেলি বিষয়টি স্বাভাবিক মনে করেননি এবং চিকিৎসকের কাছে যেতে বাধ্য করেন।

প্রথম পরীক্ষায় ধরা পড়েনি সমস্যা
জশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে সাধারণ চিকিৎসক বড় কোনো সমস্যা খুঁজে পাননি। তাকে ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হয়। সেখানেও উল্লেখযোগ্য কোনো সমস্যা ধরা পড়েনি।
কেলি বলেন, তার মনে হচ্ছিল বিষয়টি গুরুতর। কিন্তু তখন তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।
তীব্র ব্যথার পর ধরা পড়ে টিউমার
১৩ ফেব্রুয়ারি মাথার অসহনীয় ব্যথায় জশকে রেক্সহ্যাম মেলর হাসপাতালে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। প্রথমে তাকে ব্যথানাশক দিয়ে বাড়ি পাঠানো হলেও ব্যথা না কমায় পরদিন সিটি স্ক্যান করা হয়।
সেই স্ক্যানেই ধরা পড়ে তার মস্তিষ্কে ৪ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার আকারের একটি টিউমার রয়েছে।
পরে তাকে লিভারপুলের দ্য ওয়ালটন সেন্টারে পাঠানো হয়। সেখানে পরীক্ষার পর নিশ্চিত হয় যে তিনি গ্লিওব্লাস্টোমায় আক্রান্ত। এটি মস্তিষ্কের অত্যন্ত আক্রমণাত্মক এক ধরনের টিউমার, যেখানে সাধারণত রোগীর সম্ভাব্য বেঁচে থাকার সময় ১২ থেকে ১৮ মাস বলে ধরা হয়।
অস্ত্রোপচারে টিউমারের ৯৫ শতাংশ অপসারণ
চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জশের টিউমারের প্রায় ৯৫ শতাংশ অপসারণ করেন।

ব্রেইন টিউমার রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, গ্লিওব্লাস্টোমায় আক্রান্ত রোগীদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ১২ মাসের বেশি বেঁচে থাকেন। পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় বেঁচে থাকার হার মাত্র ৪ শতাংশ।
অস্ত্রোপচারের পর জশের প্রথম চাওয়া ছিল কেএফসির খাবার। তিনি মজা করে বলেন, হাসপাতালে যাওয়ার পথে কেএফসি চোখে পড়েছিল বলেই হয়তো জ্ঞান ফেরার পর সেটাই মাথায় আসে। এমনকি আগে তিনি কেএফসি বিশেষ পছন্দও করতেন না।
চলছে কেমোথেরাপি, লক্ষ্য বড়দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকা
অস্ত্রোপচারের পর জশ রেডিওথেরাপি সম্পন্ন করেছেন এবং বর্তমানে কেমোথেরাপি নিচ্ছেন। তবে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এই ক্যানসারের স্থায়ী চিকিৎসা নেই।
তিনি বলেন, এখন তার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। স্ত্রীকে কথা দিয়েছেন, বড়দিনে তিনি নিজেই ক্রিসমাস ট্রি সাজাতে সাহায্য করবেন।
জশের ভাষায়, বাইরে থেকে তাকে দেখে কেউ বুঝতে পারবেন না যে তিনি মরণব্যাধিতে আক্রান্ত। তাই প্রতিটি দিনকে অর্থবহ করে তুলতেই তিনি মনোযোগ দিচ্ছেন।
প্রতিটি দিনকে স্মরণীয় করার চেষ্টা
রোগ নির্ণয়ের আগে জশ ও কেলি ক্যাম্পারভ্যানে ভ্রমণ এবং সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। এখন সেই পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত।
এর পরিবর্তে তারা প্রতিটি দিনকে স্মরণীয় করে তুলতে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের চেষ্টা করছেন। জশ ইতোমধ্যে স্নোডন পর্বতে আরোহণ করেছেন, পার্করানে অংশ নিয়েছেন, প্যাডলবোর্ডিং করেছেন, চেস্টার চিড়িয়াখানায় একদিনের জন্য প্রাণী পরিচর্যাকারীর অভিজ্ঞতা নিয়েছেন, বাগানে ফুল লাগিয়েছেন এবং তাদের দুই পোষা কুকুরকে নিয়ে নিয়মিত হাঁটতে বের হচ্ছেন।

তিনি বলেন, প্রতিদিন সকালে উঠে স্ত্রীর জন্য এক কাপ কফি তৈরি করার চেষ্টা করেন। কারণ জীবনকে শুধু রোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি দিনকে মূল্যবান করে তুলতে চান।
গবেষণায় আরও বিনিয়োগের দাবি
জশ এখন মস্তিষ্কের টিউমার নিয়ে গবেষণায় আরও অর্থায়নের দাবিতে প্রচারণায় যুক্ত হয়েছেন। তার মতে, এই রোগ সম্পর্কে আগে তিনি কিছুই জানতেন না, অথচ এটি অনেক মানুষকে আক্রান্ত করছে।
ব্রেইন টিউমার রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে প্রতিবছর প্রায় ৩ হাজার ২০০ জনের গ্লিওব্লাস্টোমা শনাক্ত হয়। সংস্থাটি বলছে, গত দুই দশকে এই রোগের চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
জশ ও কেলি ওয়েলশ সরকারের কাছে মস্তিষ্কের টিউমার গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিতব্য ওয়েলস ক্যানসার পরিকল্পনায় গবেষণা, উদ্ভাবন এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে রোগীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।



সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















