আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে—বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নতুনভাবে বিন্যস্ত হচ্ছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের রাজধানীগুলো ছিল বড় কূটনৈতিক আলোচনার প্রধান মঞ্চ, এখন সেখানে বেইজিংয়ের গুরুত্ব দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। বিশ্বের বড় বড় রাষ্ট্রনেতাদের ধারাবাহিক সফর কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনীতির অংশ নয়; এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তিত অগ্রাধিকারেরও প্রতিফলন।
গত কয়েক মাসে বিশ্বের প্রধান অর্থনীতি ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর নেতারা একের পর এক চীন সফর করেছেন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদেরও বেইজিংয়ে দেখা গেছে। একই সময়ে এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের সফরের ধারাবাহিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে—অনিশ্চয়তায় ভরা সময়ে অনেক দেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে আগ্রহী।
এই প্রবণতাকে শুধুমাত্র কূটনৈতিক সৌজন্য বলে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে অর্থনীতি, ভূরাজনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত হিসাব।
অর্থনৈতিক শক্তিই কূটনৈতিক আকর্ষণের ভিত্তি
ইতিহাস বলে, যে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী, তার কূটনৈতিক প্রভাবও সাধারণত বেশি হয়। আজকের চীনের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ঘটেনি। সাম্প্রতিক বাণিজ্য পরিসংখ্যান দেখায়, বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতি মন্থর হলেও চীনের আমদানি-রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন সময়ে এই প্রবৃদ্ধি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যখন বিশ্ব বাণিজ্যের সামগ্রিক সম্প্রসারণ অনেক কম গতিতে এগোচ্ছে।
চীন এখন শুধু উৎপাদনশীল শিল্পের কেন্দ্র নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভোক্তা বাজারও। ফলে বহুজাতিক কোম্পানি থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর রপ্তানিকারক—সবাই এই বাজারে প্রবেশ বা অবস্থান শক্তিশালী করতে আগ্রহী।
বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন নানা ধরনের সংশয় রয়েছে, তখন একটি বড় ও তুলনামূলক স্থিতিশীল বাজার আন্তর্জাতিক ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা দেয়। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাও এ কারণে চীনের ওপর নির্ভরশীলতা বজায় রেখেছে।
স্থিতিশীলতার মূল্য বেড়েছে
বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিবেশে সবচেয়ে দুর্লভ সম্পদ সম্ভবত পূর্বানুমানযোগ্যতা। নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন, বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং আঞ্চলিক সংঘাত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
এই প্রেক্ষাপটে চীনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার নীতিগত ধারাবাহিকতা। দেশটির বাজার, শিল্পভিত্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সম্পর্কে বহু দেশের ধারণা তুলনামূলকভাবে স্থির। বিদেশি সরকার ও ব্যবসায়িক মহল বিশ্বাস করে, স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে সেখানে নীতির নাটকীয় উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই পূর্বানুমানযোগ্যতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি মূল্যবান হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতির বাইরেও রয়েছে ভূরাজনীতির বাস্তবতা
তবে কেবল অর্থনৈতিক যুক্তি দিয়ে বর্তমান কূটনৈতিক সক্রিয়তার পুরো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনও শেষ হওয়ার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। ইউরোপ এই সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বহন করছে। অন্যদিকে ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব ঘটনার ফলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এমন পরিবেশে অনেক দেশ এমন অংশীদার খুঁজছে, যার সঙ্গে সম্পর্ক তাদের কৌশলগত বিকল্প বাড়াবে এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে কিছুটা ভারসাম্য এনে দেবে।
চীনের কূটনৈতিক অবস্থান এই বাস্তবতাকেই কাজে লাগাচ্ছে। সংলাপ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক উদ্যোগের ওপর জোর দিয়ে দেশটি নিজেকে এমন এক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়, যে সংঘাতের পরিবর্তে সমঝোতাকে গুরুত্ব দেয়।
দীর্ঘদিন ধরে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ, বৈশ্বিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সভ্যতা ও শাসনব্যবস্থা-সংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মাধ্যমে বেইজিং এমন একটি আন্তর্জাতিক কাঠামোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যেখানে পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা এবং যৌথ উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই নীতিগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু এগুলোর ধারাবাহিক প্রচার চীনের পররাষ্ট্রনীতির একটি সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য।
পরিবর্তনের যুগে ধারাবাহিকতার কৌশল
আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রূপান্তর এখন আর বিতর্কের বিষয় নয়। ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাচ্ছে, নতুন জোট গড়ে উঠছে এবং পুরোনো সম্পর্কগুলো নতুনভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের মধ্যে চীনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য সম্ভবত তার ধারাবাহিকতা। অন্য অনেক বড় শক্তির নীতিতে দ্রুত পরিবর্তন দেখা গেলেও বেইজিং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর জোর দিয়েছে। ফলে অনেক দেশের কাছে চীন এমন এক অংশীদারে পরিণত হয়েছে, যার সঙ্গে সম্পর্ক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলে মনে হয়।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে চীনের সব নীতি বা অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক ঐকমত্য রয়েছে। মানবাধিকার, প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে মতপার্থক্য এখনো বিদ্যমান। কিন্তু একই সঙ্গে বাস্তবতাও হলো, এসব মতভেদের মধ্যেও অধিকাংশ দেশ বেইজিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে আগ্রহী।
এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আধুনিক কূটনীতিতে আদর্শিক অবস্থানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আজ যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতা একের পর এক বেইজিংয়ে যাচ্ছেন, সেটি কেবল একটি রাজধানী সফর নয়। এটি এমন এক আন্তর্জাতিক বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে অস্থিরতার যুগে স্থিতিশীলতা নিজেই একটি কৌশলগত সম্পদ হয়ে উঠেছে। আর সেই সম্পদের কারণেই চীন ক্রমশ বৈশ্বিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে।
লি ওয়েনহান 


















