০৮:০৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
সারের সংকট শুধু কৃষির নয়, বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতিরও আয়না অস্থির বিশ্বের কূটনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু কেন হয়ে উঠছে চীন শিক্ষকদের আত্মত্যাগে নয়, ন্যায্য মর্যাদায় গড়ে ওঠে শিক্ষাব্যবস্থা প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকলেও দেশে ফিরবেন শেখ হাসিনা: এএফপিকে জানালেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব অর্থনীতির নতুন বিপদ: বাণিজ্য নয়, ভারসাম্যহীনতার গভীর সংকট ডেঙ্গুতে আরও ৩ মৃত্যু, চলতি বছরে প্রাণহানি ৫০; হাসপাতালে ভর্তি ১৪,৬৯০ আসামে বন্যায় মৃত বেড়ে ৭৫, ক্ষতিগ্রস্ত ১১ লাখের বেশি মানুষ একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা এখন জরুরি প্রয়োজনে তুলতে পারবেন ১০ লাখ টাকা নেপালে বাঘের সংখ্যা বেড়ে ৪২৯, ২০১০ সালের তুলনায় প্রায় চার গুণ কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ: মিরাজ শেখকে উদ্ধারে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চাইল আসক

সারের সংকট শুধু কৃষির নয়, বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতিরও আয়না

বিশ্বের খাদ্যব্যবস্থা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা হলো—যেখানে বীজ, জমি ও কৃষকের পরিশ্রমই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। আধুনিক কৃষি এমন এক উৎপাদন কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যার অন্যতম ভিত্তি কৃত্রিম সার। ফলে সার সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাতও শুধু কৃষি উৎপাদন নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার, ভূরাজনীতি এবং খাদ্যনিরাপত্তাকে একযোগে নাড়া দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা সেই বাস্তবতাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

বিশ্ববাজারে বাণিজ্য হওয়া সারের একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থা কতটা সীমিত কয়েকটি সরবরাহপথ ও জ্বালানিনির্ভর উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে উৎপাদিত নাইট্রোজেন সার আজ বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনের অপরিহার্য উপাদান। গত কয়েক দশকে এর ব্যবহার যে হারে বেড়েছে, তা দেখায় কৃষি ক্রমেই বহিরাগত উপকরণনির্ভর হয়ে উঠেছে।

এই সংকটের মুখে অধিকাংশ রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া একই ধরনের। তারা নির্ভরতা কমানোর পথ খোঁজে না; বরং যেকোনোভাবে নিজেদের জন্য পর্যাপ্ত সার নিশ্চিত করতে চায়। এতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয় এবং যার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা বেশি, সে তুলনামূলক নিরাপদ থাকে। বিপরীতে দরিদ্র দেশগুলোকে একই সঙ্গে উচ্চমূল্য, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বাধ্যবাধকতার মধ্যে টিকে থাকতে হয়। ফলে সংকট সাময়িকভাবে সামাল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে বৈষম্য আরও গভীর হয়।

এই বাস্তবতা নতুন নয়। উনিশ শতকে ইউরোপীয় কৃষির চাহিদা মেটাতে লাতিন আমেরিকার গুয়ানো ও চিলির নাইট্রেটকে কেন্দ্র করে যে নিষ্কাশনমূলক অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল, সেটিই আধুনিক সারের ইতিহাসের ভিত্তি। পরে কৃত্রিম নাইট্রোজেন আবিষ্কারের মাধ্যমে কৃষি, শিল্প ও সামরিক শক্তির মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। যুদ্ধের সময় বিস্ফোরক তৈরির জন্য যে রাসায়নিক দরকার, শান্তিকালে সেই একই উপাদান খাদ্য উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। অর্থাৎ কৃষি কখনোই কেবল কৃষির বিষয় ছিল না; এটি সবসময়ই রাষ্ট্রশক্তি ও ভূরাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।

১৯৭৩-৭৪ সালের তেল সংকট এই সম্পর্ককে আরও স্পষ্ট করে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সারের দামও দ্রুত বেড়ে যায়। আধুনিক কৃষি যে জীবাশ্ম জ্বালানির সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত, সেই সত্য তখন নির্মমভাবে প্রকাশিত হয়। একই সময়ে বৈশ্বিক শস্যবাজারেও অস্থিরতা দেখা দেয়। উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন দেশ কৃষিনীতি বদলে ফেলে, নতুন জমি চাষে আনে এবং খাদ্য উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেয়। কিন্তু সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিল আরও বেশি সার ব্যবহার, নির্ভরতা কমানো নয়।

আফ্রিকার বহু দেশও একই সময়ে কৃষকদের সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সার বিতরণ ও ভর্তুকি কর্মসূচি চালু করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল উৎপাদন বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা থেকে কৃষকদের রক্ষা করা। কিন্তু পরে কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচির চাপে এসব ব্যবস্থার বড় অংশ ভেঙে যায়। তবু একটি বিষয় অপরিবর্তিত থাকে—কৃষির উন্নয়ন বলতে সারের ব্যবহার বাড়ানোই যেন একমাত্র পথ হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে।

পরবর্তী সময়ে আফ্রিকায় তথাকথিত নতুন সবুজ বিপ্লবের উদ্যোগও মূলত একই দর্শন অনুসরণ করে। স্থানীয় সার উৎপাদন, ভর্তুকি এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে রাসায়নিক সারের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। অথচ বহু ক্ষেত্রে বহু ফসলভিত্তিক ও জৈব উপাদাননির্ভর কৃষি ব্যবস্থা স্থানীয় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

বর্তমান সংকট আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও জটিল। এটি শুধু একটি পণ্যের ঘাটতি নয়; বরং জ্বালানি বাজার, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং কৃষি উৎপাদনের পারস্পরিক নির্ভরতার সম্মিলিত ফল। ফলে এর অভিঘাতও সমানভাবে পড়ছে না। বড় কৃষি করপোরেশন মূল্যবৃদ্ধি কিছুটা সহ্য করতে পারলেও ক্ষুদ্র কৃষকের সেই সক্ষমতা নেই। বিশেষ করে সাব-সাহারান আফ্রিকায়, যেখানে খাদ্য উৎপাদনের বড় অংশই ক্ষুদ্র কৃষকদের হাতে, সেখানে সারের ঘাটতি সরাসরি খাদ্যনিরাপত্তার সংকটে রূপ নিতে পারে।

রাষ্ট্রগুলোর প্রতিক্রিয়াও ক্রমশ প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে। কোথাও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, কোথাও উৎপাদনে ভর্তুকি, আবার কোথাও আমদানি নীতিতে পরিবর্তন—সব উদ্যোগের লক্ষ্য নিজ দেশের সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু এই জাতীয়তাবাদী পদক্ষেপগুলো বৈশ্বিক বাজারকে আরও সংকুচিত করে এবং অন্য দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তোলে।

একই সময়ে আরেকটি প্রবণতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে বিভিন্ন দেশ দ্রুত জৈবজ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে চাইছে। ভুট্টা, আখ কিংবা তেলপাম থেকে জ্বালানি তৈরির এই নীতিকে অনেক সময় সবুজ রূপান্তরের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এর অর্থ হলো খাদ্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত জমির একটি অংশ জ্বালানির জন্য বরাদ্দ হওয়া। ফলে খাদ্য ও জ্বালানির মধ্যে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, যা সারের চাহিদা কমানোর বদলে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এ কারণে বর্তমান সংকটকে সাময়িক সরবরাহ সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে ভুল হবে। এটি এমন এক বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করছে, যার মূল ভিত্তি হলো মুনাফা, ক্রমাগত সম্প্রসারণ এবং বিপুল পরিমাণ বহিরাগত উপকরণের ব্যবহার। এই কাঠামো পরিবর্তন না হলে একই ধরনের সংকট ভবিষ্যতেও ফিরে আসবে।

স্বল্পমেয়াদে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, দরিদ্র দেশগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা এবং খাদ্যশস্যের জমিকে জৈবজ্বালানির দিকে সরিয়ে নেওয়া ঠেকানো জরুরি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্য উৎপাদন ও ভোগ বৃদ্ধি, প্রাণিখাদ্য উৎপাদনে অতিরিক্ত সারের ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশসম্মত কৃষি পদ্ধতির প্রসার সারনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়িয়ে বা সামান্য বিকল্প ব্যবহার করে এই সংকটের মূল কারণ দূর করা সম্ভব নয়।

অতীতের মতো বর্তমানের সার সংকটও আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। আমরা কি আবারও একই নির্ভরতাকে আরও শক্তিশালী করার পথ বেছে নেব, নাকি এমন একটি খাদ্যব্যবস্থার দিকে এগোব, যেখানে উৎপাদনের স্থিতিশীলতা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং বৈশ্বিক ন্যায্যতা সমান গুরুত্ব পাবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা কতটা টেকসই হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সারের সংকট শুধু কৃষির নয়, বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতিরও আয়না

সারের সংকট শুধু কৃষির নয়, বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতিরও আয়না

০৮:০০:৩৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

বিশ্বের খাদ্যব্যবস্থা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা হলো—যেখানে বীজ, জমি ও কৃষকের পরিশ্রমই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। আধুনিক কৃষি এমন এক উৎপাদন কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যার অন্যতম ভিত্তি কৃত্রিম সার। ফলে সার সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাতও শুধু কৃষি উৎপাদন নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার, ভূরাজনীতি এবং খাদ্যনিরাপত্তাকে একযোগে নাড়া দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা সেই বাস্তবতাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

বিশ্ববাজারে বাণিজ্য হওয়া সারের একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থা কতটা সীমিত কয়েকটি সরবরাহপথ ও জ্বালানিনির্ভর উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে উৎপাদিত নাইট্রোজেন সার আজ বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনের অপরিহার্য উপাদান। গত কয়েক দশকে এর ব্যবহার যে হারে বেড়েছে, তা দেখায় কৃষি ক্রমেই বহিরাগত উপকরণনির্ভর হয়ে উঠেছে।

এই সংকটের মুখে অধিকাংশ রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া একই ধরনের। তারা নির্ভরতা কমানোর পথ খোঁজে না; বরং যেকোনোভাবে নিজেদের জন্য পর্যাপ্ত সার নিশ্চিত করতে চায়। এতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয় এবং যার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা বেশি, সে তুলনামূলক নিরাপদ থাকে। বিপরীতে দরিদ্র দেশগুলোকে একই সঙ্গে উচ্চমূল্য, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বাধ্যবাধকতার মধ্যে টিকে থাকতে হয়। ফলে সংকট সাময়িকভাবে সামাল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে বৈষম্য আরও গভীর হয়।

এই বাস্তবতা নতুন নয়। উনিশ শতকে ইউরোপীয় কৃষির চাহিদা মেটাতে লাতিন আমেরিকার গুয়ানো ও চিলির নাইট্রেটকে কেন্দ্র করে যে নিষ্কাশনমূলক অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল, সেটিই আধুনিক সারের ইতিহাসের ভিত্তি। পরে কৃত্রিম নাইট্রোজেন আবিষ্কারের মাধ্যমে কৃষি, শিল্প ও সামরিক শক্তির মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। যুদ্ধের সময় বিস্ফোরক তৈরির জন্য যে রাসায়নিক দরকার, শান্তিকালে সেই একই উপাদান খাদ্য উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। অর্থাৎ কৃষি কখনোই কেবল কৃষির বিষয় ছিল না; এটি সবসময়ই রাষ্ট্রশক্তি ও ভূরাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।

১৯৭৩-৭৪ সালের তেল সংকট এই সম্পর্ককে আরও স্পষ্ট করে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সারের দামও দ্রুত বেড়ে যায়। আধুনিক কৃষি যে জীবাশ্ম জ্বালানির সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত, সেই সত্য তখন নির্মমভাবে প্রকাশিত হয়। একই সময়ে বৈশ্বিক শস্যবাজারেও অস্থিরতা দেখা দেয়। উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন দেশ কৃষিনীতি বদলে ফেলে, নতুন জমি চাষে আনে এবং খাদ্য উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেয়। কিন্তু সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিল আরও বেশি সার ব্যবহার, নির্ভরতা কমানো নয়।

আফ্রিকার বহু দেশও একই সময়ে কৃষকদের সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সার বিতরণ ও ভর্তুকি কর্মসূচি চালু করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল উৎপাদন বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা থেকে কৃষকদের রক্ষা করা। কিন্তু পরে কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচির চাপে এসব ব্যবস্থার বড় অংশ ভেঙে যায়। তবু একটি বিষয় অপরিবর্তিত থাকে—কৃষির উন্নয়ন বলতে সারের ব্যবহার বাড়ানোই যেন একমাত্র পথ হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে।

পরবর্তী সময়ে আফ্রিকায় তথাকথিত নতুন সবুজ বিপ্লবের উদ্যোগও মূলত একই দর্শন অনুসরণ করে। স্থানীয় সার উৎপাদন, ভর্তুকি এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে রাসায়নিক সারের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। অথচ বহু ক্ষেত্রে বহু ফসলভিত্তিক ও জৈব উপাদাননির্ভর কৃষি ব্যবস্থা স্থানীয় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

বর্তমান সংকট আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও জটিল। এটি শুধু একটি পণ্যের ঘাটতি নয়; বরং জ্বালানি বাজার, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং কৃষি উৎপাদনের পারস্পরিক নির্ভরতার সম্মিলিত ফল। ফলে এর অভিঘাতও সমানভাবে পড়ছে না। বড় কৃষি করপোরেশন মূল্যবৃদ্ধি কিছুটা সহ্য করতে পারলেও ক্ষুদ্র কৃষকের সেই সক্ষমতা নেই। বিশেষ করে সাব-সাহারান আফ্রিকায়, যেখানে খাদ্য উৎপাদনের বড় অংশই ক্ষুদ্র কৃষকদের হাতে, সেখানে সারের ঘাটতি সরাসরি খাদ্যনিরাপত্তার সংকটে রূপ নিতে পারে।

রাষ্ট্রগুলোর প্রতিক্রিয়াও ক্রমশ প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে। কোথাও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, কোথাও উৎপাদনে ভর্তুকি, আবার কোথাও আমদানি নীতিতে পরিবর্তন—সব উদ্যোগের লক্ষ্য নিজ দেশের সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু এই জাতীয়তাবাদী পদক্ষেপগুলো বৈশ্বিক বাজারকে আরও সংকুচিত করে এবং অন্য দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তোলে।

একই সময়ে আরেকটি প্রবণতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে বিভিন্ন দেশ দ্রুত জৈবজ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে চাইছে। ভুট্টা, আখ কিংবা তেলপাম থেকে জ্বালানি তৈরির এই নীতিকে অনেক সময় সবুজ রূপান্তরের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এর অর্থ হলো খাদ্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত জমির একটি অংশ জ্বালানির জন্য বরাদ্দ হওয়া। ফলে খাদ্য ও জ্বালানির মধ্যে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, যা সারের চাহিদা কমানোর বদলে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এ কারণে বর্তমান সংকটকে সাময়িক সরবরাহ সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে ভুল হবে। এটি এমন এক বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করছে, যার মূল ভিত্তি হলো মুনাফা, ক্রমাগত সম্প্রসারণ এবং বিপুল পরিমাণ বহিরাগত উপকরণের ব্যবহার। এই কাঠামো পরিবর্তন না হলে একই ধরনের সংকট ভবিষ্যতেও ফিরে আসবে।

স্বল্পমেয়াদে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, দরিদ্র দেশগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা এবং খাদ্যশস্যের জমিকে জৈবজ্বালানির দিকে সরিয়ে নেওয়া ঠেকানো জরুরি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্য উৎপাদন ও ভোগ বৃদ্ধি, প্রাণিখাদ্য উৎপাদনে অতিরিক্ত সারের ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশসম্মত কৃষি পদ্ধতির প্রসার সারনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়িয়ে বা সামান্য বিকল্প ব্যবহার করে এই সংকটের মূল কারণ দূর করা সম্ভব নয়।

অতীতের মতো বর্তমানের সার সংকটও আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। আমরা কি আবারও একই নির্ভরতাকে আরও শক্তিশালী করার পথ বেছে নেব, নাকি এমন একটি খাদ্যব্যবস্থার দিকে এগোব, যেখানে উৎপাদনের স্থিতিশীলতা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং বৈশ্বিক ন্যায্যতা সমান গুরুত্ব পাবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা কতটা টেকসই হবে।