প্রায় আট দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে ঘিরে অসংখ্য যুদ্ধ, শান্তি উদ্যোগ, কূটনৈতিক সমঝোতা এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়েছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে—ফিলিস্তিন কি একটি পূর্ণাঙ্গ, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বাস্তবতা ক্রমেই একটি দেশের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করছে: সৌদি আরব।
রিয়াদ এখন আর শুধু আরব বিশ্বের একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র, যার অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামোকে আমূল বদলে দিতে পারে। দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত বৈশ্বিক জোটে সৌদি আরবের সক্রিয় ভূমিকা সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে।
অনেকেই সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ককে একটি নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনা হিসেবে দেখলেও রিয়াদের দৃষ্টিভঙ্গি মোটেই নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে সৌদি নীতির কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক ধারণা—ইসরায়েলের সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র একই রাজনৈতিক সমাধানের অবিচ্ছেদ্য দুটি অংশ। একটিকে অন্যটির বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সমান্তরালভাবে বাস্তবায়নযোগ্য শর্ত হিসেবে দেখা হয়েছে।
এই নীতির শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় বাদশাহ ফয়সালের সময়ে, যখন ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সৌদি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে বাদশাহ ফাহদের শান্তি প্রস্তাব এবং পরে আরব শান্তি উদ্যোগ সেই একই দর্শনকে আরও সুসংগঠিত কূটনৈতিক রূপ দেয়। মূল বার্তা ছিল স্পষ্ট—১৯৬৭ সালের অধিকৃত অঞ্চল থেকে ইসরায়েলের প্রত্যাহার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিনিময়ে আরব বিশ্বের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সম্ভব।
আজকের সৌদি নেতৃত্ব সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার উত্তরাধিকার বহন করছে। ফলে তাদের সামনে প্রশ্নটি নতুন কোনো নীতিগত বিতর্ক নয়; বরং বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিবেশ সেই দীর্ঘদিনের শর্ত পূরণের উপযোগী হয়েছে কি না, সেটিই এখন বিবেচ্য।
সৌদি অবস্থানকে কেবল পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। দেশটির বাদশাহ একই সঙ্গে ইসলামের দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম। ফলে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত শুধু রাজনৈতিক নয়, ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। এমন একটি পদক্ষেপ ভবিষ্যতের কোনো প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করতে পারে না; এর জন্য দৃশ্যমান ও অপরিবর্তনীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রয়োজন। সেই বাস্তবতা হলো একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা।
২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, পরে মরক্কো ও সুদান ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে দেখিয়ে দেয় যে ফিলিস্তিন প্রশ্নের সমাধান ছাড়াও আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক এগোতে পারে। কিন্তু এই অগ্রগতি ফিলিস্তিন সংকটের রাজনৈতিক সমাধান দেয়নি। বরং এটি প্রমাণ করেছে যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সম্ভব হলেও আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অর্জন করা ভিন্ন বিষয়।
এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসন ধারাবাহিকভাবে সৌদি আরবকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুপস্থিত অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। রিয়াদের অংশগ্রহণ ছাড়া আঞ্চলিক কূটনীতি এগোতে পারে, কিন্তু তা পূর্ণ কৌশলগত অর্থ পায় না।
৭ অক্টোবরের পর গাজা যুদ্ধ পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। যুদ্ধ, যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টা এবং পুনর্গঠনের আলোচনা একটি নতুন কূটনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তবে এগুলো রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প নয়; বরং সম্ভাব্য সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র প্রস্তুত করার উদ্যোগ মাত্র। সৌদি আরবের দৃষ্টিতে সেই সমাধানের কেন্দ্রে এখনও একই শর্ত বিদ্যমান—স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কার্যকর ও স্থায়ী প্রতিষ্ঠা।
রিয়াদের গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় মর্যাদার কারণে নয়। আরব বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে সৌদি আরব আঞ্চলিক অর্থনৈতিক শক্তির প্রধান কেন্দ্র। জি-২০-এর একমাত্র আরব সদস্য, বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি শক্তি এবং শীর্ষ অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক হিসেবে দেশটির সিদ্ধান্তের প্রভাব দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সীমা ছাড়িয়ে সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
সেই প্রভাবের রাজনৈতিক প্রতিফলনও সুদূরপ্রসারী হতে পারে। লেবানন, সিরিয়া, ইরাক কিংবা আলজেরিয়ার মতো দেশ এখনও ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি। প্রতিটি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত অবশ্যই সার্বভৌম। কিন্তু যদি সৌদি আরব এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছায়, যার ভিত্তি হবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র, তাহলে তাদের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও নতুন বাস্তবতায় পুনর্বিবেচনার মুখে পড়বে।
একই যুক্তি আরব বিশ্বের বাইরেও প্রযোজ্য। পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মতো প্রভাবশালী মুসলিম দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিন প্রশ্নের নিষ্পত্তি না হওয়ায় ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি। যদি ইসলামের দুই পবিত্র মসজিদের খাদেমের নেতৃত্বে সৌদি আরব এমন একটি সমঝোতা অনুমোদন করে, যার সঙ্গে বাস্তবিক অর্থে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে এসব দেশের ওপরও নিজেদের অবস্থান নতুনভাবে মূল্যায়নের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।
এই কারণেই সৌদি আরবের সম্ভাব্য ভূমিকা আব্রাহাম চুক্তির সম্প্রসারণের মতো আরেকটি কূটনৈতিক ঘটনা নয়। এর তাৎপর্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি আরব ও মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় বাস্তবতাকে একযোগে প্রভাবিত করার সক্ষমতা রাখে।
অবশ্য এই পথ এখনও অনিশ্চয়তায় পূর্ণ। ইসরায়েল, ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রত্যেকেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রিয়াদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়া নতুন যুগে প্রবেশ করবে, নাকি বহু দশকের অচলাবস্থাই আরও দীর্ঘায়িত হবে।
সৌদি নীতির মূল দর্শন বরাবরই একই থেকেছে—ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ইসরায়েলের স্বীকৃতি কোনো ধারাবাহিক ধাপ নয়; এগুলো একই রাজনৈতিক সমঝোতার অবিচ্ছেদ্য দুই স্তম্ভ। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির স্থায়ী বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে এই বাস্তবতাই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ।
নওয়াফ ওবায়েদ 


















