০৩:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রে সাইক্লোস্পোরা সংক্রমণ ঘিরে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ঝড়, সামাজিক মাধ্যমে ছড়াচ্ছে রাজনৈতিক বিতর্ক মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের নতুন বিস্তার: ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলা, পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও তেলবাজারে অস্থিরতা চীনের উত্থান বুঝতে পশ্চিমের ব্যর্থতা: শি জিনপিংয়ের চিন্তাধারাকে কেন গুরুত্ব দেওয়া উচিত ব্রিটেনে নতুন অর্থনৈতিক মডেল নিয়ে জোর বিতর্ক, সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পথে হাঁটছেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম গৃহহীন অসহায় পুরুষদের টার্গেট করেই হত্যাকাণ্ড, আদালতে উঠে এলো সিরিয়াল কিলারের শিকারদের করুণ জীবন চ্যাটজিপিটির জন্য একাধিক ডিভাইস আনছে ওপেনএআই, শিগগিরই আসছে নতুন হার্ডওয়্যার রাশিয়াবিরোধী নিষেধাজ্ঞা বিল নিয়ে ট্রাম্পের নতুন মন্তব্য, ভারতের ওপর শতভাগ শুল্কের ঝুঁকি বহাল রাতে হঠাৎ চিৎকার, অস্বাভাবিক আচরণ—‘নাইট টেরর’ কেন হয়, কারা বেশি ঝুঁকিতে ১৫ বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ: শিশু সুরক্ষার নামে কি বদলে যাচ্ছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভিত্তি? বিক্ষোভের বিশৃঙ্খলা, আমলাতন্ত্রের জবাবদিহি ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি

১৫ বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ: শিশু সুরক্ষার নামে কি বদলে যাচ্ছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভিত্তি?

শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করা এখন বিশ্বের বহু দেশের নীতিনির্ধারকদের অন্যতম বড় উদ্বেগ। অ্যালগরিদমনির্ভর প্ল্যাটফর্মগুলো কীভাবে কিশোরদের মনোযোগ, আচরণ এবং মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে গবেষণা ও জনআলোচনা দীর্ঘদিনের। ফলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি নতুন নয়।

কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। শিশুদের সুরক্ষার জন্য যে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেই ব্যবস্থাই যদি নাগরিকদের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের পরিবেশ বদলে দেয়, তবে কি সেই মূল্য দেওয়া উচিত? কোনো আইনকে শুধু তার ঘোষিত উদ্দেশ্য দিয়ে নয়, বরং তা বাস্তবে কী ধরনের নতুন ক্ষমতা রাষ্ট্র ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেয়, সেটিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ফ্রান্সে ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সাম্প্রতিক আইন সেই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আইনটির লক্ষ্য সীমিত—একটি নির্দিষ্ট বয়সের শিশুদের সুরক্ষা। কিন্তু সেটি কার্যকর করতে যে পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়েছে, তার প্রভাব পড়তে পারে প্রায় সব ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ওপর।

শিশুদের জন্য আইন, কিন্তু সবার জন্য যাচাই

কোনো প্ল্যাটফর্মে ১৫ বছরের নিচের ব্যবহারকারীদের প্রবেশ বন্ধ করতে হলে শুধু শিশুদের নয়, বরং প্রত্যেক নতুন ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই করতে হবে। অর্থাৎ যে নিয়ম একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য প্রণীত, সেটি কার্যকর করতে পুরো সমাজকেই একটি নতুন যাচাই ব্যবস্থার অধীন হতে হবে।

French lawmakers approve ban on social media for kids under 15 | PBS News

ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর কেবল বিনোদনের প্ল্যাটফর্ম নয়। এগুলো রাজনৈতিক বিতর্ক, সামাজিক আন্দোলন, পেশাগত যোগাযোগ, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। ফলে সেখানে প্রবেশের আগে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের বাধ্যবাধকতা কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নও।

কোনো স্বাধীন সমাজে সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় যে মানুষ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবে, যদি না আইনের সুস্পষ্ট ব্যতিক্রম প্রযোজ্য হয়। কিন্তু যদি মতপ্রকাশের আগে নাগরিককে নিজের বয়স প্রমাণ করতে হয়, তাহলে স্বাধীনতার চরিত্রই পরিবর্তিত হয়।

গোপনীয়তা কি আর আগের মতো থাকবে?

ইন্টারনেটে পরিচয় গোপন রেখে মতপ্রকাশের বিষয়টি বহু গণতান্ত্রিক দেশে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মূল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ অনেক ক্ষেত্রে পরিচয় প্রকাশের ভয় মানুষকে মত প্রকাশ থেকে বিরত রাখে।

মানবাধিকার আদালতগুলোর বিভিন্ন রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, অনলাইন অজ্ঞাতপরিচয় কেবল ব্যক্তিগত সুবিধা নয়; এটি অনেক সময় প্রতিশোধ, হয়রানি বা সামাজিক চাপ থেকে নাগরিককে সুরক্ষা দেয়। ফলে এটি মতের বহুমাত্রিকতা ও গণতান্ত্রিক বিতর্ককে শক্তিশালী করে।

বয়স যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা সেই পরিবেশে একটি নতুন স্তরের নজরদারি যুক্ত করতে পারে। সরকার বলছে, এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে যাতে বয়স যাচাইকারী সংস্থা জানবে না ব্যবহারকারী কোন সাইটে যাচ্ছে, আবার প্ল্যাটফর্মও ব্যবহারকারীর প্রকৃত পরিচয় জানতে পারবে না। কাগজে-কলমে এটি আকর্ষণীয় সমাধান।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রযুক্তি কি বাস্তবে পরিপক্ব?

এখনও ইউরোপজুড়ে এমন বয়স যাচাই ব্যবস্থা পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। কোটি কোটি মানুষের ব্যবহারের জন্য কার্যকর, নিরাপদ এবং দীর্ঘমেয়াদে গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে সক্ষম—এমন প্রমাণ এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রযুক্তির সূচনালগ্নে যে গোপনীয়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, বাস্তব ব্যবহারের সময় তা সবসময় একইভাবে টিকে থাকে না।

Ban, regulate or reform? Social media & under-15s – The India question |  India News - The Times of India

সমস্যার মূল কোথায়?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতির বড় অংশই প্ল্যাটফর্মের নকশা ও অ্যালগরিদমের সঙ্গে সম্পর্কিত। ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখার জন্য তৈরি সুপারিশ ব্যবস্থা, অবিরাম কনটেন্ট সরবরাহ এবং আসক্তিমূলক নকশাই শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে—সমস্যা যদি প্ল্যাটফর্মের নকশায় হয়, তবে সমাধান কি ব্যবহারকারীর ওপর নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপে, নাকি প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণে?

কম সীমাবদ্ধ বিকল্পও রয়েছে। সুপারিশ অ্যালগরিদমে পরিবর্তন, শিশুদের জন্য আলাদা নিরাপত্তা মানদণ্ড, ডিজাইন সংস্কার, ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা অভিভাবকের তত্ত্বাবধান—এসব পথ নিয়ে আগেও আলোচনা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞাই একমাত্র সমাধান, এমন সিদ্ধান্ত এখনও সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

সংজ্ঞাহীন আইনের ঝুঁকি

আরও একটি মৌলিক সমস্যা হলো, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম” বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে?

আজকের ডিজিটাল পরিবেশে ভিডিও প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন গেম, মেসেজিং অ্যাপ, পাবলিক চ্যানেল কিংবা কমিউনিটিভিত্তিক বিভিন্ন সেবার সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। যদি আইন নিজেই স্পষ্টভাবে নির্ধারণ না করে কোন সেবা এর আওতায় পড়বে, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত পরে প্রশাসন বা আদালতের ওপর নির্ভর করবে।

এতে আইনি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। কারণ নাগরিকের স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণের দায়িত্ব আইনপ্রণেতার, পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীর নয়।

Protecting Children from Social Media | National Affairs

অভিভাবকের ভূমিকা কোথায়?

শিশুর বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তার স্বাধীনতার পরিধিও ধীরে ধীরে বাড়ে। আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার কাঠামোও এই বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দেয়। সেখানে শিশুর তথ্য পাওয়ার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি অভিভাবকের দায়িত্বও রয়েছে সেই স্বাধীনতার সঠিক ব্যবহার শেখানো।

কিন্তু যদি আইন সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং কোনো পর্যায়েই অভিভাবকের সিদ্ধান্তের সুযোগ না রাখে, তাহলে শিশু ও অভিভাবক—উভয়ের ভূমিকাই সংকুচিত হয়ে যায়। এতে রাষ্ট্র এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, যা পারিবারিক দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত বিকাশের ক্ষেত্রকে অতিক্রম করতে পারে।

একটি নীতিগত বৈপরীত্য

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে ১৫ বছর বয়সকে গুরুত্বপূর্ণ সীমা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল কিশোরদের ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর তাদের অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

কিন্তু এখন যদি কয়েকজন অপ্রাপ্তবয়স্ককে সুরক্ষা দিতে কোটি কোটি মানুষের বয়স সম্পর্কিত তথ্য নিয়মিত যাচাই ও সংরক্ষণের অবকাঠামো গড়ে তুলতে হয়, তাহলে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার সেই নীতির সঙ্গেই একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি হয়।

গণতন্ত্রে সতর্কতার প্রয়োজন

UK Politicians Continue to Miss the Point in Latest Social Media Ban  Proposal | Electronic Frontier Foundation

কেউই দাবি করছেন না যে শিশুদের অনলাইন ঝুঁকি উপেক্ষা করা উচিত। বরং প্রশ্ন হলো, সেই সুরক্ষার উপায় কী হবে।

গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাধীনতার ওপর নতুন শর্ত আরোপের আগে প্রমাণ করতে হয় যে এর চেয়ে কম সীমাবদ্ধ কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। কারণ একবার নাগরিক স্বাধীনতার সঙ্গে পরিচয় যাচাই, তথ্য সংগ্রহ বা নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে গেলে, তা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত ব্যবহারের পথও খুলে দিতে পারে।

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে যদি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অনলাইন গোপনীয়তা এবং নাগরিক অধিকারের মৌলিক কাঠামোই নীরবে বদলে যেতে শুরু করে, তবে সেই পরিবর্তনকে সাময়িক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করাই হবে বিচক্ষণতার পরিচয়।

লেখক: ব্রুনেসেন বের্ত্রাঁ (Brunessen Bertrand), জন আইন বিভাগের অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব রেন; ডেটা গভর্ন্যান্স (DataGouv) বিষয়ক জ্যঁ মোনে চেয়ারধারী।

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রে সাইক্লোস্পোরা সংক্রমণ ঘিরে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ঝড়, সামাজিক মাধ্যমে ছড়াচ্ছে রাজনৈতিক বিতর্ক

১৫ বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ: শিশু সুরক্ষার নামে কি বদলে যাচ্ছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভিত্তি?

০১:৪১:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করা এখন বিশ্বের বহু দেশের নীতিনির্ধারকদের অন্যতম বড় উদ্বেগ। অ্যালগরিদমনির্ভর প্ল্যাটফর্মগুলো কীভাবে কিশোরদের মনোযোগ, আচরণ এবং মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে গবেষণা ও জনআলোচনা দীর্ঘদিনের। ফলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি নতুন নয়।

কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। শিশুদের সুরক্ষার জন্য যে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেই ব্যবস্থাই যদি নাগরিকদের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের পরিবেশ বদলে দেয়, তবে কি সেই মূল্য দেওয়া উচিত? কোনো আইনকে শুধু তার ঘোষিত উদ্দেশ্য দিয়ে নয়, বরং তা বাস্তবে কী ধরনের নতুন ক্ষমতা রাষ্ট্র ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেয়, সেটিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ফ্রান্সে ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সাম্প্রতিক আইন সেই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আইনটির লক্ষ্য সীমিত—একটি নির্দিষ্ট বয়সের শিশুদের সুরক্ষা। কিন্তু সেটি কার্যকর করতে যে পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়েছে, তার প্রভাব পড়তে পারে প্রায় সব ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ওপর।

শিশুদের জন্য আইন, কিন্তু সবার জন্য যাচাই

কোনো প্ল্যাটফর্মে ১৫ বছরের নিচের ব্যবহারকারীদের প্রবেশ বন্ধ করতে হলে শুধু শিশুদের নয়, বরং প্রত্যেক নতুন ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই করতে হবে। অর্থাৎ যে নিয়ম একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য প্রণীত, সেটি কার্যকর করতে পুরো সমাজকেই একটি নতুন যাচাই ব্যবস্থার অধীন হতে হবে।

French lawmakers approve ban on social media for kids under 15 | PBS News

ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর কেবল বিনোদনের প্ল্যাটফর্ম নয়। এগুলো রাজনৈতিক বিতর্ক, সামাজিক আন্দোলন, পেশাগত যোগাযোগ, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। ফলে সেখানে প্রবেশের আগে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের বাধ্যবাধকতা কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নও।

কোনো স্বাধীন সমাজে সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় যে মানুষ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবে, যদি না আইনের সুস্পষ্ট ব্যতিক্রম প্রযোজ্য হয়। কিন্তু যদি মতপ্রকাশের আগে নাগরিককে নিজের বয়স প্রমাণ করতে হয়, তাহলে স্বাধীনতার চরিত্রই পরিবর্তিত হয়।

গোপনীয়তা কি আর আগের মতো থাকবে?

ইন্টারনেটে পরিচয় গোপন রেখে মতপ্রকাশের বিষয়টি বহু গণতান্ত্রিক দেশে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মূল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ অনেক ক্ষেত্রে পরিচয় প্রকাশের ভয় মানুষকে মত প্রকাশ থেকে বিরত রাখে।

মানবাধিকার আদালতগুলোর বিভিন্ন রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, অনলাইন অজ্ঞাতপরিচয় কেবল ব্যক্তিগত সুবিধা নয়; এটি অনেক সময় প্রতিশোধ, হয়রানি বা সামাজিক চাপ থেকে নাগরিককে সুরক্ষা দেয়। ফলে এটি মতের বহুমাত্রিকতা ও গণতান্ত্রিক বিতর্ককে শক্তিশালী করে।

বয়স যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা সেই পরিবেশে একটি নতুন স্তরের নজরদারি যুক্ত করতে পারে। সরকার বলছে, এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে যাতে বয়স যাচাইকারী সংস্থা জানবে না ব্যবহারকারী কোন সাইটে যাচ্ছে, আবার প্ল্যাটফর্মও ব্যবহারকারীর প্রকৃত পরিচয় জানতে পারবে না। কাগজে-কলমে এটি আকর্ষণীয় সমাধান।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রযুক্তি কি বাস্তবে পরিপক্ব?

এখনও ইউরোপজুড়ে এমন বয়স যাচাই ব্যবস্থা পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। কোটি কোটি মানুষের ব্যবহারের জন্য কার্যকর, নিরাপদ এবং দীর্ঘমেয়াদে গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে সক্ষম—এমন প্রমাণ এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রযুক্তির সূচনালগ্নে যে গোপনীয়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, বাস্তব ব্যবহারের সময় তা সবসময় একইভাবে টিকে থাকে না।

Ban, regulate or reform? Social media & under-15s – The India question |  India News - The Times of India

সমস্যার মূল কোথায়?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতির বড় অংশই প্ল্যাটফর্মের নকশা ও অ্যালগরিদমের সঙ্গে সম্পর্কিত। ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখার জন্য তৈরি সুপারিশ ব্যবস্থা, অবিরাম কনটেন্ট সরবরাহ এবং আসক্তিমূলক নকশাই শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে—সমস্যা যদি প্ল্যাটফর্মের নকশায় হয়, তবে সমাধান কি ব্যবহারকারীর ওপর নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপে, নাকি প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণে?

কম সীমাবদ্ধ বিকল্পও রয়েছে। সুপারিশ অ্যালগরিদমে পরিবর্তন, শিশুদের জন্য আলাদা নিরাপত্তা মানদণ্ড, ডিজাইন সংস্কার, ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা অভিভাবকের তত্ত্বাবধান—এসব পথ নিয়ে আগেও আলোচনা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞাই একমাত্র সমাধান, এমন সিদ্ধান্ত এখনও সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

সংজ্ঞাহীন আইনের ঝুঁকি

আরও একটি মৌলিক সমস্যা হলো, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম” বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে?

আজকের ডিজিটাল পরিবেশে ভিডিও প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন গেম, মেসেজিং অ্যাপ, পাবলিক চ্যানেল কিংবা কমিউনিটিভিত্তিক বিভিন্ন সেবার সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। যদি আইন নিজেই স্পষ্টভাবে নির্ধারণ না করে কোন সেবা এর আওতায় পড়বে, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত পরে প্রশাসন বা আদালতের ওপর নির্ভর করবে।

এতে আইনি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। কারণ নাগরিকের স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণের দায়িত্ব আইনপ্রণেতার, পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীর নয়।

Protecting Children from Social Media | National Affairs

অভিভাবকের ভূমিকা কোথায়?

শিশুর বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তার স্বাধীনতার পরিধিও ধীরে ধীরে বাড়ে। আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার কাঠামোও এই বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দেয়। সেখানে শিশুর তথ্য পাওয়ার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি অভিভাবকের দায়িত্বও রয়েছে সেই স্বাধীনতার সঠিক ব্যবহার শেখানো।

কিন্তু যদি আইন সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং কোনো পর্যায়েই অভিভাবকের সিদ্ধান্তের সুযোগ না রাখে, তাহলে শিশু ও অভিভাবক—উভয়ের ভূমিকাই সংকুচিত হয়ে যায়। এতে রাষ্ট্র এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, যা পারিবারিক দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত বিকাশের ক্ষেত্রকে অতিক্রম করতে পারে।

একটি নীতিগত বৈপরীত্য

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে ১৫ বছর বয়সকে গুরুত্বপূর্ণ সীমা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল কিশোরদের ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর তাদের অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

কিন্তু এখন যদি কয়েকজন অপ্রাপ্তবয়স্ককে সুরক্ষা দিতে কোটি কোটি মানুষের বয়স সম্পর্কিত তথ্য নিয়মিত যাচাই ও সংরক্ষণের অবকাঠামো গড়ে তুলতে হয়, তাহলে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার সেই নীতির সঙ্গেই একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি হয়।

গণতন্ত্রে সতর্কতার প্রয়োজন

UK Politicians Continue to Miss the Point in Latest Social Media Ban  Proposal | Electronic Frontier Foundation

কেউই দাবি করছেন না যে শিশুদের অনলাইন ঝুঁকি উপেক্ষা করা উচিত। বরং প্রশ্ন হলো, সেই সুরক্ষার উপায় কী হবে।

গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাধীনতার ওপর নতুন শর্ত আরোপের আগে প্রমাণ করতে হয় যে এর চেয়ে কম সীমাবদ্ধ কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। কারণ একবার নাগরিক স্বাধীনতার সঙ্গে পরিচয় যাচাই, তথ্য সংগ্রহ বা নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে গেলে, তা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত ব্যবহারের পথও খুলে দিতে পারে।

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে যদি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অনলাইন গোপনীয়তা এবং নাগরিক অধিকারের মৌলিক কাঠামোই নীরবে বদলে যেতে শুরু করে, তবে সেই পরিবর্তনকে সাময়িক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করাই হবে বিচক্ষণতার পরিচয়।

লেখক: ব্রুনেসেন বের্ত্রাঁ (Brunessen Bertrand), জন আইন বিভাগের অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব রেন; ডেটা গভর্ন্যান্স (DataGouv) বিষয়ক জ্যঁ মোনে চেয়ারধারী।