০৮:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬
ভালোবাসার ভিড়েও কেন মানুষ একা? নিঃসঙ্গতার বীজ লুকিয়ে থাকে শৈশবের অদৃশ্য ক্ষতে যেখানে পাহাড়ই শিল্পশালা: লাদাখের আকাশছোঁয়া প্রান্তরে শিল্পের নতুন ভাষা পুরুষের চোখে নারীর প্রতিচ্ছবি: গভীর বিশ্লেষণের শক্তি, সময়ের সঙ্গে সংলাপের অপূর্ণতা স্ক্রিনের ক্লান্তি ছেড়ে আবার চিঠির টানে তরুণেরা: হাতে লেখা খামে ফিরছে হারিয়ে যাওয়া অনুভূতি শুল্ক কমতেই চীনে ফিরছে মার্কিন কোম্পানিগুলোর উৎপাদন পরিকল্পনা ভারতের কলেজে ভর্তির স্বপ্ন এখন ব্যয়বহুল, বাড়ছে পরিবারের আর্থিক চাপ টানা ধাক্কায় অনোয়ারের জোট, নেগেরি সেম্বিলানে ক্ষমতা হারিয়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে মালয়েশিয়া প্রতিবাদের ময়দানে এক সাংবাদিকের যাত্রা: কৌতূহল, সংশয় ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন নগরায়ণের চাপে হারিয়ে যাচ্ছে বেঙ্গালুরুর ঐতিহ্যবাহী ফলের ঝুড়ি, সংকটে দেশি ফল ও সবজির চাষ যক্ষ্মার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বড় বাধা: চিকিৎসা চলছে, কিন্তু সরকারি সহায়তা পৌঁছাচ্ছে না

সেউতা সংকট: অভিবাসনের ঢেউ, রাজনৈতিক লাভ আর অদৃশ্য শক্তির প্রশ্ন

স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় সাম্প্রতিক অভিবাসী ঢলকে অনেকেই ইউরোপের সীমান্ত নিরাপত্তার বড় সংকট হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু ঘটনাটিকে কেবল সীমান্ত ভাঙার চেষ্টা হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্যের বড় অংশই আড়ালে থেকে যায়। কারণ কয়েক দিনের নাটকীয় ঘটনার পর দেখা গেছে, প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বিশাল ঢলের অধিকাংশই দ্রুত মরক্কোতে ফিরে গেছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কার্যত কেউই ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতে পারেনি।

অর্থাৎ বাস্তব ফলাফলের তুলনায় এই ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়াই ছিল অনেক বেশি বিস্ফোরক। সীমান্ত যেন ভেঙে ইউরোপের দরজা খুলে গেছে—এমন ধারণা তৈরি করা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি সেই বর্ণনার সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি। তবু আতঙ্কের এই পরিবেশ বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক শক্তিকে নিজেদের বক্তব্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘটনাটিকে নিজের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করে ভবিষ্যৎ অভিবাসন সংকটের সতর্কবার্তা হিসেবে ব্যবহার করেন। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি চলচ্চিত্রের দৃশ্য শেয়ার করেন, যেখানে মানুষের স্রোতকে জঙ্গির আক্রমণের সঙ্গে তুলনা করা হয়। ইউরোপেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার সুযোগ নেয়, আর ফ্রান্সের ডানপন্থী নেতা জর্ডান বারদেলা অভিযোগ করেন, স্পেনের উদার অভিবাসন নীতিই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

More than 48,000 migrants return to Morocco after thousands cross border  into Spain - France 24

কেবল রাজনৈতিক বিরোধীরাই নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহু সদস্য রাষ্ট্রও স্পেনের প্রতি প্রকাশ্য সংহতি দেখানোর বদলে পরোক্ষ সমালোচনার পথ বেছে নেয়। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই প্রতিক্রিয়াকে পক্ষপাত, ভুয়া তথ্য, অজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক স্বার্থের ফল বলে অভিহিত করেন। এতে স্পষ্ট হয়, অভিবাসন এখন শুধু মানবিক বা প্রশাসনিক ইস্যু নয়; এটি ইউরোপীয় রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

তবে এও সত্য যে ঘটনাটি কল্পিত ছিল না। সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টায় অন্তত ৬৭ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কেউ ডুবে গেছেন, কেউ সীমান্ত অবকাঠামোর চাপে প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিতর্ক যত তীব্র হয়েছে, এই প্রাণহানির মানবিক দিকটি ততটাই উপেক্ষিত থেকেছে। মৃতদের ভাগ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রগুলোতে খুব বেশি আলোচনা হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি বিতর্ক নতুন মাত্রা পায়। জাতিসংঘে ইসরায়েলের প্রতিনিধি ড্যানি ড্যানন স্পেনের সমালোচনা করে বলেন, যে দেশ ইসরায়েলকে নিয়মিত নীতিকথা শোনায়, তাদের আগে আফ্রিকায় নিজেদের ঔপনিবেশিক ছিটমহল নিয়ে জবাব দেওয়া উচিত। সেউতা ও মেলিয়ার ঔপনিবেশিক ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়, কিন্তু এই মন্তব্যের সময় ও ভাষা নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।

এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কিছু দাবি ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে ইঙ্গিত করা হয় যে স্পেনের ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল কোনো না কোনোভাবে এই সংকটকে উৎসাহিত করেছে। এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও প্রকাশ্য প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি। তবে স্পেনের কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও সম্ভাব্য বহিরাগত প্রভাবের বিষয়টি উড়িয়ে দেননি, ফলে বিতর্ক আরও তীব্র হয়।

ড্যাননের বক্তব্যের পর স্পেনে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত দানা এরলিখ ব্যাখ্যা দেন যে জাতিসংঘে দেওয়া ওই মন্তব্য ইসরায়েল সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়। এই অবস্থানগত পার্থক্যও নানা জল্পনা তৈরি করে। কেউ এটিকে ব্যক্তিগত মন্তব্য হিসেবে দেখেন, আবার কেউ রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরির কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বলে মনে করেন। কিন্তু জল্পনা আর প্রমাণ এক বিষয় নয়—এ কথা মনে রাখা জরুরি।

EU offered Spain support 'from first moment' of Ceuta crisis, says von der  Leyen, after Sánchez hits out – Europe live | Europe | The Guardian

অন্যদিকে সেউতার ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার জন্য আরও কিছু বাস্তব কারণও সামনে এসেছে। স্পেনের সাম্প্রতিক কিছু আইনগত পরিবর্তন এবং সাংবিধানিক আদালতের একটি সিদ্ধান্ত অভিবাসীদের মধ্যে ভুল প্রত্যাশা তৈরি করেছে বলে ধারণা করা হয়। আবার মানবপাচার চক্র ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে থাকতে পারে বলেও অভিযোগ রয়েছে। মরক্কোর বিরুদ্ধে অতীতেও অভিবাসনকে কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, আলজেরিয়ার সঙ্গে স্পেনের সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও এই ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে কিছু পর্যবেক্ষক এমন লেখালেখি ও নীতিগত প্রস্তাবের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, যেখানে অতীতে কিছু ইসরায়েলপন্থী বিশ্লেষক বা থিংক ট্যাঙ্ক সেউতা ও মেলিয়াকে চাপের বিন্দু হিসেবে ব্যবহারের ধারণা তুলে ধরেছিলেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছেলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যও নতুন করে আলোচনায় আসে। তবে এসব উপাদান সন্দেহের পরিবেশ তৈরি করলেও সেগুলো নিজেরাই কোনো ঘটনার প্রত্যক্ষ প্রমাণ নয়।

সম্ভবত সেউতার সংকটের একক কোনো ব্যাখ্যা নেই। অভিবাসন, আঞ্চলিক কূটনীতি, মানবপাচার, অভ্যন্তরীণ আইন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং তথ্যযুদ্ধ—সব মিলিয়েই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এতগুলো উপাদান কি নিছক কাকতালীয়ভাবে একসঙ্গে মিলেছিল, নাকি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এই সংকটকে ত্বরান্বিত করেছে?

এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার—সেউতার ঘটনায় রাজনৈতিক লাভের হিসাব ছিল মানবিক বিপর্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান। সীমান্তের বেড়া, কূটনৈতিক বাকযুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির সংঘর্ষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হারিয়ে গেছে সেই মানুষগুলোর জীবন, যাদের মৃত্যুই শেষ পর্যন্ত পুরো বিতর্কের সবচেয়ে নীরব সত্য হয়ে রয়ে গেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভালোবাসার ভিড়েও কেন মানুষ একা? নিঃসঙ্গতার বীজ লুকিয়ে থাকে শৈশবের অদৃশ্য ক্ষতে

সেউতা সংকট: অভিবাসনের ঢেউ, রাজনৈতিক লাভ আর অদৃশ্য শক্তির প্রশ্ন

০৭:০০:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় সাম্প্রতিক অভিবাসী ঢলকে অনেকেই ইউরোপের সীমান্ত নিরাপত্তার বড় সংকট হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু ঘটনাটিকে কেবল সীমান্ত ভাঙার চেষ্টা হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্যের বড় অংশই আড়ালে থেকে যায়। কারণ কয়েক দিনের নাটকীয় ঘটনার পর দেখা গেছে, প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বিশাল ঢলের অধিকাংশই দ্রুত মরক্কোতে ফিরে গেছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কার্যত কেউই ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতে পারেনি।

অর্থাৎ বাস্তব ফলাফলের তুলনায় এই ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়াই ছিল অনেক বেশি বিস্ফোরক। সীমান্ত যেন ভেঙে ইউরোপের দরজা খুলে গেছে—এমন ধারণা তৈরি করা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি সেই বর্ণনার সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি। তবু আতঙ্কের এই পরিবেশ বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক শক্তিকে নিজেদের বক্তব্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘটনাটিকে নিজের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করে ভবিষ্যৎ অভিবাসন সংকটের সতর্কবার্তা হিসেবে ব্যবহার করেন। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি চলচ্চিত্রের দৃশ্য শেয়ার করেন, যেখানে মানুষের স্রোতকে জঙ্গির আক্রমণের সঙ্গে তুলনা করা হয়। ইউরোপেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার সুযোগ নেয়, আর ফ্রান্সের ডানপন্থী নেতা জর্ডান বারদেলা অভিযোগ করেন, স্পেনের উদার অভিবাসন নীতিই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

More than 48,000 migrants return to Morocco after thousands cross border  into Spain - France 24

কেবল রাজনৈতিক বিরোধীরাই নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহু সদস্য রাষ্ট্রও স্পেনের প্রতি প্রকাশ্য সংহতি দেখানোর বদলে পরোক্ষ সমালোচনার পথ বেছে নেয়। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই প্রতিক্রিয়াকে পক্ষপাত, ভুয়া তথ্য, অজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক স্বার্থের ফল বলে অভিহিত করেন। এতে স্পষ্ট হয়, অভিবাসন এখন শুধু মানবিক বা প্রশাসনিক ইস্যু নয়; এটি ইউরোপীয় রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

তবে এও সত্য যে ঘটনাটি কল্পিত ছিল না। সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টায় অন্তত ৬৭ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কেউ ডুবে গেছেন, কেউ সীমান্ত অবকাঠামোর চাপে প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিতর্ক যত তীব্র হয়েছে, এই প্রাণহানির মানবিক দিকটি ততটাই উপেক্ষিত থেকেছে। মৃতদের ভাগ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রগুলোতে খুব বেশি আলোচনা হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি বিতর্ক নতুন মাত্রা পায়। জাতিসংঘে ইসরায়েলের প্রতিনিধি ড্যানি ড্যানন স্পেনের সমালোচনা করে বলেন, যে দেশ ইসরায়েলকে নিয়মিত নীতিকথা শোনায়, তাদের আগে আফ্রিকায় নিজেদের ঔপনিবেশিক ছিটমহল নিয়ে জবাব দেওয়া উচিত। সেউতা ও মেলিয়ার ঔপনিবেশিক ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়, কিন্তু এই মন্তব্যের সময় ও ভাষা নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।

এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কিছু দাবি ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে ইঙ্গিত করা হয় যে স্পেনের ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল কোনো না কোনোভাবে এই সংকটকে উৎসাহিত করেছে। এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও প্রকাশ্য প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি। তবে স্পেনের কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও সম্ভাব্য বহিরাগত প্রভাবের বিষয়টি উড়িয়ে দেননি, ফলে বিতর্ক আরও তীব্র হয়।

ড্যাননের বক্তব্যের পর স্পেনে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত দানা এরলিখ ব্যাখ্যা দেন যে জাতিসংঘে দেওয়া ওই মন্তব্য ইসরায়েল সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়। এই অবস্থানগত পার্থক্যও নানা জল্পনা তৈরি করে। কেউ এটিকে ব্যক্তিগত মন্তব্য হিসেবে দেখেন, আবার কেউ রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরির কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বলে মনে করেন। কিন্তু জল্পনা আর প্রমাণ এক বিষয় নয়—এ কথা মনে রাখা জরুরি।

EU offered Spain support 'from first moment' of Ceuta crisis, says von der  Leyen, after Sánchez hits out – Europe live | Europe | The Guardian

অন্যদিকে সেউতার ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার জন্য আরও কিছু বাস্তব কারণও সামনে এসেছে। স্পেনের সাম্প্রতিক কিছু আইনগত পরিবর্তন এবং সাংবিধানিক আদালতের একটি সিদ্ধান্ত অভিবাসীদের মধ্যে ভুল প্রত্যাশা তৈরি করেছে বলে ধারণা করা হয়। আবার মানবপাচার চক্র ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে থাকতে পারে বলেও অভিযোগ রয়েছে। মরক্কোর বিরুদ্ধে অতীতেও অভিবাসনকে কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, আলজেরিয়ার সঙ্গে স্পেনের সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও এই ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে কিছু পর্যবেক্ষক এমন লেখালেখি ও নীতিগত প্রস্তাবের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, যেখানে অতীতে কিছু ইসরায়েলপন্থী বিশ্লেষক বা থিংক ট্যাঙ্ক সেউতা ও মেলিয়াকে চাপের বিন্দু হিসেবে ব্যবহারের ধারণা তুলে ধরেছিলেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছেলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যও নতুন করে আলোচনায় আসে। তবে এসব উপাদান সন্দেহের পরিবেশ তৈরি করলেও সেগুলো নিজেরাই কোনো ঘটনার প্রত্যক্ষ প্রমাণ নয়।

সম্ভবত সেউতার সংকটের একক কোনো ব্যাখ্যা নেই। অভিবাসন, আঞ্চলিক কূটনীতি, মানবপাচার, অভ্যন্তরীণ আইন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং তথ্যযুদ্ধ—সব মিলিয়েই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এতগুলো উপাদান কি নিছক কাকতালীয়ভাবে একসঙ্গে মিলেছিল, নাকি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এই সংকটকে ত্বরান্বিত করেছে?

এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার—সেউতার ঘটনায় রাজনৈতিক লাভের হিসাব ছিল মানবিক বিপর্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান। সীমান্তের বেড়া, কূটনৈতিক বাকযুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির সংঘর্ষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হারিয়ে গেছে সেই মানুষগুলোর জীবন, যাদের মৃত্যুই শেষ পর্যন্ত পুরো বিতর্কের সবচেয়ে নীরব সত্য হয়ে রয়ে গেছে।