০৮:১০ অপরাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬
শুল্ক কমতেই চীনে ফিরছে মার্কিন কোম্পানিগুলোর উৎপাদন পরিকল্পনা ভারতের কলেজে ভর্তির স্বপ্ন এখন ব্যয়বহুল, বাড়ছে পরিবারের আর্থিক চাপ টানা ধাক্কায় অনোয়ারের জোট, নেগেরি সেম্বিলানে ক্ষমতা হারিয়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে মালয়েশিয়া প্রতিবাদের ময়দানে এক সাংবাদিকের যাত্রা: কৌতূহল, সংশয় ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন নগরায়ণের চাপে হারিয়ে যাচ্ছে বেঙ্গালুরুর ঐতিহ্যবাহী ফলের ঝুড়ি, সংকটে দেশি ফল ও সবজির চাষ যক্ষ্মার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বড় বাধা: চিকিৎসা চলছে, কিন্তু সরকারি সহায়তা পৌঁছাচ্ছে না পুলিশের নিরাপত্তা সতর্কতা ছিল রুটিন নির্দেশনা, হামলার নির্দিষ্ট তথ্য নেই: ডিবি প্রধান আমরাই গড়ছি আমাদের প্রাপ্য গণমাধ্যম পাকিস্তানে তুষারধসে প্রাণ গেল বিশ্বখ্যাত পর্বতারোহী নির্মল পুরজা ও ৯ সহযাত্রীর গোপালগঞ্জে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মরণে নির্মিত তোরণে আগুন

দুবাইয়ের আসল শক্তি করছাড় নয়, আস্থার প্রতিষ্ঠান

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন আন্তর্জাতিক পুঁজি আকর্ষণ, আর্থিক বাজারকে গভীরতর করা এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগের কেন্দ্র হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতায় নেমেছে, তখন দুবাইয়ের নাম প্রায় অবধারিতভাবেই সামনে আসে। কর-সুবিধা, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা কিংবা ব্যবসাবান্ধব নীতির কারণে শহরটি বহু দেশের নীতিনির্ধারকদের কাছে অনুসরণযোগ্য মডেল হয়ে উঠেছে। কিন্তু দুবাইকে শুধু ঝকঝকে আকাশচুম্বী ভবন, কর-ছাড় বা বিলাসী জীবনযাত্রার প্রতীক হিসেবে দেখলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি চোখ এড়িয়ে যায়। এর প্রকৃত সাফল্যের ভিত্তি হলো এমন এক শাসনব্যবস্থা, যেখানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জানে—নিয়ম হঠাৎ বদলে যাবে না, চুক্তির বাস্তবায়ন নিশ্চিত হবে এবং সংকটের সময়ও রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সেবা সচল রাখতে সক্ষম।

ইন্দোনেশিয়া সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে, যার উদ্দেশ্য বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, আর্থিক খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন ধরনের আর্থিক দক্ষতা তৈরি করা। এই পরিকল্পনা স্বাভাবিকভাবেই দুবাই আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্রের সঙ্গে তুলনার জন্ম দিয়েছে। তবে প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কোনো দেশের পক্ষে কি কেবল বিশেষ সুবিধা দিয়ে দুবাইয়ের সাফল্য পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব? নাকি সেই সাফল্যের পেছনে থাকা প্রতিষ্ঠানগত শক্তিই আসল পার্থক্য তৈরি করেছে?

দুবাই নিঃসন্দেহে ব্যবসার জন্য একটি অসাধারণ প্রবেশদ্বার। ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, একটি কেন্দ্র থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চল, আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং ইউরোপের বহু বাজারে পৌঁছানো যায়। বহুজাতিক জনসংখ্যা এবং বিস্তৃত বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক নতুন পণ্যের বাজার যাচাইয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য, হালাল পণ্য, ডিজিটাল সেবা, ফ্যাশন কিংবা আতিথেয়তা খাতে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এটি একটি কার্যকর পরীক্ষাগার হিসেবেও কাজ করতে পারে।

কিন্তু এই সুযোগের বিপরীত দিকও রয়েছে। দুবাই এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা মুহূর্তেই ব্যবসার হিসাব পাল্টে দিতে পারে। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাত দেখিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থেকেও ব্যবসা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। আকাশপথ বন্ধ হওয়া, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বিলম্ব, বিমা ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা ভ্রমণে অনিশ্চয়তা—এসবের প্রভাব দ্রুত ব্যবসার নগদ প্রবাহে এসে পড়ে। যেসব প্রতিষ্ঠান আমদানি, আন্তর্জাতিক পরিবহন বা আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই ঝুঁকি বাস্তব।

তবু উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এমন পরিস্থিতিতেও দুবাই তার বাণিজ্যিক অবকাঠামো সচল রাখতে পেরেছে। বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং সরকারি প্রশাসন কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। বিনিয়োগকারীদের কাছে এটাই সবচেয়ে বড় বার্তা। তারা বুঝতে পারে, অস্থিরতার মধ্যেও রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সেবা বজায় রাখবে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। ব্যবসায় আস্থা তৈরি হয় মূলত এই ধারাবাহিকতা থেকেই।

অবশ্য বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার বাস্তবতা এক নয়। বহুজাতিক কোম্পানি বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে, একাধিক বাজারে কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে পারে কিংবা সাময়িক ক্ষতি বহন করার সক্ষমতা রাখে। কিন্তু ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সেই সুযোগ থাকে না। একটি চালান দেরিতে পৌঁছালে দীর্ঘদিনের ক্রেতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। গুদাম বা ভাড়ার ব্যয় হঠাৎ বেড়ে গেলে লাভের সামান্য মার্জিনও শেষ হয়ে যেতে পারে। পর্যটন খাতে মন্দা দেখা দিলে খাদ্য, খুচরা বিক্রি কিংবা হোটেল ব্যবসাও দ্রুত চাপের মুখে পড়ে।

তাই কোনো নতুন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে শুধু সম্ভাবনার দিকে তাকালেই হবে না; ঝুঁকির হিসাবও সমান গুরুত্ব পেতে হবে। বাণিজ্য চুক্তি শুল্ক কমাতে পারে, বাজারে প্রবেশ সহজ করতে পারে, কিন্তু একটি দুর্বল ব্র্যান্ড, অপর্যাপ্ত মূলধন বা অনির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ঘাটতি কখনো পূরণ করতে পারে না। বাজারে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া আর সেখানে সফল হওয়া এক বিষয় নয়।

DIFC tops 10,000 active companies as Dubai pushes deeper into global  finance, ETCIOME

দুবাইয়ে বসবাসকারী ইন্দোনেশীয় প্রবাসী সম্প্রদায় নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রাথমিক সহায়তা দিতে পারে। প্রথম দিকের ক্রেতা, স্থানীয় ব্যবসায়িক যোগাযোগ কিংবা বাজার সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা পাওয়া সহজ হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কোনো প্রতিষ্ঠান কেবল প্রবাসী বাজারের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারে না। শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতা করতে হয় ভারত, চীন, তুরস্ক, ইউরোপ এবং আরব বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে, যাদের বিতরণ ব্যবস্থা এবং বাজার-অভিজ্ঞতা অনেক বেশি শক্তিশালী।

অনেকেই মনে করেন, দুবাইয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ব্যক্তিগত আয়করের অনুপস্থিতি। কিন্তু বাস্তবে ব্যবসা পরিচালনার খরচ সেখানে অত্যন্ত বেশি। কোম্পানি নিবন্ধন তুলনামূলক সহজ হলেও অফিস ভাড়া, কর্মীদের আবাসন, স্বাস্থ্যবিমা, ব্যাংকিং সেবা, পেশাদার পরামর্শ, ভিসা ও প্রশাসনিক ব্যয় মিলিয়ে ব্যবসা লাভজনক রাখা মোটেও সহজ নয়। ফলে কর-সুবিধা থাকলেই কোনো বাজার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সস্তা বা সহজ হয়ে যায় না।

এখানেই দুবাই আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্রের প্রকৃত শিক্ষা নিহিত। এর শক্তি শুধু কর-সুবিধায় নয়; বরং স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, পূর্বানুমানযোগ্য বিধিব্যবস্থা, বিশেষায়িত আদালত এবং কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থায়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জানে, নিয়ম কী, সিদ্ধান্ত কে নেবে এবং কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে তার ন্যায়সংগত সমাধান কোথায় মিলবে। অনিশ্চয়তার সময়ে এই প্রতিষ্ঠানগত বিশ্বাসযোগ্যতাই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়ে ওঠে।

ইন্দোনেশিয়ার নতুন আর্থিক কেন্দ্রের ভবিষ্যৎও শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্নেই নির্ভর করবে। এটি কি সত্যিই এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী দীর্ঘমেয়াদি আস্থা পাবে? নাকি এটি কেবল আরেকটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হয়ে থাকবে, যেখানে কিছু কর-সুবিধা থাকবে কিন্তু নীতিগত স্থিতিশীলতা থাকবে না? বাস্তবায়নবিধি, বিনিয়োগের শর্ত, অগ্রাধিকার খাত কিংবা প্রশাসনিক কাঠামো—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা না এলে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ঘোষণাগুলো বাস্তব ফল দেবে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন আর্থিক কেন্দ্রের সঙ্গে দেশের বাস্তব অর্থনীতির সম্পর্ক কতটা দৃঢ় হবে। এটি যদি স্থানীয় উদ্যোক্তা, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শ্রমবাজারের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে নতুন সক্ষমতা তৈরি করতে পারে, তাহলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ইতিবাচক হবে। কিন্তু যদি এটি কেবল সীমিত পরিসরের বিশেষ সুবিধাভোগী একটি অর্থনৈতিক দ্বীপে পরিণত হয়, তাহলে প্রকৃত উৎপাদনশীলতা বাড়ার বদলে শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্থানান্তর ঘটবে।

একইভাবে দুবাইকে লক্ষ্য করে এগোতে চাওয়া উদ্যোক্তাদেরও পরিষ্কার কৌশল প্রয়োজন। সংযুক্ত আরব আমিরাত কি তাদের চূড়ান্ত বাজার, নাকি বৃহত্তর অঞ্চলে প্রবেশের একটি সেতু? সম্ভাব্য মুনাফা কি উচ্চ পরিচালন ব্যয় বহন করতে পারবে? আঞ্চলিক অস্থিরতার ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা কি তাদের রয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না জেনে কেবল আকর্ষণীয় প্রচারণার ভিত্তিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।

দুবাই আজও বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয়, কারণ সেখানে অনিশ্চয়তার বাণিজ্যিক ব্যয় কমিয়ে আনার মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এই কারণেই শহরটি কেবল একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়, একটি বিশ্বাসযোগ্য অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। অন্য দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই কর-ছাড় বা স্থাপত্যের অনুকরণ নয়। প্রকৃত শিক্ষা হলো এমন প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, যেখানে নীতি ধারাবাহিক, প্রশাসন দক্ষ, অবকাঠামো নির্ভরযোগ্য এবং আইনের শাসনের ওপর বিনিয়োগকারীরা আস্থা রাখতে পারেন। টেকসই অর্থনৈতিক সাফল্যের ভিত্তি শেষ পর্যন্ত সেখানেই নিহিত।

লেখক:  ভিরদিকা রিজকি উতামা সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির স্কুল অব সোশ্যাল সায়েন্সেসে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি গবেষক এবং প্যারা সিন্ডিকেটের নির্বাহী পরিচালক। এই লেখায় প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্ব।

জনপ্রিয় সংবাদ

শুল্ক কমতেই চীনে ফিরছে মার্কিন কোম্পানিগুলোর উৎপাদন পরিকল্পনা

দুবাইয়ের আসল শক্তি করছাড় নয়, আস্থার প্রতিষ্ঠান

০৬:৪০:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন আন্তর্জাতিক পুঁজি আকর্ষণ, আর্থিক বাজারকে গভীরতর করা এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগের কেন্দ্র হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতায় নেমেছে, তখন দুবাইয়ের নাম প্রায় অবধারিতভাবেই সামনে আসে। কর-সুবিধা, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা কিংবা ব্যবসাবান্ধব নীতির কারণে শহরটি বহু দেশের নীতিনির্ধারকদের কাছে অনুসরণযোগ্য মডেল হয়ে উঠেছে। কিন্তু দুবাইকে শুধু ঝকঝকে আকাশচুম্বী ভবন, কর-ছাড় বা বিলাসী জীবনযাত্রার প্রতীক হিসেবে দেখলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি চোখ এড়িয়ে যায়। এর প্রকৃত সাফল্যের ভিত্তি হলো এমন এক শাসনব্যবস্থা, যেখানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জানে—নিয়ম হঠাৎ বদলে যাবে না, চুক্তির বাস্তবায়ন নিশ্চিত হবে এবং সংকটের সময়ও রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সেবা সচল রাখতে সক্ষম।

ইন্দোনেশিয়া সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে, যার উদ্দেশ্য বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, আর্থিক খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন ধরনের আর্থিক দক্ষতা তৈরি করা। এই পরিকল্পনা স্বাভাবিকভাবেই দুবাই আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্রের সঙ্গে তুলনার জন্ম দিয়েছে। তবে প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কোনো দেশের পক্ষে কি কেবল বিশেষ সুবিধা দিয়ে দুবাইয়ের সাফল্য পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব? নাকি সেই সাফল্যের পেছনে থাকা প্রতিষ্ঠানগত শক্তিই আসল পার্থক্য তৈরি করেছে?

দুবাই নিঃসন্দেহে ব্যবসার জন্য একটি অসাধারণ প্রবেশদ্বার। ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, একটি কেন্দ্র থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চল, আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং ইউরোপের বহু বাজারে পৌঁছানো যায়। বহুজাতিক জনসংখ্যা এবং বিস্তৃত বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক নতুন পণ্যের বাজার যাচাইয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য, হালাল পণ্য, ডিজিটাল সেবা, ফ্যাশন কিংবা আতিথেয়তা খাতে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এটি একটি কার্যকর পরীক্ষাগার হিসেবেও কাজ করতে পারে।

কিন্তু এই সুযোগের বিপরীত দিকও রয়েছে। দুবাই এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা মুহূর্তেই ব্যবসার হিসাব পাল্টে দিতে পারে। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাত দেখিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থেকেও ব্যবসা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। আকাশপথ বন্ধ হওয়া, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বিলম্ব, বিমা ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা ভ্রমণে অনিশ্চয়তা—এসবের প্রভাব দ্রুত ব্যবসার নগদ প্রবাহে এসে পড়ে। যেসব প্রতিষ্ঠান আমদানি, আন্তর্জাতিক পরিবহন বা আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই ঝুঁকি বাস্তব।

তবু উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এমন পরিস্থিতিতেও দুবাই তার বাণিজ্যিক অবকাঠামো সচল রাখতে পেরেছে। বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং সরকারি প্রশাসন কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। বিনিয়োগকারীদের কাছে এটাই সবচেয়ে বড় বার্তা। তারা বুঝতে পারে, অস্থিরতার মধ্যেও রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সেবা বজায় রাখবে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। ব্যবসায় আস্থা তৈরি হয় মূলত এই ধারাবাহিকতা থেকেই।

অবশ্য বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার বাস্তবতা এক নয়। বহুজাতিক কোম্পানি বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে, একাধিক বাজারে কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে পারে কিংবা সাময়িক ক্ষতি বহন করার সক্ষমতা রাখে। কিন্তু ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সেই সুযোগ থাকে না। একটি চালান দেরিতে পৌঁছালে দীর্ঘদিনের ক্রেতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। গুদাম বা ভাড়ার ব্যয় হঠাৎ বেড়ে গেলে লাভের সামান্য মার্জিনও শেষ হয়ে যেতে পারে। পর্যটন খাতে মন্দা দেখা দিলে খাদ্য, খুচরা বিক্রি কিংবা হোটেল ব্যবসাও দ্রুত চাপের মুখে পড়ে।

তাই কোনো নতুন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে শুধু সম্ভাবনার দিকে তাকালেই হবে না; ঝুঁকির হিসাবও সমান গুরুত্ব পেতে হবে। বাণিজ্য চুক্তি শুল্ক কমাতে পারে, বাজারে প্রবেশ সহজ করতে পারে, কিন্তু একটি দুর্বল ব্র্যান্ড, অপর্যাপ্ত মূলধন বা অনির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ঘাটতি কখনো পূরণ করতে পারে না। বাজারে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া আর সেখানে সফল হওয়া এক বিষয় নয়।

DIFC tops 10,000 active companies as Dubai pushes deeper into global  finance, ETCIOME

দুবাইয়ে বসবাসকারী ইন্দোনেশীয় প্রবাসী সম্প্রদায় নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রাথমিক সহায়তা দিতে পারে। প্রথম দিকের ক্রেতা, স্থানীয় ব্যবসায়িক যোগাযোগ কিংবা বাজার সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা পাওয়া সহজ হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কোনো প্রতিষ্ঠান কেবল প্রবাসী বাজারের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারে না। শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতা করতে হয় ভারত, চীন, তুরস্ক, ইউরোপ এবং আরব বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে, যাদের বিতরণ ব্যবস্থা এবং বাজার-অভিজ্ঞতা অনেক বেশি শক্তিশালী।

অনেকেই মনে করেন, দুবাইয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ব্যক্তিগত আয়করের অনুপস্থিতি। কিন্তু বাস্তবে ব্যবসা পরিচালনার খরচ সেখানে অত্যন্ত বেশি। কোম্পানি নিবন্ধন তুলনামূলক সহজ হলেও অফিস ভাড়া, কর্মীদের আবাসন, স্বাস্থ্যবিমা, ব্যাংকিং সেবা, পেশাদার পরামর্শ, ভিসা ও প্রশাসনিক ব্যয় মিলিয়ে ব্যবসা লাভজনক রাখা মোটেও সহজ নয়। ফলে কর-সুবিধা থাকলেই কোনো বাজার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সস্তা বা সহজ হয়ে যায় না।

এখানেই দুবাই আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্রের প্রকৃত শিক্ষা নিহিত। এর শক্তি শুধু কর-সুবিধায় নয়; বরং স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, পূর্বানুমানযোগ্য বিধিব্যবস্থা, বিশেষায়িত আদালত এবং কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থায়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জানে, নিয়ম কী, সিদ্ধান্ত কে নেবে এবং কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে তার ন্যায়সংগত সমাধান কোথায় মিলবে। অনিশ্চয়তার সময়ে এই প্রতিষ্ঠানগত বিশ্বাসযোগ্যতাই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়ে ওঠে।

ইন্দোনেশিয়ার নতুন আর্থিক কেন্দ্রের ভবিষ্যৎও শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্নেই নির্ভর করবে। এটি কি সত্যিই এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী দীর্ঘমেয়াদি আস্থা পাবে? নাকি এটি কেবল আরেকটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হয়ে থাকবে, যেখানে কিছু কর-সুবিধা থাকবে কিন্তু নীতিগত স্থিতিশীলতা থাকবে না? বাস্তবায়নবিধি, বিনিয়োগের শর্ত, অগ্রাধিকার খাত কিংবা প্রশাসনিক কাঠামো—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা না এলে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ঘোষণাগুলো বাস্তব ফল দেবে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন আর্থিক কেন্দ্রের সঙ্গে দেশের বাস্তব অর্থনীতির সম্পর্ক কতটা দৃঢ় হবে। এটি যদি স্থানীয় উদ্যোক্তা, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শ্রমবাজারের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে নতুন সক্ষমতা তৈরি করতে পারে, তাহলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ইতিবাচক হবে। কিন্তু যদি এটি কেবল সীমিত পরিসরের বিশেষ সুবিধাভোগী একটি অর্থনৈতিক দ্বীপে পরিণত হয়, তাহলে প্রকৃত উৎপাদনশীলতা বাড়ার বদলে শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্থানান্তর ঘটবে।

একইভাবে দুবাইকে লক্ষ্য করে এগোতে চাওয়া উদ্যোক্তাদেরও পরিষ্কার কৌশল প্রয়োজন। সংযুক্ত আরব আমিরাত কি তাদের চূড়ান্ত বাজার, নাকি বৃহত্তর অঞ্চলে প্রবেশের একটি সেতু? সম্ভাব্য মুনাফা কি উচ্চ পরিচালন ব্যয় বহন করতে পারবে? আঞ্চলিক অস্থিরতার ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা কি তাদের রয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না জেনে কেবল আকর্ষণীয় প্রচারণার ভিত্তিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।

দুবাই আজও বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয়, কারণ সেখানে অনিশ্চয়তার বাণিজ্যিক ব্যয় কমিয়ে আনার মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এই কারণেই শহরটি কেবল একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়, একটি বিশ্বাসযোগ্য অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। অন্য দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই কর-ছাড় বা স্থাপত্যের অনুকরণ নয়। প্রকৃত শিক্ষা হলো এমন প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, যেখানে নীতি ধারাবাহিক, প্রশাসন দক্ষ, অবকাঠামো নির্ভরযোগ্য এবং আইনের শাসনের ওপর বিনিয়োগকারীরা আস্থা রাখতে পারেন। টেকসই অর্থনৈতিক সাফল্যের ভিত্তি শেষ পর্যন্ত সেখানেই নিহিত।

লেখক:  ভিরদিকা রিজকি উতামা সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির স্কুল অব সোশ্যাল সায়েন্সেসে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি গবেষক এবং প্যারা সিন্ডিকেটের নির্বাহী পরিচালক। এই লেখায় প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্ব।