একসময় গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা। এখন সেই মনোযোগই সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য সম্পদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবিরাম স্ক্রল, কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও এবং অ্যালগরিদমনির্ভর বিনোদনের যুগে মানুষের ধৈর্য যেমন কমেছে, তেমনি বদলে গেছে সংবাদমাধ্যমের অগ্রাধিকারও। ফলে আজ বিবিসির মতো একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানও এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী আর কোনো টেলিভিশন চ্যানেল নয়; বরং মানুষের হাতে থাকা মোবাইল ফোন।
বিবিসি সম্প্রতি নিজেদের গুরুত্ব বোঝাতে নতুন প্রচারণা শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানটি যেন জনগণকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাইছে—বিনোদন, সংস্কৃতি, খেলাধুলা কিংবা সংবাদ—সব ক্ষেত্রেই তাদের অবদান কত বড়। কিন্তু যখন একটি প্রতিষ্ঠানকে নিজেই নিজের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে হয়, তখন বোঝা যায় তার আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরেছে। এই আত্মপক্ষসমর্থন আসলে সেই অনিশ্চয়তারই প্রতিফলন, যা বর্তমানে বিবিসিকে ঘিরে রয়েছে।
সমস্যার কারণও স্পষ্ট। লাইসেন্স ফি প্রদানকারীর সংখ্যা কমছে। দর্শকদের বড় অংশ এখন প্রথমেই নেটফ্লিক্স বা অন্যান্য স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে যায়। অন্যদিকে টিকটক, ইনস্টাগ্রাম এবং স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলো মানুষের অবসর সময়ের প্রায় পুরোটা দখল করে নিচ্ছে। ফলে একটি জনঅর্থায়িত সম্প্রচারমাধ্যমকে এখন শুধু মানসম্মত অনুষ্ঠান তৈরি করলেই হচ্ছে না; মানুষের ক্ষণস্থায়ী মনোযোগও জয় করতে হচ্ছে।
এই আর্থিক ও দর্শকসংকটের মধ্যেই বিবিসি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। জনপ্রিয় কিছু বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে। এসব নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত উদ্বেগের বিষয় অন্যত্র। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সংবাদ ও বিশ্লেষণধর্মী অনুষ্ঠানগুলো, যেগুলো আসলে একটি জনস্বার্থভিত্তিক সম্প্রচারমাধ্যমের মূল পরিচয়।
একটি দেশের গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন দিয়ে টিকে থাকে না; তা টিকে থাকে তথ্যের গভীরতা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং নাগরিকদের চিন্তার পরিসরের ওপর। অথচ সেই ভিত্তিগুলোই এখন সংকুচিত হচ্ছে। দক্ষিণ আমেরিকার মতো বিশাল একটি অঞ্চলের জন্য আর আলাদা সংবাদদাতা থাকবে না। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য পরিচিত অনুষ্ঠানগুলোকে একীভূত করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক, অর্থনীতি, আইন কিংবা নীতিনির্ধারণী বিষয় নিয়ে যে অনুষ্ঠানগুলো দর্শকদের জটিল বিষয় সহজভাবে বুঝতে সাহায্য করত, সেগুলোর অনেকই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
এগুলোকে কেবল ব্যয় সংকোচনের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মাধ্যমে সংবাদ পরিবেশনের দর্শনও বদলে যাচ্ছে। যে সাংবাদিকতা মানুষের বোঝাপড়া বাড়ায়, তার জায়গায় গুরুত্ব পাচ্ছে এমন কনটেন্ট, যা দ্রুত ছড়ায়, সহজে ভাইরাল হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি ক্লিক পায়।
এই পরিবর্তন সব সময় প্রকাশ্য নয়। অনেক সময় এটি ঘটে উপস্থাপনার ধরনে। আগে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার একবারেই সম্প্রচার করা হতো, যাতে দর্শক পুরো প্রেক্ষাপট বুঝতে পারেন। এখন একই সাক্ষাৎকার ছোট ছোট অংশে ভাগ করে কয়েক দিন ধরে প্রচার করা হয়। প্রতিটি ক্লিপ আলাদা খবর হয়ে ওঠে, সামাজিক মাধ্যমে নতুন করে ছড়ায় এবং দীর্ঘ সময় আলোচনায় থাকে।
সংবাদ প্রচারের এই কৌশল নিঃসন্দেহে কার্যকর। এটি দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতে কি আলোচনার গভীরতা বজায় থাকে? একটি পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারে যে জবাবদিহি সম্ভব, বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ভিডিও ক্লিপে তা কি আদৌ সম্ভব? সংবাদ যদি শেষ পর্যন্ত কেবল ছোট ছোট উদ্ধৃতি আর আকর্ষণীয় মুহূর্তে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিশ্লেষণ কোথায় থাকবে?

রাজনীতিবিদরাও এই বাস্তবতা দ্রুত বুঝে গেছেন। এখন এমন নেতারাই এগিয়ে থাকছেন, যারা স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওর ভাষা বোঝেন। তারা জানেন, একটি ভাইরাল ভিডিও কখনও কখনও দীর্ঘ নীতিগত বক্তৃতার চেয়েও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে রাজনীতি ক্রমেই নীতির চেয়ে ব্যক্তিত্ব, বিতর্কের চেয়ে বিনোদন এবং যুক্তির চেয়ে দৃশ্যমানতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
অনেকে এর জন্য শুধু বিবিসিকে দোষ দেবেন। কিন্তু সেটি পুরো সত্য নয়। একটি গণমাধ্যম শেষ পর্যন্ত দর্শকের আচরণের প্রতিই সাড়া দেয়। মানুষ যদি গভীর প্রতিবেদন এড়িয়ে কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওতেই সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে সংবাদমাধ্যমও সেই চাহিদা পূরণের দিকেই ঝুঁকবে। কারণ মনোযোগই এখন সবচেয়ে মূল্যবান মুদ্রা।
এখানেই সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটি লুকিয়ে আছে। গণমাধ্যমের মান শুধু সম্পাদক বা সাংবাদিক নির্ধারণ করেন না; দর্শকও করেন। আমরা যদি প্রতিদিন অ্যালগরিদমের বেছে দেওয়া তুচ্ছ বিষয়বস্তুর পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করি, তাহলে জনস্বার্থের সাংবাদিকতা ধীরে ধীরে কোণঠাসা হবেই। কারণ বাজার সব সময় সেই দিকেই যাবে, যেখানে মানুষের চোখ সবচেয়ে বেশি আটকে থাকে।
তাই বিবিসির বর্তমান সংকটকে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আসলে আমাদের সময়ের প্রতিচ্ছবি। আমরা যে ধরনের মনোযোগ, আলোচনা এবং তথ্যসংস্কৃতি তৈরি করছি, গণমাধ্যমও শেষ পর্যন্ত সেই রূপই ধারণ করবে। যদি আমরা গভীরতা ত্যাগ করে কেবল দ্রুত বিনোদন চাই, তবে সংবাদও ক্রমে বিনোদনের ভাষায় কথা বলবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি বিবিসিকে নিয়ে নয়, আমাদের নিয়েই। আমরা কেমন নাগরিক হতে চাই? এমন নাগরিক, যারা কয়েক সেকেন্ডের ক্লিপেই সব বুঝে ফেলতে চান, নাকি এমন নাগরিক, যারা জটিল বাস্তবতা বোঝার জন্য সময় দিতে প্রস্তুত? কারণ গণমাধ্যম শেষ পর্যন্ত সমাজের প্রতিফলন। আমরা যেমন দর্শক, আমাদের গণমাধ্যমও তেমনই হবে। আজ আমরা যে বিবিসিকে দেখছি, সেটি হয়তো সেই বাস্তবতারই সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
শার্লট আইভার্স 


















