০৮:০৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬
মতভেদ থেকে তাকফির: ধর্মের ব্যাখ্যা যখন সহিংসতার অস্ত্রে পরিণত হয় সৌদি আরবের উন্নয়নের নতুন মানদণ্ড: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি শুধু প্রযুক্তি, নাকি রাষ্ট্রের সক্ষমতার পরীক্ষা? জীবাণু অস্ত্রের নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়, নতুন হুমকি বায়োসন্ত্রাস কোরিয়ার ছোঁয়ায় নতুন স্বাদের ইনারি-সুশি: ভুট্টা, টোফু আর ঝাল মাখনের অনন্য মেলবন্ধন উত্তর কোরিয়া-রাশিয়ার সামরিক জোটে বদলে যাচ্ছে ইউরোপ ও ইন্দো-প্যাসিফিকের নিরাপত্তা সমীকরণ টানা পঞ্চম মাসে টয়োটার বৈশ্বিক বিক্রি কমল, চাপ বাড়ছে গাড়ি শিল্পে ইরানকে থামাতে পারবে কি চীন? উপসাগরীয় দেশগুলোর নতুন কূটনৈতিক পরীক্ষা বিমসটেককে অগ্রাধিকার দিচ্ছে নেপাল, আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে নতুন উদ্যোগ ভূমিকম্পের ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে কুমামোতো, ফিরছে পরিবহন ও শিল্প কার্যক্রম পরীক্ষায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিন প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে ঢুকে পড়ল অ্যানথ্রপিকের এআই মডেল

মতভেদ থেকে তাকফির: ধর্মের ব্যাখ্যা যখন সহিংসতার অস্ত্রে পরিণত হয়

সন্ত্রাসবাদের সূচনা খুব কম ক্ষেত্রেই বিস্ফোরণ বা বন্দুকের গুলিতে হয়। তার অনেক আগেই শুরু হয় চিন্তার জগতে একটি বিপজ্জনক পরিবর্তন। রাজনৈতিক বিরোধকে ধর্মীয় বিচ্যুতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, রাষ্ট্রের নীতির সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধিতা বলা হয়, আর ভিন্নমতাবলম্বীদের ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষ থেকে শত্রু এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংসযোগ্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়। ইতিহাস বলছে, সহিংসতার প্রায় প্রতিটি বড় ঢেউয়ের আগে এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক বিকৃতি কাজ করেছে, যা ধর্মকে নৈতিক পথনির্দেশনার বদলে রাজনৈতিক বৈধতার অস্ত্রে পরিণত করেছে।

এই বাস্তবতা শুধু পাকিস্তানের নয়, বরং যেকোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের জন্য গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ উগ্রবাদ কেবল নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে অস্ত্রের লড়াই নয়; এটি ধর্মীয় কর্তৃত্ব, রাষ্ট্রের বৈধতা এবং ইসলামের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে এক দীর্ঘ আদর্শিক সংঘর্ষ। কে ইসলাম ব্যাখ্যা করার অধিকার রাখে, কে জিহাদের ঘোষণা দিতে পারে, কিংবা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কি নিজেরাই রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ধর্মীয় রায় দিতে পারে—এই প্রশ্নগুলোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস হলো, সর্বোচ্চ সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর। কিন্তু এই সত্যকে বিকৃত করে যখন বলা হয় যে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, সংসদ বা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান স্বয়ং আল্লাহর কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, তখন একটি মৌলিক ধর্মীয় নীতিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। এখানেই শুরু হয় বিপজ্জনক বিভ্রান্তি।

এই যুক্তির পরিণতিও সহজেই অনুমেয়। সংসদ আইন প্রণয়ন করে—অতএব সংসদ আল্লাহর ক্ষমতা দখল করেছে; গণতন্ত্র তাই ইসলামবিরোধী; এরপর সংসদ সদস্য, বিচারক, সরকারি কর্মকর্তা, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এমনকি নির্বাচনে অংশ নেওয়া সাধারণ নাগরিকও ধর্মচ্যুত বলে অভিযুক্ত হতে থাকেন। একটি সত্য নীতিকে ব্যবহার করে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও ভ্রান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর এই কৌশলই উগ্রপন্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য।

ইসলামের ইতিহাস অবশ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। ন্যায়বিচার, পরামর্শভিত্তিক শাসন, জবাবদিহি, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং ক্ষমতার দায়িত্বশীল ব্যবহার—এসবই ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তার ভিত্তি। কিন্তু ইতিহাস কোথাও বলে না যে রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য একটিই চিরস্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারিত আছে। প্রথম চার খলিফার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াও এক ছিল না। যা অপরিবর্তিত ছিল, তা হলো ন্যায়, পরামর্শ, বৈধতা এবং জনগণের কল্যাণের প্রতি অঙ্গীকার।

এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে কিছু নীতি চিরস্থায়ী, কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতি সময় ও সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। এই সত্য উপেক্ষা করে রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সরল ধর্মীয় স্লোগানে বিচার করলে বাস্তবতার পরিবর্তে মতাদর্শই প্রাধান্য পায়।

এটি অবশ্যই সত্য যে গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা আছে। নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, দুর্বল প্রশাসন, দুর্নীতি, রাজনৈতিক মেরুকরণ, আইনের অসম প্রয়োগ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যহীনতা—এসব কারণে জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব সমস্যা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বরং এগুলো সংস্কারের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।

কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক সীমারেখা রয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ত্রুটিপূর্ণ বলা এক বিষয়, আর পুরো রাষ্ট্রকাঠামোকেই ইসলামবিরোধী বা কুফরি ঘোষণা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রথমটি সংস্কারের আহ্বান জানায়, দ্বিতীয়টি সহিংসতার জন্য আদর্শিক ভিত্তি তৈরি করে।

এই পর্যায়ে এসে “তাকফির”—অর্থাৎ কাউকে ইসলাম থেকে বেরিয়ে গেছে বলে ঘোষণা করার প্রবণতা—সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ ধারণ করে। ইসলামী আইনশাস্ত্র দীর্ঘকাল ধরে পাপ, অন্যায়, দুর্নীতি, ভুল সিদ্ধান্ত এবং সরাসরি ঈমান অস্বীকারের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করেছে। কোনো শাসকের অবিচার মানেই তিনি ধর্মত্যাগী নন। বিচারকের ভুল রায় তাকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। সংসদের একটি খারাপ আইন সব আইনপ্রণেতাকে অবিশ্বাসী বানিয়ে দেয় না। একইভাবে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা রাষ্ট্রের প্রতিটি কর্মচারী বা নিরাপত্তা সদস্যকে বৈধ হামলার লক্ষ্য বানায় না।

কিন্তু যখন এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো মুছে ফেলা হয়, তখন ঘটনাপ্রবাহ খুব দ্রুত এগোয়। প্রথমে রাষ্ট্রকে ইসলামবিরোধী বলা হয়, তারপর রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের ধর্মচ্যুত ঘোষণা করা হয়, এরপর প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইসলামের শত্রু হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়। তখন ধর্মীয় চরমপন্থা শুধু একটি মতবাদ থাকে না; তা জাতীয় নিরাপত্তার সরাসরি হুমকিতে পরিণত হয়।

গত কয়েক দশকে পাকিস্তান এই চিন্তার ভয়াবহ মূল্য রক্ত দিয়ে পরিশোধ করেছে। মসজিদ, স্কুল, আদালত, বাজার, পুলিশ স্টেশন ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে জঙ্গিরা নিজেদের কর্মকাণ্ডকে “জিহাদ” নামে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অথচ নিহতদের বড় অংশই ছিল সেই মুসলমান, যাদের রক্ষার দাবি তারা করত।

বাস্তবতা হলো, কোনো ব্যক্তি বা বেসরকারি সংগঠন কেবল নিজেদের ঘোষণার মাধ্যমে ধর্মীয় বৈধতা অর্জন করতে পারে না। জিহাদের মতো গুরুতর ধারণাকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত সিদ্ধান্তের বিষয় বানানো ইসলামী ঐতিহ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণেই ধর্মীয় আলেমদের ঐকমত্যভিত্তিক উদ্যোগ এবং উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যাখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহিংসতার নিন্দা করাই যথেষ্ট নয়; যে বিকৃত যুক্তি সহিংসতার জন্ম দেয়, তাকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে খণ্ডন করাও সমান জরুরি।

What is terrorism? The controversial label that is used and abused around  the world - ABC News

তবে রাষ্ট্রেরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। উগ্রবাদ মোকাবিলার নামে যদি প্রতিটি সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে দেখা হয়, তবে সেটিও আরেক ধরনের চরমপন্থা তৈরি করবে। সরকার বা সামরিক নীতির সমালোচনা করা মানেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। জবাবদিহি দাবি করা বিদ্রোহ নয়। বরং সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার শক্তি এখানেই যে, নাগরিকরা ভয় ছাড়াই প্রশ্ন করতে পারবেন, বিতর্ক করবেন এবং নীতির পরিবর্তন চাইতে পারবেন।

চরমপন্থা সবকিছুকে দুই ভাগে ভাগ করতে চায়—বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী, দেশপ্রেমিক ও দেশদ্রোহী, অনুগত ও বিদ্রোহী। কিন্তু একটি আত্মবিশ্বাসী সাংবিধানিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে মতপার্থক্যের জন্য জায়গা থাকে। আইন ও সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে মানুষ দ্বিমত পোষণ করতে পারে, অথচ রাষ্ট্র বা ধর্মের শত্রুতে পরিণত হয় না।

এই কারণে উগ্রবাদ প্রতিরোধের কাজ কেবল নিরাপত্তা অভিযানের মাধ্যমে সম্ভব নয়। ধর্মীয় শিক্ষায় গভীরতা, শিক্ষা ব্যবস্থায় সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ, দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ভাষা এবং কার্যকর সুশাসন—সবগুলোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অন্যায়, বৈষম্য ও দুর্বল প্রশাসন উগ্রবাদীদের প্রচারণার জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে।

সামরিক অভিযান প্রয়োজন হতে পারে, যখন সশস্ত্র গোষ্ঠী রাষ্ট্র ও নাগরিকদের ওপর হামলা চালায়। কিন্তু অস্ত্র দিয়ে কেবল সন্ত্রাসীকে পরাজিত করা যায়; যে বিকৃত চিন্তা তাকে সৃষ্টি করেছে, তা ধ্বংস করা যায় না। আদর্শিক লড়াইয়ে বিজয় ছাড়া নিরাপত্তার বিজয় কখনোই স্থায়ী হয় না।

অতএব, রাষ্ট্রকে যেমন তার ভূখণ্ড রক্ষা করতে হবে, তেমনি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভাষার প্রকৃত অর্থও রক্ষা করতে হবে। জিহাদকে উগ্রবাদীদের একচেটিয়া ব্যাখ্যার হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে ব্যক্তিগত সহিংসতার স্লোগানে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। গণতন্ত্রের সমালোচনা অবশ্যই করা যাবে, কিন্তু সেই সমালোচনাকে সশস্ত্র বিদ্রোহের বৈধতা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। একইভাবে, ইসলামের তাকফির সম্পর্কে কঠোর সতর্কতাকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কাছে বিসর্জন দেওয়াও চলবে না।

একটি স্থিতিশীল সমাজের পরিচয় এই নয় যে সেখানে কোনো মতবিরোধ নেই। বরং প্রকৃত শক্তি সেখানে, যেখানে মানুষ মতভেদকে ঘৃণা, ধর্মচ্যুতি বা সহিংসতায় রূপান্তরিত হতে দেয় না। রাষ্ট্রকে আইন, জবাবদিহি ও যুক্তির মাধ্যমে সংস্কার করা যায়—তাকফির, ব্যক্তিগত বাহিনী বা ধর্মের নামে সহিংসতা দিয়ে নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও উগ্রবাদের মধ্যকার সীমারেখা তাই সব সময় স্পষ্ট, দৃশ্যমান এবং অটুট থাকা জরুরি।

জনপ্রিয় সংবাদ

মতভেদ থেকে তাকফির: ধর্মের ব্যাখ্যা যখন সহিংসতার অস্ত্রে পরিণত হয়

মতভেদ থেকে তাকফির: ধর্মের ব্যাখ্যা যখন সহিংসতার অস্ত্রে পরিণত হয়

০৮:০০:৪৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬

সন্ত্রাসবাদের সূচনা খুব কম ক্ষেত্রেই বিস্ফোরণ বা বন্দুকের গুলিতে হয়। তার অনেক আগেই শুরু হয় চিন্তার জগতে একটি বিপজ্জনক পরিবর্তন। রাজনৈতিক বিরোধকে ধর্মীয় বিচ্যুতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, রাষ্ট্রের নীতির সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধিতা বলা হয়, আর ভিন্নমতাবলম্বীদের ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষ থেকে শত্রু এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংসযোগ্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়। ইতিহাস বলছে, সহিংসতার প্রায় প্রতিটি বড় ঢেউয়ের আগে এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক বিকৃতি কাজ করেছে, যা ধর্মকে নৈতিক পথনির্দেশনার বদলে রাজনৈতিক বৈধতার অস্ত্রে পরিণত করেছে।

এই বাস্তবতা শুধু পাকিস্তানের নয়, বরং যেকোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের জন্য গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ উগ্রবাদ কেবল নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে অস্ত্রের লড়াই নয়; এটি ধর্মীয় কর্তৃত্ব, রাষ্ট্রের বৈধতা এবং ইসলামের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে এক দীর্ঘ আদর্শিক সংঘর্ষ। কে ইসলাম ব্যাখ্যা করার অধিকার রাখে, কে জিহাদের ঘোষণা দিতে পারে, কিংবা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কি নিজেরাই রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ধর্মীয় রায় দিতে পারে—এই প্রশ্নগুলোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস হলো, সর্বোচ্চ সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর। কিন্তু এই সত্যকে বিকৃত করে যখন বলা হয় যে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, সংসদ বা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান স্বয়ং আল্লাহর কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, তখন একটি মৌলিক ধর্মীয় নীতিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। এখানেই শুরু হয় বিপজ্জনক বিভ্রান্তি।

এই যুক্তির পরিণতিও সহজেই অনুমেয়। সংসদ আইন প্রণয়ন করে—অতএব সংসদ আল্লাহর ক্ষমতা দখল করেছে; গণতন্ত্র তাই ইসলামবিরোধী; এরপর সংসদ সদস্য, বিচারক, সরকারি কর্মকর্তা, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এমনকি নির্বাচনে অংশ নেওয়া সাধারণ নাগরিকও ধর্মচ্যুত বলে অভিযুক্ত হতে থাকেন। একটি সত্য নীতিকে ব্যবহার করে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও ভ্রান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর এই কৌশলই উগ্রপন্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য।

ইসলামের ইতিহাস অবশ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। ন্যায়বিচার, পরামর্শভিত্তিক শাসন, জবাবদিহি, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং ক্ষমতার দায়িত্বশীল ব্যবহার—এসবই ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তার ভিত্তি। কিন্তু ইতিহাস কোথাও বলে না যে রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য একটিই চিরস্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারিত আছে। প্রথম চার খলিফার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াও এক ছিল না। যা অপরিবর্তিত ছিল, তা হলো ন্যায়, পরামর্শ, বৈধতা এবং জনগণের কল্যাণের প্রতি অঙ্গীকার।

এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে কিছু নীতি চিরস্থায়ী, কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতি সময় ও সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। এই সত্য উপেক্ষা করে রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সরল ধর্মীয় স্লোগানে বিচার করলে বাস্তবতার পরিবর্তে মতাদর্শই প্রাধান্য পায়।

এটি অবশ্যই সত্য যে গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা আছে। নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, দুর্বল প্রশাসন, দুর্নীতি, রাজনৈতিক মেরুকরণ, আইনের অসম প্রয়োগ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যহীনতা—এসব কারণে জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব সমস্যা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বরং এগুলো সংস্কারের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।

কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক সীমারেখা রয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ত্রুটিপূর্ণ বলা এক বিষয়, আর পুরো রাষ্ট্রকাঠামোকেই ইসলামবিরোধী বা কুফরি ঘোষণা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রথমটি সংস্কারের আহ্বান জানায়, দ্বিতীয়টি সহিংসতার জন্য আদর্শিক ভিত্তি তৈরি করে।

এই পর্যায়ে এসে “তাকফির”—অর্থাৎ কাউকে ইসলাম থেকে বেরিয়ে গেছে বলে ঘোষণা করার প্রবণতা—সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ ধারণ করে। ইসলামী আইনশাস্ত্র দীর্ঘকাল ধরে পাপ, অন্যায়, দুর্নীতি, ভুল সিদ্ধান্ত এবং সরাসরি ঈমান অস্বীকারের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করেছে। কোনো শাসকের অবিচার মানেই তিনি ধর্মত্যাগী নন। বিচারকের ভুল রায় তাকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। সংসদের একটি খারাপ আইন সব আইনপ্রণেতাকে অবিশ্বাসী বানিয়ে দেয় না। একইভাবে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা রাষ্ট্রের প্রতিটি কর্মচারী বা নিরাপত্তা সদস্যকে বৈধ হামলার লক্ষ্য বানায় না।

কিন্তু যখন এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো মুছে ফেলা হয়, তখন ঘটনাপ্রবাহ খুব দ্রুত এগোয়। প্রথমে রাষ্ট্রকে ইসলামবিরোধী বলা হয়, তারপর রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের ধর্মচ্যুত ঘোষণা করা হয়, এরপর প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইসলামের শত্রু হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়। তখন ধর্মীয় চরমপন্থা শুধু একটি মতবাদ থাকে না; তা জাতীয় নিরাপত্তার সরাসরি হুমকিতে পরিণত হয়।

গত কয়েক দশকে পাকিস্তান এই চিন্তার ভয়াবহ মূল্য রক্ত দিয়ে পরিশোধ করেছে। মসজিদ, স্কুল, আদালত, বাজার, পুলিশ স্টেশন ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে জঙ্গিরা নিজেদের কর্মকাণ্ডকে “জিহাদ” নামে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অথচ নিহতদের বড় অংশই ছিল সেই মুসলমান, যাদের রক্ষার দাবি তারা করত।

বাস্তবতা হলো, কোনো ব্যক্তি বা বেসরকারি সংগঠন কেবল নিজেদের ঘোষণার মাধ্যমে ধর্মীয় বৈধতা অর্জন করতে পারে না। জিহাদের মতো গুরুতর ধারণাকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত সিদ্ধান্তের বিষয় বানানো ইসলামী ঐতিহ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণেই ধর্মীয় আলেমদের ঐকমত্যভিত্তিক উদ্যোগ এবং উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যাখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহিংসতার নিন্দা করাই যথেষ্ট নয়; যে বিকৃত যুক্তি সহিংসতার জন্ম দেয়, তাকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে খণ্ডন করাও সমান জরুরি।

What is terrorism? The controversial label that is used and abused around  the world - ABC News

তবে রাষ্ট্রেরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। উগ্রবাদ মোকাবিলার নামে যদি প্রতিটি সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে দেখা হয়, তবে সেটিও আরেক ধরনের চরমপন্থা তৈরি করবে। সরকার বা সামরিক নীতির সমালোচনা করা মানেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। জবাবদিহি দাবি করা বিদ্রোহ নয়। বরং সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার শক্তি এখানেই যে, নাগরিকরা ভয় ছাড়াই প্রশ্ন করতে পারবেন, বিতর্ক করবেন এবং নীতির পরিবর্তন চাইতে পারবেন।

চরমপন্থা সবকিছুকে দুই ভাগে ভাগ করতে চায়—বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী, দেশপ্রেমিক ও দেশদ্রোহী, অনুগত ও বিদ্রোহী। কিন্তু একটি আত্মবিশ্বাসী সাংবিধানিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে মতপার্থক্যের জন্য জায়গা থাকে। আইন ও সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে মানুষ দ্বিমত পোষণ করতে পারে, অথচ রাষ্ট্র বা ধর্মের শত্রুতে পরিণত হয় না।

এই কারণে উগ্রবাদ প্রতিরোধের কাজ কেবল নিরাপত্তা অভিযানের মাধ্যমে সম্ভব নয়। ধর্মীয় শিক্ষায় গভীরতা, শিক্ষা ব্যবস্থায় সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ, দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ভাষা এবং কার্যকর সুশাসন—সবগুলোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অন্যায়, বৈষম্য ও দুর্বল প্রশাসন উগ্রবাদীদের প্রচারণার জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে।

সামরিক অভিযান প্রয়োজন হতে পারে, যখন সশস্ত্র গোষ্ঠী রাষ্ট্র ও নাগরিকদের ওপর হামলা চালায়। কিন্তু অস্ত্র দিয়ে কেবল সন্ত্রাসীকে পরাজিত করা যায়; যে বিকৃত চিন্তা তাকে সৃষ্টি করেছে, তা ধ্বংস করা যায় না। আদর্শিক লড়াইয়ে বিজয় ছাড়া নিরাপত্তার বিজয় কখনোই স্থায়ী হয় না।

অতএব, রাষ্ট্রকে যেমন তার ভূখণ্ড রক্ষা করতে হবে, তেমনি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভাষার প্রকৃত অর্থও রক্ষা করতে হবে। জিহাদকে উগ্রবাদীদের একচেটিয়া ব্যাখ্যার হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে ব্যক্তিগত সহিংসতার স্লোগানে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। গণতন্ত্রের সমালোচনা অবশ্যই করা যাবে, কিন্তু সেই সমালোচনাকে সশস্ত্র বিদ্রোহের বৈধতা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। একইভাবে, ইসলামের তাকফির সম্পর্কে কঠোর সতর্কতাকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কাছে বিসর্জন দেওয়াও চলবে না।

একটি স্থিতিশীল সমাজের পরিচয় এই নয় যে সেখানে কোনো মতবিরোধ নেই। বরং প্রকৃত শক্তি সেখানে, যেখানে মানুষ মতভেদকে ঘৃণা, ধর্মচ্যুতি বা সহিংসতায় রূপান্তরিত হতে দেয় না। রাষ্ট্রকে আইন, জবাবদিহি ও যুক্তির মাধ্যমে সংস্কার করা যায়—তাকফির, ব্যক্তিগত বাহিনী বা ধর্মের নামে সহিংসতা দিয়ে নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও উগ্রবাদের মধ্যকার সীমারেখা তাই সব সময় স্পষ্ট, দৃশ্যমান এবং অটুট থাকা জরুরি।