ভারতে যক্ষ্মা এখনও অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সংকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি যক্ষ্মা রোগী রয়েছে ভারতে এবং যক্ষ্মাজনিত মোট মৃত্যুর ২৮ শতাংশই এই দেশে ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে দরিদ্র রোগীদের জন্য ওষুধের পাশাপাশি পুষ্টিকর খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অন্ধ্রপ্রদেশে সরকারি আর্থিক সহায়তা দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকায় হাজারো রোগী চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছেন।
সহায়তা না পেয়ে চিকিৎসা মাঝপথে থেমে যাচ্ছে
অন্ধ্রপ্রদেশের প্রত্যন্ত আদিবাসী এলাকার বাসিন্দা সন্ধ্যা (ছদ্মনাম) ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন। চিকিৎসা শুরু হলেও তীব্র পেটব্যথা ও অপুষ্টির কারণে তিনি কয়েক মাসের মধ্যেই ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন বলে স্থানীয়দের দাবি। বর্তমানে তিনি আবার জ্বর, শরীরব্যথা ও গুরুতর শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছেন।
তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী বড় মেয়ে। দিনমজুরির কাজ পেলে দিনে মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ রুপি আয় হয়। সেই আয়ে পরিবারের চারজনের খাবারই জোটে না। ডিম, দুধ বা পুষ্টিকর খাবার তাদের কাছে মাসে একবারের বিলাসিতা।
অপুষ্টি যক্ষ্মাকে আরও প্রাণঘাতী করে
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. স্বাতী কৃষ্ণর মতে, যক্ষ্মা চিকিৎসায় পুষ্টি সরাসরি রোগমুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। অপুষ্টিতে ভোগা রোগীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি চার থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। শরীরের ওজন অত্যন্ত কম হলে অনেক রোগীকেই হাসপাতালে ভর্তি করা উচিত, কিন্তু বাস্তবে এই বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত হয়।
সরকারি প্রকল্প থাকলেও টাকা পৌঁছাচ্ছে না
দরিদ্র যক্ষ্মা রোগীদের সহায়তার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৮ সালে ‘নিকষয় পোষণ যোজনা’ চালু করে। শুরুতে রোগীরা প্রতি মাসে ৫০০ রুপি পেতেন। ২০২৪ সালে সেই সহায়তা বাড়িয়ে মাসে ১,০০০ রুপি করা হয়। ছয় মাসের চিকিৎসাকালজুড়ে এই অর্থ দেওয়ার কথা।
কিন্তু অন্ধ্রপ্রদেশের বহু রোগী অন্তত ছয় মাস বা তারও বেশি সময় ধরে এই অর্থ পাননি। রাজ্যের যক্ষ্মা কর্মসূচির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার হালনাগাদ করার কারণে বিলম্ব হয়েছে। মার্চ মাসে প্রায় ২৯ হাজার রোগীকে অর্থ দেওয়া হলেও এখনও বহু রোগী অপেক্ষায় রয়েছেন।
শুধু অর্থ নয়, পুষ্টিকর খাদ্যও মিলছে না
অর্থের পাশাপাশি যক্ষ্মা রোগীদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহের উদ্দেশ্যে ‘নিকষয় মিত্র’ কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সংস্থাকে খাদ্য সহায়তা দিতে উৎসাহিত করা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দাতাদের আগ্রহ কমে যায়।
সরকারি হিসাবে ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত চার লক্ষের বেশি খাদ্যঝুড়ি বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু একজন রোগীর ছয় মাসে অন্তত ছয়টি খাদ্যঝুড়ি প্রয়োজন। ফলে বাস্তবে মোট রোগীর তুলনায় এই সহায়তা খুবই সীমিত।
মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরাও বিপাকে
স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, রোগীরা প্রতিদিন জানতে চান কবে তাদের টাকা আসবে। কিন্তু তাদের কাছে কোনো উত্তর নেই।
আরও বড় সমস্যা হলো নতুন ডিজিটাল প্রক্রিয়া। রোগীর আধার, ব্যাংক হিসাব, স্বাস্থ্য পরিচয়পত্র এবং বায়োমেট্রিক যাচাই সম্পন্ন করতে অনেক সময় লাগে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগের কারণে এই কাজ এক সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই মাত্র ৩০ শতাংশ রোগীর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
দারিদ্র্যই যক্ষ্মার সবচেয়ে বড় সহযোগী
বিশেষজ্ঞদের মতে, যক্ষ্মা কেবল একটি সংক্রামক রোগ নয়; এটি দারিদ্র্য, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। পর্যাপ্ত খাবার, নিরাপদ বাসস্থান, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, নিয়মিত চিকিৎসা ও সময়মতো আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত না হলে যক্ষ্মা নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে যক্ষ্মার প্রকোপ ৯০ শতাংশ এবং মৃত্যুহার ৯৫ শতাংশ কমিয়ে আনা। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ওষুধ নয়—সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর না হলে সেই লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















