ভারতীয় চলচ্চিত্রে নারীর উপস্থাপন কেবল চরিত্র নির্মাণের প্রশ্ন নয়; এটি সমাজ, সংস্কৃতি, ক্ষমতা ও দৃষ্টিভঙ্গিরও এক দীর্ঘ ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে লেখা হয়েছে শোমা চট্টোপাধ্যায়ের বই পুরুষের দৃষ্টি পুনর্নির্ধারণ। বইটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিছু ক্লাসিক নির্মাণকে কেন্দ্র করে পুরুষ নির্মাতাদের নারী নির্মাণের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসন্ধান করেছে। কিন্তু বিষয়ের গভীরতা ও গবেষণার আন্তরিকতা সত্ত্বেও বইটি শেষ পর্যন্ত সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারার সীমাবদ্ধতায় আটকে গেছে।
ইতিহাসের ভেতর দিয়ে নারীর অবস্থান
গ্রন্থে নয়জন বিশিষ্ট পুরুষ চলচ্চিত্র পরিচালকের কাজ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাঁদের চলচ্চিত্রে নারী কীভাবে নির্মিত হয়েছে, কীভাবে তাকে দেখা হয়েছে এবং সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ কীভাবে সেই নির্মাণকে প্রভাবিত করেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন লেখক।
আলোচনায় পশ্চিমা চলচ্চিত্রতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলিও এসেছে। বিশেষ করে নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার সঙ্গে ভারতীয় চলচ্চিত্রের তুলনামূলক পাঠ বইটিকে গবেষণামূলক গভীরতা দিয়েছে।
![]()
সময়ের কাছে এসে থেমে গেছে বিশ্লেষণ
বইটির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর সময়বোধ। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও এতে মূলত কয়েক দশক আগের চলচ্চিত্র ও আলোচনাই প্রাধান্য পেয়েছে।
এক পর্যায়ে এমন নির্মাতাদেরও ‘তরুণ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যাঁদের দীর্ঘ কর্মজীবন ইতোমধ্যে ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। আবার একবিংশ শতাব্দীতে নারীকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র, নতুন প্রজন্মের নির্মাতা কিংবা পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতা—এসব বিষয়ে বইটিতে প্রায় কোনো বিস্তৃত আলোচনা নেই।
ফলে পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগে—ভারতীয় চলচ্চিত্রে নারীর পরিবর্তিত অবস্থান, নতুন ভাষা ও নতুন সংগ্রামের চিত্র কি এই আলোচনার বাইরে থেকে গেল?
বিস্তৃত ভারত নয়, সীমিত ভূগোল
ভারতীয় চলচ্চিত্রের কথা বলা হলেও আলোচনার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মূলত হিন্দি ও বাংলা চলচ্চিত্র।
দক্ষিণ ভারতের সমৃদ্ধ চলচ্চিত্রধারা কিংবা অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতাদের কাজ খুব সামান্য উল্লেখেই সীমাবদ্ধ। ফলে ভারতের বহুমাত্রিক চলচ্চিত্রভুবনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি এখানে তৈরি হয় না।
একইভাবে জনপ্রিয় বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে কাজ করে, সেই আলোচনাও তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত। বরং লেখকের আগ্রহ বেশি সমান্তরাল ও শিল্পধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের দিকে।

ক্লাসিক চলচ্চিত্রের নতুন পাঠ
তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কিছু কালজয়ী চলচ্চিত্রের সূক্ষ্ম ও মননশীল বিশ্লেষণ।
একটি অধ্যায়ে একই কাহিনির দুটি ভিন্ন চলচ্চিত্র সংস্করণের তুলনা করে দেখানো হয়েছে, কীভাবে সময়ের সঙ্গে নারীর চরিত্র নির্মাণের ধরন বদলেছে।
আরেক জায়গায় এক পরিশ্রমী নারীর আত্মত্যাগকে পরিবারের ভেতরেই কীভাবে ধীরে ধীরে গ্রাস করা হয়, সেই নির্মম বাস্তবতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে গভীর সংবেদনশীলতায়।
এছাড়া এক নারী চরিত্রের নৃত্যকে কেবল বিনোদনের দৃশ্য হিসেবে নয়, বরং আত্মমুক্তি ও পুনর্জাগরণের প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছেন লেখক।
কিছু দৃশ্য নিয়ে তিনি সরাসরি সিদ্ধান্ত না দিয়ে বরং প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন পাঠকের দিকে। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নেওয়ার স্বাধীনতাও পাঠকের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন, যা বইটির অন্যতম শক্তি।
নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা, তবু রয়ে গেছে দ্বন্দ্ব
বইয়ের একটি উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণে দেখানো হয়েছে, কিছু পরিচালক তাঁদের নারী চরিত্রকে কখনও পণ্য বা প্রদর্শনীর বস্তুতে পরিণত করেননি। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁরা কর্মজীবী কিংবা ক্ষমতাবান নারীকে নিয়ে রক্ষণশীল ধারণাও বহন করেছেন।
এই দ্বৈততা শিল্পীর ব্যক্তিগত বিশ্বাস, সামাজিক পরিবেশ এবং সৃষ্টিশীলতার জটিল সম্পর্ককে সামনে নিয়ে আসে। লেখক এই জটিলতাকে সরলীকরণ করেননি; বরং নানা দিক উন্মুক্ত রেখেছেন।
ভাষা কখনও ভারী, কখনও পুনরাবৃত্তিময়
বইয়ের ভাষা সব সময় সমান প্রাণবন্ত নয়। কোথাও কোথাও একই বক্তব্য বারবার ফিরে এসেছে, যা পাঠের গতি কমিয়ে দেয়।
তবু এসব দুর্বলতা পুরো বইয়ের গুরুত্বকে ম্লান করে না। কারণ লেখকের গবেষণার আন্তরিকতা এবং চলচ্চিত্রকে গভীরভাবে বোঝার প্রচেষ্টা পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখতে সক্ষম।
শেষ কথা
পুরুষের দৃষ্টি পুনর্নির্ধারণ নিঃসন্দেহে ভারতীয় চলচ্চিত্রে নারীর উপস্থাপন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক গবেষণামূলক কাজ। তবে এটি যদি সাম্প্রতিক সময়ের চলচ্চিত্র, নতুন নির্মাতা এবং পরিবর্তিত নারীবাদী ভাষ্যকে আরও বিস্তৃতভাবে অন্তর্ভুক্ত করত, তাহলে বইটি আরও পূর্ণাঙ্গ ও সময়োপযোগী হয়ে উঠতে পারত।
তবু ক্লাসিক ভারতীয় চলচ্চিত্রকে নতুন চোখে পড়তে এবং নারীর উপস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে আগ্রহী পাঠকদের জন্য এটি চিন্তার নতুন দরজা খুলে দেয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















