বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত শিশু ও পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় শুধু স্বাস্থ্যগত সংকটই নয়, অনেকের জন্য বড় আর্থিক দুর্ভোগও তৈরি করছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি)-এর যৌথ মূল্যায়নে দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত পরিবারের ৮৯ শতাংশ চিকিৎসার খরচ মেটাতে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে ৬১ শতাংশ পরিবার তাদের সঞ্চয় শেষ করে ফেলেছে।
সোমবার প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, জরিপে অংশ নেওয়া প্রতিটি পরিবারই কোনো না কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ পরিবারের কাছে ওষুধ ছিল সবচেয়ে জরুরি চাহিদা। এরপর রয়েছে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি সহায়তা (৩৩ শতাংশ) এবং খাদ্য সহায়তা (২২ শতাংশ)।
চিকিৎসার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ব্যয়
মূল্যায়নে দেখা যায়, হামের চিকিৎসার ব্যয় শুধু হাসপাতালের সেবায় সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসার পাশাপাশি যাতায়াত, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, খাবার ও অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয় মিলিয়ে পরিবারগুলোর ওপর বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর গড় চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় ছিল প্রায় ১৬ হাজার টাকা। এছাড়া দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থেকে অসুস্থ শিশু বা পরিবারের সদস্যের সেবা করতে গিয়ে অনেক অভিভাবক আয় হারিয়েছেন, এমনকি কেউ কেউ চাকরিও হারিয়েছেন।

সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত চার বছরের নিচের শিশু
১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হামে আক্রান্ত ২ হাজার ৭৪৬টি পরিবারের ওপর এই মূল্যায়ন পরিচালিত হয়।
তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের ৭৫ শতাংশের বয়স ছিল চার বছরের নিচে। ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী ছিল ১৯ শতাংশ এবং ১৮ বছরের বেশি বয়সী রোগীর সংখ্যা ছিল ৬ শতাংশ।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে সহায়তা
হামের প্রাদুর্ভাবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২ হাজার ৪০০ পরিবারকে জরুরি নগদ সহায়তার জন্য এই জরিপ পরিচালনা করা হয়।
মোট ২ হাজার ৭৪৬টি পরিবারের তথ্য যাচাই করে নির্ধারিত ঝুঁকির মানদণ্ড অনুযায়ী ২ হাজার ৪০০ পরিবারকে নির্বাচন করা হয়েছে। প্রতিটি পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে জরুরি নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
জরিপে আরও দেখা যায়, প্রায় ৪ শতাংশ পরিবার চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে সম্পদ বিক্রি করেছে এবং ৩ শতাংশ পরিবার দানের ওপর নির্ভর করেছে।
এক পরিবারের সংগ্রামের চিত্র

রংপুর থেকে ১১ মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে আসা হাজেরা খাতুন জানান, তাদের পরিবারের চিকিৎসা-সংক্রান্ত ব্যয় ইতোমধ্যে ৭০ হাজার টাকার বেশি হয়েছে।
তার ভাষায়, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া, খাবার, বিভিন্ন পরীক্ষা এবং দৈনন্দিন অন্যান্য খরচ বহন করতে হচ্ছে নিজেদেরই। তিনি আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। তার স্বামী সৌদি আরবে কর্মরত হলেও চলতি মাসে বেতন না পাওয়ায় পরিবারটি আরও সংকটে পড়েছে।
অনানুষ্ঠানিক আয়ের পরিবার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
যেসব পরিবার তাদের পেশার তথ্য দিয়েছে, তাদের মধ্যে ৭৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। তাদের মাসিক আয় ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। ফলে দীর্ঘ সময় অসুস্থতার কারণে আয় বন্ধ হয়ে গেলে এসব পরিবার দ্রুত আর্থিক সংকটে পড়ছে।
সহায়তা ও সচেতনতা কার্যক্রম
বিডিআরসিএসের মহাসচিব ডা. কবির এম. আশরাফ আলম বলেন, এই মূল্যায়ন স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে অনেক পরিবার একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ও আর্থিক সংকট মোকাবিলা করছে। তাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশে আইএফআরসির প্রতিনিধি দলের প্রধান আলবার্তো বোকানেগ্রা বলেন, হামের স্বাস্থ্য সংকটের প্রভাব হাসপাতালের বাইরে গিয়েও পরিবারগুলোর আর্থিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তা এবং শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইএফআরসি ও অংশীদারদের সহায়তায় বিডিআরসিএস সরকারের দেশব্যাপী হাম টিকাদান কর্মসূচিতে সহযোগিতা করেছে। পাশাপাশি এক হাজারের বেশি রেড ক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবক টিকাদান কেন্দ্র, জনসচেতনতা, ঝুঁকি যোগাযোগ এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন।



















