ইতিহাস বারবার একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে এনেছে—যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত কখনও কখনও একক রাষ্ট্র নিতে পারে, কিন্তু সেই যুদ্ধ কীভাবে এবং কখন শেষ হবে, তার নিয়ন্ত্রণ খুব কম ক্ষেত্রেই এক পক্ষের হাতে থাকে। যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক শক্তির প্রদর্শন যতই চমকপ্রদ হোক, স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান নির্ধারণ করে ভিন্ন এক সমীকরণ। সেখানে অস্ত্রের পাশাপাশি কাজ করে অর্থনীতি, কূটনীতি, জনমত, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ চাপ এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য।
আজ ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও ঠিক এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত কে সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর অধিকারী, তা নয়; বরং কে এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করতে পারবে, যেখানে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে তা শেষ করা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে বেশি লাভজনক মনে হবে।
শুধু সামরিক শক্তি যথেষ্ট নয়
প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রই এই সমীকরণের প্রধান নিয়ন্ত্রক। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি এবং ইসরায়েলের প্রধান কৌশলগত মিত্র হিসেবে ওয়াশিংটনের অবস্থান নিঃসন্দেহে প্রভাবশালী। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অন্য কথা বলে।
সাম্প্রতিক কয়েক দশকের ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব রাজনৈতিক সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। কোরীয় যুদ্ধ কোনও সুস্পষ্ট বিজয়ী ছাড়াই থেমেছিল। আফগানিস্তানে দুই দশকের দীর্ঘ উপস্থিতির পরও যুক্তরাষ্ট্র তার ঘোষিত কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের সরকার দ্রুত পতন ঘটলেও পরবর্তী বছরগুলোতে দেশটি দীর্ঘ অস্থিতিশীলতা ও বিদ্রোহে নিমজ্জিত হয়। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, যুদ্ধক্ষেত্রে জয় এবং রাজনৈতিক বাস্তবতায় সফলতা এক বিষয় নয়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা রয়েছে—যে মুহূর্তে সংঘাতে জড়িত সব পক্ষ উপলব্ধি করে যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষতি সম্ভাব্য লাভের চেয়ে বেশি, তখনই আলোচনার পথ বাস্তব বিকল্প হয়ে ওঠে। সমঝোতা তখন দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং কৌশলগত প্রয়োজন।
ইসরায়েলের সামনে নতুন বাস্তবতা
ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং নির্ভুল হামলার প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিয়ে খুব কমই প্রশ্ন আছে। এসব সক্ষমতা ইরানের ওপর উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দিতে পারে। কিন্তু সেটাই কি কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল নিশ্চিত করবে?
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু ইরান বা ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরজুড়ে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে। প্রতিটি নতুন ফ্রন্ট সামরিক ব্যয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মূল্যও বাড়িয়ে তুলবে। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের কার্যকারিতাও ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে।
ইরানের কৌশল: জয় নয়, ব্যয় বাড়ানো
ইরান সম্ভবত এই সংঘাতের সমাপ্তির শর্ত নির্ধারণ করতে পারবে না। কিন্তু প্রতিপক্ষকে সহজ বিজয় থেকেও বঞ্চিত করতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরেই তেহরান এমন প্রতিরক্ষা কৌশল অনুসরণ করছে, যার মূল ভিত্তি প্রতিপক্ষের ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়া। আধুনিক সংঘাতে শক্তির সংজ্ঞা কেবল প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সংঘাতকে এমন ব্যয়বহুল করে তোলাও এক ধরনের ক্ষমতা, যাতে প্রতিপক্ষ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে নিরুৎসাহিত হয়।
এই বাস্তবতা যুদ্ধকে কেবল সামরিক সংঘর্ষের পর্যায়ে রাখে না; এটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহনশীলতার প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি
ইরানকে ঘিরে যেকোনও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আন্তর্জাতিক প্রভাব অত্যন্ত গভীর হতে পারে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। একইভাবে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অপরিহার্য।
এই পথগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে তার প্রভাব দ্রুত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পড়বে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, পরিবহন ও বিমা ব্যয় বেড়ে যাওয়া, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া—সবই বাস্তব সম্ভাবনা। ফলে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ খুব সহজেই আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
এ কারণেই চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো অর্থনৈতিক শক্তিগুলো উত্তেজনা কমানোর পক্ষে। তাদের অর্থনীতি স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ এবং নিরাপদ সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। রাশিয়ার হিসাব কিছুটা আলাদা হলেও, তারও এমন একটি সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় সীমাহীন আগ্রহ থাকার কথা নয়, যদি তা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকেই অস্থিতিশীল করে তোলে।
শেষ সিদ্ধান্তের চাপ ওয়াশিংটনের ওপর
এই সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনশীল সম্ভবত তেহরান বা তেল আবিবে নয়, বরং ওয়াশিংটনে।
একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট সামরিক অভিযান শুরু করার সাংবিধানিক ক্ষমতা রাখলেও, যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারেন না। জ্বালানির দাম, অর্থনীতির অবস্থা, কংগ্রেসের অবস্থান, জনমত, বাজেটের চাপ এবং নির্বাচন—সব মিলিয়ে যুদ্ধ কতদিন চলবে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ভিয়েতনাম, ইরাক এবং আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম যুদ্ধগুলো শেষ হয়েছে কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের ফলাফলের কারণে নয়; বরং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের কারণে।
ইরানকে ঘিরেও একই ধরনের প্রশ্ন সামনে আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ কতটা এই সংঘাতে জড়িত? নাকি ওয়াশিংটন ধীরে ধীরে এমন একটি সংঘর্ষে আটকে যাচ্ছে, যার মূল অগ্রাধিকার ইসরায়েলের নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কৌশলগত লক্ষ্য নয়? পশ্চিমা মিত্রদের অনীহা এবং উপসাগরীয় বহু দেশের সতর্ক অবস্থান এই বিতর্ককে আরও জোরালো করতে পারে।
একবিংশ শতাব্দীর শক্তির নতুন সংজ্ঞা
বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্রের ক্ষমতা কেবল তার ধ্বংসাত্মক সামরিক সক্ষমতায় পরিমাপ করা হয় না। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—কীভাবে সর্বনিম্ন অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত ব্যয়ে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা যায়।
এই কারণেই ইরান সংঘাতের শেষ অধ্যায় সম্ভবত কোনও চূড়ান্ত সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে লেখা হবে না। বরং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ যখন বুঝবে যে যুদ্ধ অব্যাহত রাখার মূল্য আর বহন করা সম্ভব নয়, তখনই সমঝোতার পথ বাস্তব হয়ে উঠবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই সংঘাতের সমাপ্তি নির্ধারণ করবে কেবল তেহরান বা তেল আবিবের সিদ্ধান্ত নয়; ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক বাস্তবতাও। কংগ্রেস, জনমত, অর্থনৈতিক চাপ এবং জাতীয় নিরাপত্তা নীতিনির্ধারকদের মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে এমন একটি রাজনৈতিক সমাধানের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা তার বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ণ রাখবে, কিন্তু আরেকটি দীর্ঘ মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ফাঁদে ফেলবে না।
অবশেষে একটি পরাশক্তির জন্য সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন যুদ্ধ কীভাবে শুরু করা যায়, তা নয়। প্রকৃত পরীক্ষা হলো—কীভাবে এমনভাবে যুদ্ধ শেষ করা যায়, যাতে তা দীর্ঘমেয়াদে নিজের জাতীয় স্বার্থ, আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং কৌশলগত বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংকটের ভবিষ্যৎও সম্ভবত সেই পরীক্ষার ফলেই নির্ধারিত হবে।
লেখকঃ মিশরের সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী
হুসেইন হারিদি 


















