ভারতের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদি দীর্ঘদিন ধরে এমন এক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন, যাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, ব্যক্তিপূজা এবং নির্বাচনী সাফল্য একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। তাঁর নেতৃত্বকে ঘিরে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছিল যে, ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর বিকল্প নেই এবং তাঁকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তিও আর অবশিষ্ট নেই। কিন্তু চলতি গ্রীষ্মের ঘটনাপ্রবাহ সেই ধারণায় গভীর ফাটল ধরিয়েছে। যে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল একটি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ নিয়ে, তা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতা, জবাবদিহি এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
এই আন্দোলনের তাৎপর্য কেবল একটি মন্ত্রীর পদত্যাগে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি দেখিয়েছে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়লেও নাগরিক সমাজ কখনও কখনও নিজেই গণতন্ত্রের শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠতে পারে। ভারতের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।
এক দশকের বেশি সময় ধরে মোদি সরকার নিজেকে উন্নয়ন, দক্ষ প্রশাসন এবং দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীতে আজকের ভারতের বাস্তবতা ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরে। তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগজনক। উচ্চশিক্ষা ও চাকরির প্রতিযোগিতা ক্রমেই নির্মম হয়েছে। কোটি কোটি পরিবার সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে ঋণ করে, সঞ্চয় ভেঙে বা সম্পদ বন্ধক রেখে পরীক্ষার প্রস্তুতির খরচ বহন করে। সেই পরীক্ষাগুলোতেই যদি প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়, তাহলে ক্ষোভ কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে নয়; পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার বিরুদ্ধেও জমা হতে থাকে।
সাম্প্রতিক মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস সেই জমে থাকা ক্ষোভকে বিস্ফোরণের সুযোগ করে দেয়। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী নতুন করে পরীক্ষার অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। কারও কারও জন্য সেই মানসিক চাপ এতটাই অসহনীয় হয়ে ওঠে যে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটে। ফলে আন্দোলনের কেন্দ্রে শুধু পরীক্ষা ছিল না; ছিল মর্যাদা, ভবিষ্যৎ এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার প্রশ্ন।

এই কারণেই ছাত্রদের প্রতিবাদ দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে বেকার যুবক, নতুন স্নাতক, কৃষক, পেশাজীবী এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সমর্থন পায়। আন্দোলনটি ধীরে ধীরে সরকারের বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক অসন্তোষের প্রতীক হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ, রাস্তায় মিছিল এবং সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা—সব মিলিয়ে বহু বছর পর ভারতের ক্ষমতাসীন নেতৃত্ব এমন প্রকাশ্য জনরোষের মুখোমুখি হয়।
শেষ পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগ সরকারকে মেনে নিতে হয়েছে। ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও এর রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল আপস না করা এবং রাজনৈতিকভাবে পিছু না হটা। সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হওয়া তাঁর অপ্রতিরোধ্য ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এই সংকটের পেছনে আরও গভীর বাস্তবতা রয়েছে। ভারতের তরুণ প্রজন্ম বহু বছর ধরে এমন একটি রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি শুনে এসেছে, যেখানে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও সুযোগের বিস্তার ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে কর্মসংস্থানের সংকট আরও তীব্র হয়েছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে। অল্প কয়েকজন ধনকুবের অর্থনীতির ওপর আরও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, এই ব্যর্থতা থেকে জনদৃষ্টি সরাতে ধর্মীয় মেরুকরণকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে আরও বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। মুসলিমসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ঘিরে উত্তেজনা সৃষ্টি করে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটব্যাংককে একত্র রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। একই সময়ে সংসদ, বিচারব্যবস্থা এবং সংবাদমাধ্যমের মতো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন বেড়েছে। ফলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হলেও গণতান্ত্রিক ভারসাম্য দুর্বল হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তরুণদের প্রকাশ্য অবস্থান। বহু বছর ধরে রাষ্ট্রের নানা কর্মকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি নির্মাণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি কর্মসূচি, জনকল্যাণমূলক প্রকল্প কিংবা রাজনৈতিক প্রচার—সব ক্ষেত্রেই সেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক উপস্থাপনাকে সামনে রাখা হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের একটি বড় অংশ সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, গণতন্ত্রে কোনো নেতা প্রশ্নাতীত হতে পারেন না।

সরকার প্রথমদিকে আন্দোলনকে গুরুত্ব দেয়নি। বরং আন্দোলনকারীদের বিদেশি শক্তির প্রভাবিত বা রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা হয়। কিন্তু শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পুলিশের বলপ্রয়োগের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সেই সরকারি বর্ণনা দুর্বল হয়ে যায়। জনমতের একটি অংশ আন্দোলনের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে এবং সরকারের অবস্থান প্রতিরক্ষামূলক হয়ে পড়ে।
দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণআন্দোলন শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপালে ক্ষমতার রাজনীতিকে নাড়া দিয়েছে। দীর্ঘদিন ভারত সেই প্রবণতার বাইরে ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভারতের তরুণ প্রজন্মও আর কেবল দর্শক হয়ে থাকতে রাজি নয়। তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরাসরি রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারতের গণতন্ত্রের সব সংকট কেটে গেছে। বরং এখনই নতুন এক অনিশ্চয়তার সূচনা। দুর্বল রাজনৈতিক অবস্থানে থাকা নেতৃত্ব কখনও কখনও আরও কঠোর এবং অনির্দেশ্য হয়ে উঠতে পারে। আন্দোলনের পরও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার ও হয়রানির অভিযোগ সেই আশঙ্কাকেই উসকে দিচ্ছে।
তারপরও এই গ্রীষ্মের আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে এনেছে। গণতন্ত্র কেবল সংবিধান, নির্বাচন বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে না; শেষ পর্যন্ত তার শক্তির উৎস নাগরিকদের মধ্যেই নিহিত থাকে। যখন মানুষ ভয়কে অতিক্রম করে রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি দাবি করে, তখন সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও অপ্রতিরোধ্য থাকেন না।
ভারতের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা তাই শুধু একটি সরকারের সংকটের গল্প নয়। এটি এমন একটি স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে, গণতন্ত্রকে দুর্বল করা সম্ভব, কিন্তু সম্পূর্ণ নিঃশেষ করা অনেক কঠিন। যতদিন নাগরিক সমাজ নিজের অধিকার রক্ষায় সংগঠিত হতে পারে, ততদিন গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের সম্ভাবনাও জীবিত থাকে।
কাপিল কোমিরেড্ডি 


















