অত্যন্ত বিষাক্ত হিসেবে পরিচিত উলফসবেইন ও লার্কস্পার ফুল ভবিষ্যতে নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই দুই ফুলের জটিল রাসায়নিক যৌগ তৈরির প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পরীক্ষাগারে পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই অগ্রগতি ব্যথা, ম্যালেরিয়া ও ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন ওষুধ তৈরির পথ খুলে দিতে পারে। একই সঙ্গে কৃষিক্ষেত্রে আরও নিরাপদ কীটনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি উন্নয়নেও এটি সহায়ক হতে পারে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি (এমএসইউ) এবং চেক একাডেমি অব সায়েন্সেসের বিজ্ঞানীরা। তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বৈজ্ঞানিক সাময়িকী Molecular Plant-এ।
প্রকৃতির বিষেই লুকিয়ে চিকিৎসার সম্ভাবনা
উলফসবেইন ও লার্কস্পার অল্প পরিমাণে গ্রহণ করলেও স্নায়ুর ক্ষতি এবং পক্ষাঘাতের মতো গুরুতর শারীরিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। তবে একই সঙ্গে এই উদ্ভিদগুলো এমন কিছু প্রাকৃতিক রাসায়নিক যৌগ উৎপাদন করে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বলে মনে করছেন গবেষকরা।
মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির সাবেক গবেষক এবং বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান-ফ্লিন্টের সহকারী অধ্যাপক গ্যারেট মিলার বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার বছর ধরে নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় এই উদ্ভিদগুলো ব্যবহার হয়ে আসছে। এসব যৌগ কীভাবে তৈরি হয় তা জানা গেলে নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের গবেষণা আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

জটিল রাসায়নিক তৈরির রহস্য উন্মোচনের পথে
গবেষকদের ভাষ্য, কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের মাধ্যমে উদ্ভিদ নিজেদের টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত জটিল রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত ক্যাফেইন, মেনথল ও ভ্যানিলিনের মতো বহু উপাদান সরাসরি উদ্ভিদ থেকে আসে অথবা উদ্ভিদের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করে তৈরি হয়েছে।
এই গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল ডাইটারপেনয়েড অ্যালকালয়েড নামে পরিচিত এক ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক যৌগ, যা উলফসবেইন ও লার্কস্পারে পাওয়া যায়। এসব যৌগ অত্যন্ত বিষাক্ত হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এগুলোর সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ দীর্ঘদিনের।
গবেষণায় বড় অগ্রগতি
প্রায় দুই শতক আগে এই যৌগগুলোর অন্যতম পরিচিত উপাদান অ্যাকোনিটিন প্রথম আলাদা করা হলেও বিজ্ঞানীরা এখনও পরীক্ষাগারে এটি পুরোপুরি তৈরি করতে পারেননি।
এই জটিলতা কাটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও চেক প্রজাতন্ত্রের গবেষকেরা একসঙ্গে কাজ করেন। তারা উলফসবেইন ও লার্কস্পারের বিভিন্ন প্রজাতি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে হাজার হাজার জিন বিশ্লেষণ করেন এবং বিষাক্ত যৌগ তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ জিনগুলো শনাক্ত করেন।

এরপর ওই জিনগুলো তামাক গাছে স্থানান্তর করা হয়, যাতে সেগুলো জীবন্ত ‘বায়োফ্যাক্টরি’ হিসেবে কাজ করে রাসায়নিক উৎপাদনের প্রক্রিয়া পুনর্গঠন করতে পারে।
ভবিষ্যতের ওষুধ গবেষণায় নতুন দিগন্ত
জিন সংযোজিত তামাক গাছ সফলভাবে ডাইটারপেনয়েড অ্যালকালয়েড পরিবারের একটি যৌগ অ্যাটিসিনিয়াম উৎপাদন করতে সক্ষম হয়। এ ক্ষেত্রে ছয়টি ভিন্ন এনজাইম একসঙ্গে কাজ করেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এটি জটিল এই রাসায়নিক যৌগ তৈরির প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ধাপ। ভবিষ্যতে এই পদ্ধতির মাধ্যমে চিকিৎসা গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্ভিদভিত্তিক রাসায়নিক আরও টেকসই উপায়ে উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি বন্য পরিবেশ থেকে বিপজ্জনক বিষাক্ত উদ্ভিদ সংগ্রহের প্রয়োজনও কমে আসতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















