ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব জাভার একটি ছোট এলাকা স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘লিটল টেক্সাস’ নামে। আধুনিক তেলক্ষেত্রের মতো এখানে নেই বিশাল যন্ত্রপাতি, অত্যাধুনিক ড্রিলিং রিগ বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি। বরং কাঠের খুঁটি, দড়ি, লোহার বালতি এবং বহু বছরের পুরোনো ট্রাকের ইঞ্জিন ব্যবহার করেই প্রতিদিন মাটি থেকে অপরিশোধিত তেল তুলে আনছেন স্থানীয় মানুষ। জীবিকার তাগিদে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এভাবেই চলছে তেল উত্তোলনের কাজ।
শত বছরের পুরোনো তেলক্ষেত্র
পূর্ব জাভার ওনোকোলো তেলক্ষেত্রের ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। ১৮৯৩ সালে, যখন ইন্দোনেশিয়া ডাচ উপনিবেশ ছিল, তখন পানি খোঁড়ার সময় এই তেলক্ষেত্রের সন্ধান মেলে। মাত্র প্রায় ৫০০ মিটার গভীর হওয়ায় ভারী যন্ত্রপাতি ছাড়াই এখান থেকে তেল উত্তোলন সম্ভব। এই কারণেই স্থানীয় মানুষ নিজেরাই সহজ উপায়ে তেল তুলতে সক্ষম হচ্ছেন।
বিশ্বের বড় তেল কোম্পানিগুলো বহু আগেই এই ক্ষেত্রকে বাণিজ্যিকভাবে খুব বেশি লাভজনক মনে করেনি। কিন্তু স্থানীয় মানুষের কাছে এটি এখনো জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস।
পুরোনো ট্রাকের ইঞ্জিনই প্রধান ভরসা
তেল উত্তোলনের কাজে ব্যবহার করা হয় বহু পুরোনো ট্রাকের ইঞ্জিন। সেই ইঞ্জিনের সঙ্গে যুক্ত থাকে হাতে তৈরি পাম্প। একজন শ্রমিক ইঞ্জিন নিয়ন্ত্রণ করেন, আর অন্যরা কাঠের লাঠি দিয়ে পাম্পের গতি সামলান। কেউ আবার কূপের চারপাশে জমে থাকা তেল বালতিতে তুলে সংগ্রহ করেন।
একটি কূপ থেকে এক ঘণ্টায় প্রায় ২০০ লিটার অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। এরপর শ্রমিকেরা আরেকটি কূপে গিয়ে একইভাবে কাজ শুরু করেন।
ঝুঁকি নিয়েই কাজ
এই তেলকূপগুলোর বেশির ভাগই সরকারের নিবন্ধিত নয়। ফলে এগুলো নিরাপত্তা বিধিমালার আওতায় পড়ে না। দুর্ঘটনার আশঙ্কা সব সময়ই থাকে।
স্থানীয়দের ভাষায়, এই কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কয়েক বছর আগে একটি কূপ পরিদর্শনের সময় দড়িতে আটকে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। তবুও জীবিকার জন্য মানুষ প্রতিদিন এই বিপজ্জনক কাজ করে চলেছেন।
পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
তেল উত্তোলনের পাশাপাশি অনেকেই অপরিশোধিত তেল চুল্লিতে গরম করে পানি আলাদা করেন এবং অপরিশোধিত ডিজেল তৈরি করেন। এতে বাতাস ও মাটিতে দূষণের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন এই পরিবেশে কাজ করলে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের ওপরও গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে তেল ও রাসায়নিক পদার্থ আশপাশের মাটি ও পানির মানও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বিকল্প কাজের অভাব
পরিবেশকর্মীদের মতে, এলাকার মানুষের কাছে তেল উত্তোলন কোনো পছন্দের পেশা নয়; বরং এটি বাধ্য হয়ে বেছে নেওয়া একটি জীবিকা। পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় বহু মানুষ এই কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হয়েছেন।
স্থানীয়দের অনেকেই দিনের বেলা তেল উত্তোলন করেন, আবার রাতে একই তেলক্ষেত্রে নিরাপত্তারক্ষীর দায়িত্বও পালন করেন।
তিন প্রজন্মের জীবিকা
অনেক পরিবারের তিন প্রজন্ম ধরে এই তেলক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্ক। আগে যখন ট্রাকের ইঞ্জিন ব্যবহার হতো না, তখন একটি পাম্প চালাতে একসঙ্গে অন্তত ১০ জন শ্রমিকের প্রয়োজন পড়ত।
প্রবীণ শ্রমিকদের স্মৃতিতে, নব্বইয়ের দশকে একটি কূপ থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩৮ ব্যারেল পর্যন্ত তেল উৎপাদন হতো এবং দিনরাত কাজ চলত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মজুত কমে গেছে। এখন একটি কূপ থেকে সাত থেকে আট ব্যারেল তেল তুলতে পুরো এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
আয় কমছে, আশা এখনো আছে
ওনোকোলো ও হার্গোমুলিও—এই দুই গ্রামে ছড়িয়ে রয়েছে প্রায় ৮০০টি কূপ। এর মধ্যে অন্তত ২০০টি এখনো তেল উৎপাদন করছে। উত্তোলিত অপরিশোধিত তেলের বেশির ভাগই রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানির কাছে বিক্রি করা হয়।
স্থানীয় শ্রমিকদের অনেকেই একসঙ্গে পাঁচ বা ছয়টি কূপে কাজ করেন। ভালো মাসে তাদের আয় প্রায় ৪০০ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ হলেও তেলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় আয় আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে।
তবুও অনেকের বিশ্বাস, আরও গভীরে খনন করা গেলে নতুন করে তেলের মজুত পাওয়া যেতে পারে।
পর্যটনের উদ্যোগেও আসেনি সাফল্য
তেলের মজুত একদিন শেষ হয়ে যেতে পারে—এই আশঙ্কা থেকে সরকার কয়েক বছর আগে এলাকাটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, জাদুঘর এবং খাবারের জন্য আলাদা এলাকা নির্মাণ করা হয়।
কিন্তু সেই উদ্যোগ খুব একটা সফল হয়নি। এখন সেখানে খুব কম দর্শনার্থী আসেন। জাদুঘরটি মাঝে মাঝে গবেষক ও ভ্রমণকারীদের বিশ্রামস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। খাবারের জন্য নির্মিত অংশটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
অনিশ্চয়তার মাঝেও সংগ্রাম
ওনোকোলোর মানুষের কাছে তেল শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি তাদের জীবন, ইতিহাস এবং বেঁচে থাকার অবলম্বন। আধুনিক প্রযুক্তির বাইরে দাঁড়িয়ে পুরোনো ইঞ্জিন, কাঠের কাঠামো আর হাতে বানানো সরঞ্জাম দিয়ে তারা এখনো তেল তুলে চলেছেন। ঝুঁকি, পরিবেশগত উদ্বেগ এবং ক্রমশ কমে আসা উৎপাদনের মধ্যেও এই তেলক্ষেত্র হাজারো মানুষের জীবিকা ধরে রেখেছে। তবে ভবিষ্যতে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি না হলে এই অঞ্চলের মানুষের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















