বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক সাফল্যের পথে এগিয়ে চলেছে পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘দ্য ওডিসি’। বক্স অফিসে প্রায় একশো কোটি ডলারের আয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া এই চলচ্চিত্রকে ঘিরে যখন দর্শকদের উচ্ছ্বাস তুঙ্গে, ঠিক তখনই শুরু হয়েছে আরেকটি বড় বিতর্ক। প্রাচীন গ্রিক মহাকাব্য ওডিসি-র অন্যতম খ্যাতিমান অনুবাদক এমিলি উইলসন ছবিটির তীব্র সমালোচনা করে সাহিত্য ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে নতুন আলোচনা উসকে দিয়েছেন।
উইলসনের দীর্ঘ সমালোচনামূলক প্রবন্ধ প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের অঙ্গন—সবখানেই শুরু হয়েছে তর্ক। প্রশ্ন উঠেছে, একটি মহাকাব্যের আধুনিক চলচ্চিত্ররূপ কতটা মূল রচনার প্রতি বিশ্বস্ত হওয়া উচিত, আর কোথায় পরিচালক নিজের শিল্পীসত্তার স্বাধীনতা প্রয়োগ করতে পারেন।
কে এই এমিলি উইলসন?
২০১৭ সালে এমিলি উইলসন ইতিহাস গড়েন। তিনিই প্রথম নারী, যিনি প্রাচীন গ্রিক ভাষা থেকে সরাসরি ইংরেজিতে ওডিসি অনুবাদ করেন। তাঁর অনুবাদকে সাহিত্য ও শিক্ষাজগতে ব্যাপকভাবে প্রশংসা করা হয়। সমকালীন ভাষার ব্যবহার, মূল কাব্যের ভাব অক্ষুণ্ণ রাখা এবং নতুন পাঠকদের কাছে মহাকাব্যটিকে সহজ করে তোলার জন্য তাঁর কাজ বিশেষ স্বীকৃতি পায়।
এরপর তিনি ইলিয়াড-এরও নতুন অনুবাদ প্রকাশ করেন। বর্তমানে তিনি পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্রুপদি সাহিত্য বিভাগের প্রধান এবং প্রাচীন সাহিত্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য মর্যাদাপূর্ণ বিভিন্ন সম্মান অর্জন করেছেন।
তবে তাঁর অনুবাদ প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিশেষ করে নারীবিদ্বেষী মন্তব্যেরও শিকার হতে হয়েছে তাঁকে।

সিনেমা মুক্তির আগে ছিল উৎসাহ
মজার বিষয় হলো, চলচ্চিত্রটি মুক্তির আগে এমিলি উইলসনের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, বড় পর্দায় ওডিসি দেখতে তিনি ভীষণ আগ্রহী।
তাঁর বিশ্বাস ছিল, এই চলচ্চিত্র অনেক দর্শককে প্রাচীন সাহিত্য পড়তে উৎসাহিত করবে। এমনকি তিনি এটাও বলেছিলেন যে, কোনো পরিচালক নিজের ব্যাখ্যা অনুযায়ী একটি মহাকাব্যকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতেই পারেন।
কিন্তু সিনেমা দেখার পর তাঁর অবস্থান নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।
‘চমক আছে, গভীরতা নেই’
দীর্ঘ সমালোচনামূলক লেখায় উইলসন অভিযোগ করেন, নোলানের চলচ্চিত্রে ওডিসি-র মূল দর্শন, মানবিকতা এবং আবেগের গভীরতা প্রায় অনুপস্থিত।
তাঁর মতে, চলচ্চিত্রটি সময়, স্মৃতি, যুদ্ধের মূল্য, পরিবারে ফিরে আসা, নৈতিক সংকট কিংবা মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, ছবির কাহিনির বিন্যাস কৃত্রিম, সংলাপ দুর্বল এবং পুরো চলচ্চিত্রটি বাহ্যিক জাঁকজমকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল।
উইলসনের ভাষায়, এটি এমন এক দৃষ্টিনন্দন প্রদর্শনী, যেখানে চোখ ধাঁধানো দৃশ্য আছে, কিন্তু আবেগের গভীরতা অনেকটাই অনুপস্থিত।
অভিনয়শিল্পী নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন
চলচ্চিত্রের অভিনয়শিল্পী নির্বাচন নিয়েও আপত্তি জানান এমিলি উইলসন। তাঁর অভিযোগ ছিল, অশ্বেতাঙ্গ অভিনয়শিল্পীদের অনেকেই এমন চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যাদের ভূমিকা মূলত প্রধান শ্বেতাঙ্গ নায়ককে সহায়তা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
তবে এই মন্তব্যের পর সমালোচনা শুরু হলে তিনি পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের বক্তব্যের ভাষা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দক্ষ অভিনয়শিল্পীদের যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি—এই মতামত তাঁর এখনো রয়েছে, কিন্তু তিনি বিষয়টি আরও ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পারতেন।
নোলানের নীরবতা
এত বড় বিতর্কের পরও পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
অন্যদিকে তাঁর সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন অনেক লেখক ও গবেষক।
খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক জয়েস ক্যারল ওটস মনে করেন, একজন অনুবাদকের কাছ থেকে আরও সহনশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাশিত ছিল। তাঁর মতে, একটি অনুবাদ যেমন নিজেই এক ধরনের ব্যাখ্যা, তেমনি একটি চলচ্চিত্রও মূল রচনার আরেকটি শিল্পিত ব্যাখ্যা হতে পারে।

গবেষকদের মধ্যেও মতভেদ
ধ্রুপদি সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করা অনেক বিশেষজ্ঞও এমিলি উইলসনের সমালোচনার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন।
কেউ কেউ মনে করেন, নোলান মূল কাহিনিকে হুবহু অনুসরণ না করে নিজের শিল্পীসুলভ ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন, আর সেটিই একটি চলচ্চিত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
আবার অন্য একদল গবেষকের মতে, চলচ্চিত্রটি নোলানের স্বকীয় নির্মাণশৈলী বহন করলেও হোমারের মহাকাব্যের অনেক মৌলিক মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দূরে সরে গেছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে পুরোনো প্রশ্ন
এই বিতর্ক নতুন নয়। বহু দশক ধরেই সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে একই প্রশ্ন ফিরে এসেছে—একটি চলচ্চিত্র কি মূল রচির প্রতি সম্পূর্ণ অনুগত থাকবে, নাকি পরিচালক নিজের কল্পনা ও দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করবেন?
দ্য ওডিসিকে ঘিরে এমিলি উইলসনের সমালোচনা সেই পুরোনো বিতর্ককেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে দর্শকদের বিপুল ভালোবাসা ও বাণিজ্যিক সাফল্য, অন্যদিকে সাহিত্যিক বিশ্লেষণ ও শিল্পমানের প্রশ্ন—এই দুইয়ের সংঘাতই এখন বিশ্ব চলচ্চিত্র ও সাহিত্য অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত বিষয়।
হোমারের মহাকাব্য আজও যে নতুন প্রজন্মকে আলোড়িত করতে পারে, এই বিতর্ক সম্ভবত সেটিরই আরেকটি প্রমাণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















