বিশ্ব অর্থনীতির দিকে তাকালে প্রথম দৃষ্টিতে সবকিছুই যেন আশাব্যঞ্জক মনে হয়। বৈশ্বিক আর্থিক সম্পদের পরিমাণ নজিরবিহীন উচ্চতায় পৌঁছেছে, পরিবারগুলোর নিট সম্পদও দ্রুত বাড়ছে। সংখ্যার ভাষায় এটি সমৃদ্ধির গল্প। কিন্তু সেই গল্পের ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—এই সম্পদের কতটা বাস্তব, আর কতটা কেবল বাজারের মূল্যায়নের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কাগুজে হিসাব?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক সম্পদ বৃদ্ধির ধরন এমনভাবে বদলেছে, যা অর্থনীতিবিদদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে। কারণ সম্পদের বিস্তার এখন আর মূলত নতুন কারখানা, অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি, আবাসন বা উৎপাদনশীল বিনিয়োগের মাধ্যমে ঘটছে না। বরং শেয়ারবাজারে কোম্পানির মূল্য দ্রুত বেড়ে যাওয়াই সম্পদ বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ অর্থনীতির ভিত্তি যতটা শক্তিশালী হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক দ্রুত বাড়ছে সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো সম্পদের বাজারমূল্য।
এই বিচ্ছিন্নতাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
গত বছর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের বিপুল উচ্ছ্বাস বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিভিন্ন অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শেয়ারের দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বাস্তব অর্থনীতির গতি যেখানে দীর্ঘমেয়াদি গড়ের কাছাকাছি ছিল, সেখানে আর্থিক বাজারের মূল্যায়ন অনেক দ্রুত উপরে উঠে গেছে।
এই বৈপরীত্যই ইঙ্গিত দেয় যে বাজার হয়তো ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে বর্তমানের বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি মূল্য দিচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বে পরিবারের সম্পদ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় উৎস ছিল আবাসন খাত। জমি, বাড়ি কিংবা বাণিজ্যিক ভবনের মূল্য বৃদ্ধি সম্পদের স্বাভাবিক সম্প্রসারণ ঘটাত। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলেছে। শেয়ার ও বিনিয়োগ তহবিলের মূল্য বৃদ্ধি সম্পদ সৃষ্টির প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। এর অর্থ, সম্পদের ভিত্তি আরও বেশি নির্ভর করছে আর্থিক বাজারের মূল্যায়নের ওপর, যার ওঠানামা বাস্তব সম্পদের তুলনায় অনেক বেশি অস্থির।
সমস্যা কেবল এখানেই সীমাবদ্ধ নয়।
যখন কোনো দেশের বা বিশ্বের ব্যালান্স শিট প্রকৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তুলনায় দ্রুত ফুলে-ফেঁপে ওঠে, তখন পুঁজির ব্যবহারও বদলে যায়। নতুন উৎপাদনশীল বিনিয়োগের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের শেয়ার পুনঃক্রয়, আর্থিক প্রকৌশল বা উচ্চ ঋণনির্ভর কৌশলের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়তে পারে। এতে বাজারমূল্য আরও বাড়ে, কিন্তু উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান কিংবা দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি সেই অনুপাতে শক্তিশালী হয় না।

অর্থনীতির জন্য এটি একটি নীরব সতর্কসংকেত।
আরও একটি বড় উদ্বেগ বৈষম্য। সম্পদের দাম দ্রুত বাড়লে সবচেয়ে বেশি লাভবান হন যাঁদের আগে থেকেই সম্পদ রয়েছে। বিপরীতে নতুন প্রজন্ম বা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বাড়ি কেনা কিংবা বিনিয়োগের বাজারে প্রবেশ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সম্পদ বৃদ্ধির সামগ্রিক পরিসংখ্যান যতই উজ্জ্বল দেখাক, সেই সমৃদ্ধির সুফল সমাজে সমানভাবে ছড়ায় না।
এ কারণেই আর্থিক বাজারের উল্লাস অনেক সময় সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ঘুরে ফিরে আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিনিয়োগ-উন্মাদনার দিকে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বিপুল পরিমাণ মূলধনী ব্যয় করছে, বিনিয়োগকারীরাও ভবিষ্যতের উৎপাদনশীলতার ওপর বড় ধরনের বাজি ধরছেন। যদি এই প্রযুক্তি সত্যিই অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত উৎপাদনশীলতার বিপ্লব ঘটাতে পারে, তাহলে আজকের উচ্চ মূল্যায়নের একটি যৌক্তিক ভিত্তি তৈরি হবে।
কিন্তু যদি সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে বর্তমান মূল্যায়নের বড় অংশই টেকসই থাকবে না।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এই ঝুঁকি সবচেয়ে স্পষ্ট। বিশ্ব শেয়ারবাজারের বড় অংশই মার্কিন কোম্পানিকেন্দ্রিক, আর তাদের বাজারমূল্য অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব সম্পদের তুলনায় ঐতিহাসিকভাবে অনেক বেশি। ফলে সেখানে বড় ধরনের মূল্য সংশোধন হলে তার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিদেশি বিনিয়োগকারী, আন্তর্জাতিক তহবিল এবং বিশ্বের অসংখ্য পরিবারের সঞ্চয়ও সেই ধাক্কা অনুভব করবে।
বিশ্বায়িত আর্থিক ব্যবস্থায় কোনো বড় বাজারের পতন আর স্থানীয় ঘটনা থাকে না; তা দ্রুত আন্তর্জাতিক অভিঘাতে রূপ নেয়।
তাহলে সামনে কী অপেক্ষা করছে?
সম্ভাব্য পথ তিনটি। প্রথমত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সত্যিই উৎপাদনশীলতার এমন এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে, যা বর্তমান উচ্চ মূল্যায়নকে সময়ের সঙ্গে বৈধতা দেবে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি সম্পদ ও ঋণের প্রকৃত মূল্য ধীরে ধীরে সামঞ্জস্য করে অর্থনীতি ও ব্যালান্স শিটের ব্যবধান কমিয়ে দিতে পারে। আর তৃতীয় সম্ভাবনা হলো সবচেয়ে কঠিন—শেয়ারবাজারে বড় ধরনের সংশোধন, যার বোঝা বহন করতে হবে সঞ্চয়কারী পরিবার, বিনিয়োগকারী এবং বাস্তব অর্থনীতিকে।
আজকের বৈশ্বিক সম্পদের বিপুল অঙ্ক তাই নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। কিন্তু কেবল সম্পদের পরিমাণই অর্থনীতির শক্তির একমাত্র মানদণ্ড নয়। সেই সম্পদের ভিত্তি কতটা বাস্তব, কতটা উৎপাদনশীল এবং কতটা দীর্ঘস্থায়ী—শেষ পর্যন্ত সেটিই নির্ধারণ করবে বর্তমানের এই আর্থিক সমৃদ্ধি ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতার ভিত্তি হবে, নাকি আরেকটি ব্যয়বহুল সংশোধনের পূর্বাভাস।
মাইক ডোলান 


















