মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকটকে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান হামলা বা সামরিক পাল্টা আঘাতের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এই সংঘাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপের সামরিক অর্থের পাশাপাশি কূটনৈতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক তাৎপর্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নটি তাই কেবল এই নয় যে যুদ্ধ বাড়বে কি না; বরং আরও বড় প্রশ্ন হলো—এই উত্তেজনা কি একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘর্ষের পূর্বাভাস, নাকি উভয় পক্ষই ভবিষ্যৎ আলোচনায় সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করতে চাপ বাড়াচ্ছে?
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি প্রবণতা বিশেষভাবে চোখে পড়ে। এগুলো আলাদাভাবে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সম্মিলিতভাবে তার চেয়েও বেশি তাৎপর্য বহন করে। কারণ প্রতিটি পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্যকে নতুনভাবে প্রভাবিত করছে।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর অভ্যন্তরে মতভেদের আলোচনা ক্রমেই প্রকাশ্যে আসছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সামরিক পরিকল্পনাকারীদের মধ্যেও বর্তমান সংঘাত কীভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত, তা নিয়ে একক অবস্থান নেই—এমন ইঙ্গিত বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যাচ্ছে। অবশ্য এ ধরনের তথ্যের সবকিছুই যে নির্ভুল, তা বলা যায় না। অনেক সময় উদ্দেশ্যমূলক তথ্য ফাঁস প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করার কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। আবার বড় রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে মতপার্থক্য অস্বাভাবিক কিছু নয়।
তবু বাস্তবতা হলো, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দুই দেশের নীতিনির্ধারণী মহলে বিভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির অস্তিত্ব বারবার প্রকাশ পেয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সেই পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া, সীমিত রাখা কিংবা আলোচনায় ফিরে যাওয়া—এই তিন পথের মধ্যে কোনটি বেছে নেওয়া হবে, তা নিয়ে দ্বিধা এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো ইসরায়েলের অবস্থান। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক তৎপরতায় তারা দৃশ্যত সংযম দেখিয়েছে। একই সময়ে ইরানও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলা থেকে বিরত রয়েছে। এটি আনুষ্ঠানিক সমঝোতা নয়, কিন্তু এক ধরনের নীরব পারস্পরিক সংযমের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে।
এই অবস্থানের পেছনে উভয় পক্ষের নিজস্ব হিসাব রয়েছে। ইসরায়েল বর্তমানে লেবানন ও হিজবুল্লাহ-সংক্রান্ত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে বেশি মনোযোগী। দীর্ঘমেয়াদি সরাসরি ইরান যুদ্ধ তাদের জন্য ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে অনিশ্চয়তার কথাও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে, তেহরানের হিসাবও তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী। ইসরায়েল যদি সরাসরি সংঘর্ষে না যায়, তাহলে অপ্রয়োজনীয় নতুন ফ্রন্ট খুলে পরিস্থিতিকে আরও জটিল না করার প্রবণতাও ইরানের আচরণে লক্ষ করা যাচ্ছে।
তৃতীয় যে পরিবর্তনটি বিশেষ উদ্বেগ তৈরি করেছে, তা হলো ইরানের প্রতিক্রিয়ার ভৌগোলিক বিস্তার। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা অবস্থান নিতে গিয়ে বিভিন্ন আরব দেশের ভূখণ্ডে অবস্থিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ঘটনা আঞ্চলিক উদ্বেগকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তেহরানের দাবি—এসব স্থাপনা মূলত মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের মতে, হামলার শিকার হচ্ছে নিজস্ব অবকাঠামো, বিশেষ করে জ্বালানি ও কৌশলগত স্থাপনা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানের উচ্চপর্যায়ের সতর্কবার্তা যে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত থাকলে পুরো অঞ্চলের তেল উৎপাদন ও রপ্তানিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এই বক্তব্য শুধু সামরিক হুমকি নয়; বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ওপরও একটি রাজনৈতিক বার্তা।
ফলে আরব বিশ্বের প্রতিক্রিয়াও ক্রমশ কঠোর হয়েছে। বিভিন্ন দেশ প্রকাশ্যে আক্রান্ত রাষ্ট্রগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে এবং এসব হামলাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছে। বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, যেসব দেশ অতীতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেছিল, তাদের বিরুদ্ধেও হামলার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এতে ভবিষ্যতের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
চতুর্থ পরিবর্তনটি সংঘাতের ভৌগোলিক বিস্তারকে আরও স্পষ্ট করে। ইরান আবারও তার আঞ্চলিক মিত্রদের সক্রিয় করেছে। ইয়েমেনের আনসার আল্লাহ আন্দোলন এবং ইরাকের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অংশগ্রহণ সংঘাতকে বহু-পক্ষীয় রূপ দিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের ওপর আরও নির্ভরশীল হয়েছে।
![]()
এই প্রবণতার ফলে যুদ্ধ আর কেবল দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং পুরো অঞ্চলের বিভিন্ন শক্তি এতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ছে।
এর পরিণতিও ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বাগদাদ-রিয়াদ সম্পর্কে অস্বস্তির সম্ভাবনা তৈরি করেছে, যদিও ইরাকি সরকার দ্রুত সেই হামলার নিন্দা জানিয়ে দায়ীদের থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে। একই সঙ্গে ব্রিটেনকে ভবিষ্যৎ হামলার বৈধ লক্ষ্য হিসেবে ইরানের বক্তব্য লন্ডনের সঙ্গে উত্তেজনাও বাড়িয়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ অবশ্য লোহিত সাগরকে ঘিরে। সেখানে নৌ চলাচল ব্যাহত করার কিংবা সৌদি আরবকে কার্যত অবরুদ্ধ করার হুমকি শুধু সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর জন্য নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার জন্যও গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতেও পৌঁছাবে।
এই পুরো চিত্রকে মূলত দুইভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।
একটি ব্যাখ্যা বলছে, সবকিছুই একটি নতুন ও আরও বিস্তৃত যুদ্ধের প্রস্তুতি। যদি বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে আগের সংঘাতের তুলনায় আরও বেশি রাষ্ট্র এতে জড়িয়ে পড়তে পারে এবং সামরিক ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
অন্য ব্যাখ্যাটি তুলনামূলকভাবে আশাবাদী। এর মতে, উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে সামরিক চাপ ব্যবহার করছে, যাতে ভবিষ্যৎ আলোচনায় ছাড় আদায় করা সহজ হয়। অর্থাৎ যুদ্ধের ভাষা শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলকে প্রভাবিত করার একটি উপায় হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ ওমান, পাকিস্তানসহ একাধিক মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র আবারও যোগাযোগের পথ খোলা রাখার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে রাশিয়া, চীন, জাতিসংঘের মহাসচিব এবং মিসর ও তুরস্কের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোও সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে অস্ত্রের শক্তি নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দিকনির্দেশনা। যদি সামরিক চাপ কেবল দর-কষাকষির হাতিয়ার হয়, তাহলে আলোচনার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু যদি এই চাপ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে সংঘাত আর কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সে ক্ষেত্রে এর মূল্য শুধু যুদ্ধরত পক্ষগুলোকেই নয়, পুরো অঞ্চল এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও বহন করতে হবে। তাই বর্তমান সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখনো একই রয়ে গেছে—এটি কি যুদ্ধের শেষ ধাপের সূচনা, নাকি শান্তির আলোচনার আগে শেষ বড় শক্তি-প্রদর্শন?
ড. তারেক ফাহমি 



















